প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা-ক্ষোভ, প্রত্যাহারের দাবি

সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করার কথা বলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তাঁর বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে বিপজ্জনক বার্তা হিসেবে দেখছে মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠনগুলো। বক্তব্য প্রত্যাহার, সরকারের ব্যাখ্যা এবং আইজিপির জবাবদিহি দাবি করেছে তারা। নিন্দা জানিয়েছে কয়েকটি রাজনৈতিক দলও।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত। জাতিসংঘের নীতিমালা অনুযায়ী, জীবন রক্ষায় একান্ত অনিবার্য হলেই কেবল ইচ্ছাকৃত প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য, অপরাধ দমনের নামে বিচারপ্রক্রিয়া এড়িয়ে কাউকে হত্যা করার অনুমতি সরকারেরও নেই।

আজ সোমবার দুপুরে পুরান ঢাকার চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিকের’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে আমরা সেটাই করব।’ তাঁর যুক্তি, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে ‘ফ্যাসিস্ট’, নিষ্ক্রিয় থাকলে ‘দুর্বল’ বলা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে কাজের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। একই অনুষ্ঠানে তিনি আইন ও সংবিধান মেনে দায়িত্ব পালনের কথাও বলেন।

আইজিপির বক্তব্যকে ‘অপরিণামদর্শী’ আখ্যায়িত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তুলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে পুলিশপ্রধান কি ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চাইছেন? তাঁর মতে, পেশাদার তদন্ত ও বিচারের বদলে ক্রসফায়ারের কথা বলা পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত। কোনো সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধ করতে পারে না।

টিআইবি আইজিপির আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা ও বক্তব্য প্রত্যাহার দাবি করেছে। জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশে ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র‍্যাব ও সংস্থাটির কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। আলোচিত কয়েকটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা হলো, কক্সবাজারে কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা ও নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা।

আইজিপির এমন বক্তব্যের পর এক বিবৃতিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলেছে, কোনো নাগরিক অপরাধে অভিযুক্ত হলেও তাঁকে আদালতের বাইরে হত্যার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। বক্তব্যটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকে কোনো প্রশ্রয় দেওয়া হবে না—সরকারের এমন স্পষ্ট ঘোষণা চেয়েছে সংগঠনটি। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতির কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে আসক।

আরেক বিবৃতিতে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার বলেছে, পুলিশপ্রধানের এ বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বিচারবহির্ভূত হত্যার ছাড়পত্র হিসেবে দেখা হতে পারে। সংগঠনটির দাবি, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাঁচটি বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা তারা নথিবদ্ধ করেছে। ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার চেয়েছে অধিকার।

অন্যদিকে সরকার এমন হত্যাকাণ্ডকে অনুমোদনযোগ্য মনে করে কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগের বৈধতা নির্ভর করে আইনের প্রতি আনুগত্যের ওপর, বিচারবহির্ভূত পদ্ধতির ওপর নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে অপরাধীর বিচার আদালতেই হতে হবে—রাষ্ট্রীয় অনুমোদনেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনো সুযোগ থাকতে পারে না।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আইজিপির বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। দলটি এক বিবৃতিতে বলেছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব বাংলাদেশ পুলিশের। পুলিশ নাগরিকদের সেবক, শাসক নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান ব্যক্তি হয়ে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আইজিপি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে তিনি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করেছেন।

জামায়াতে ইসলামী আরও বলেছে, ফ্যাসিস্ট আমলে এ দেশের নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা ছিল না, বাক্‌স্বাধীনতা ছিল না। বিনা বিচারে মানুষদের হত্যা করা হতো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে নাগরিকদের তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা, ক্রসফায়ার ও গুম করত। সেই একই কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি করার হুমকি ও ইঙ্গিত দিয়েছেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। তাঁর এমন বক্তব্য সংবিধান ও আইনের শাসনের পরিপন্থী।

আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটি বলেছে, সরকার পুলিশের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার ক্ষমতা তুলে দিতে পারে না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলিবর্ষণের স্মৃতি উল্লেখ করে এবি পার্টি বলেছে, ক্রসফায়ারের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার বার্তা জনমনে নতুন আশঙ্কা তৈরি করছে।

আইজিপির এই বক্তব্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশের ভূমিকার স্মৃতি ফিরে আসে বলে উল্লেখ করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

ক্র্যাবের প্রতিবাদ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার দাবি

সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের দেওয়া আপত্তিকর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব)। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত সততা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে তাঁর ঢালাও মন্তব্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। ক্র্যাব সভাপতি মির্জা মেহেদী তমাল ও সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ্ এক যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়েছে।

এক বিবৃতিতে ক্যাব বলেছে, সোমবার পুরান ঢাকার চকবাজারে এক আনুষ্ঠানে আইজিপি বলেন, ‘মাদকের টাকা না পেলে সাংবাদিকেরা লিখছেন পুলিশ অকার্যকর। বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে এমন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, পুলিশের সর্বোচ্চ পদে আসীন একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছ থেকে সাংবাদিকদের নিয়ে এমন মন্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্বেগজনক। মাদক নির্মূলে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি পুলিশের কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ থাকলে তা সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তোলা দায়িত্বশীল আচরণের পরিচায়ক নয়।

বিবৃতিতে ক্র্যাব নেতারা অবিলম্বে আইজিপির উল্লেখিত মন্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার এবং এ বিষয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানান। অন্যথায় সাংবাদিকদের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও পেশাগত অধিকার রক্ষায় দেশের অন্যান্য সাংবাদিক সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা।