অনলাইনে পশুর হাট
অনলাইনে পশুর হাট

অনলাইন পশুর হাট এখন ‘ডিজিটাল প্রচার, সরাসরি বিক্রি’

কোরবানির পশু কিনতে এখন আর সবার হাটে যাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। ফেসবুকে গরুর ছবি–ভিডিও দেখে, দরদাম ঠিক করে পরে সরাসরি খামারে গিয়ে পশু কিনছেন অনেক ক্রেতা। করোনাকালে শুরু হওয়া অনলাইন পশুর হাট এখন বদলে গেছে ‘ডিজিটাল প্রচার, সরাসরি বিক্রি’ মডেলে।

ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান কয়েক বছর ধরে কোরবানির পশু কিনতে হাটে যান না। বিভিন্ন খামারের ফেসবুক পেজে পশুর ভিডিও দেখে এরপর সরাসরি গিয়ে যাচাই করে কেনেন। এবারও ঈদের দুই সপ্তাহ আগে থেকে বিভিন্ন খামারের ফেসবুক পেজ ঘুরে দেখেছেন। শেষে গত সোমবার নিজ এলাকা সাতক্ষীরার একটি খামার থেকে গরু কিনেছেন তিনি।

মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, হাটের ভিড়, অতিরিক্ত দাম আর দর-কষাকষির ঝামেলা এড়াতেই তিনি এখন খামার থেকে গরু কেনেন।

করোনার সময় ভিডিও কলে পশু দেখে ঘরে বসেই বুকিং দিতেন ক্রেতারা। এখন অনলাইনে ছবি–ভিডিও দেখে আগ্রহী হলেও বেশির ভাগ ক্রেতা শেষ পর্যন্ত সরাসরি খামারে গিয়ে পশু দেখে কিনছেন।

ঢাকার নিয়ামত শুকরিয়া ক্যাটেল ফার্মের উদ্যোক্তা মিনহাজুল ইসলাম ২০২২ সাল থেকে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে পশু বিক্রি করছেন। লাইভ ও ভিডিও পোস্টের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হলেও বিক্রি হয় সামনাসামনি।

মিনহাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনলাইনে প্রচার করি, কিন্তু বিক্রিটা অনলাইনে হয় না। ক্রেতা সরাসরি এসে দেখে এরপর পশু কেনেন।’

হাটে গরু না নিয়ে ফার্ম থেকেই বিক্রি করেন মিনহাজুল। সঙ্গে দেন বিনা মূল্যে হোম ডেলিভারি। এমনকি গরু বিক্রির পর তার অভ্যস্ত খাবারও সরবরাহ করেন। কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন একই খাবার খেয়ে অভ্যস্ত গরু হঠাৎ নতুন খাবার সহ্য করতে পারে না। না খেলে পাঁচ-ছয় কেজি ওজন কমে যায়। সে জন্য আমরা খাবার দিয়ে দিই।’

মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, হাটের ভিড়, অতিরিক্ত দাম আর দর-কষাকষির ঝামেলা এড়াতেই তিনি এখন খামার থেকে গরু কেনেন।

করোনাকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, আইসিটি বিভাগ, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে ২০২০ সালে ডিজিটাল পশুর হাট চালু করেছিল। ২০২১ সালে সেখানে ৩ লাখ ৮৭ হাজার পশু বিক্রি হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সারা দেশের বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে ৫ লাখ ৫ হাজার ৪৯৪টি পশু বিক্রি হয়েছে।

তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কমে যাওয়ায় সেই প্ল্যাটফর্ম এখন আর নেই। এটুআইয়ের ‘একশপ’ উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ডিজিটাল হাটও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি উদ্যোগ না থাকলেও বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনলাইন পশু বিক্রি থেমে নেই।
সরকারি হিসাবে, এ বছর ঈদুল আজহায় সারা দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। আর চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে।

কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজারের বেশি গরু-মহিষ এবং ৬৬ লাখ ৩২ হাজারের বেশি ছাগল-ভেড়া রয়েছে।

কেরানীগঞ্জের এ ওয়ান অ্যাগ্রো ফার্মের উদ্যোক্তা আল আমিন হোসেন আবির জানান, এবার তাঁর খামারের ২১৭টি গরুর সবই বিক্রি হয়ে গেছে। ফেসবুক পেজ দেখে খামারে আসা ক্রেতার সংখ্যাই বেশি। পাঁচ বছর ধরে অনলাইনে গরু কেনাবেচা করছেন তিনি।
আল আমিন হোসেন বলেন, ‘ফেসবুক পেজ দেখে ক্রেতারা খামারে আসেন। আবার পরিচিত ক্রেতাদের মাধ্যমেও নতুন ক্রেতা আসছে।’

হাটে গরু না নিয়ে ফার্ম থেকেই বিক্রি করেন মিনহাজুল। সঙ্গে দেন বিনা মূল্যে হোম ডেলিভারি। এমনকি গরু বিক্রির পর তার অভ্যস্ত খাবারও সরবরাহ করেন।

ফেসবুক গ্রুপেও কেনাবেচা

শুধু ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজ নয়, কোরবানির পশু বিক্রির জন্য রয়েছে বড় বড় ফেসবুক গ্রুপও। ‘গরুর বাজার’ নামে একটি গ্রুপের সদস্য প্রায় চার লাখ। সেখানে বিভিন্ন এলাকার বিক্রেতারা গরু ও ছাগল বিক্রির পোস্ট দিচ্ছেন। ক্রেতারাও সেখানে নিজেদের চাহিদা ও বাজেট উল্লেখ করে পোস্ট করছেন।

তবে ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতার সংখ্যাই বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
নিজের বাড়িতে পালন করা গরুর ছবি গ্রুপে দিয়ে সেটি বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজছেন গাজীপুরের মহিদুল ইসলাম। সোমবার রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার নিজের পালা গরু। হাটে নিলে পাগলামি করে, এ জন্য ভয় পাই। তাই হাটে নিই না। অনলাইনে পোস্ট দিয়েছি। অনেকেই দাম বলেছেন। যার সঙ্গে দামে মিলবে, তার কাছেই বিক্রি করব।’

তবে অনলাইন কেনাবেচায় কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। কয়েকজন ক্রেতা জানিয়েছেন, অনলাইনে দেখানো পশুর সঙ্গে বাস্তবে মিল না পাওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। তাই অনেকেই এখন অনলাইনে দেখে পরে সরাসরি খামারে গিয়ে পশু যাচাই করছেন।

শুধু পুরো গরু নয়, ভাগে কোরবানির সুযোগও এখন মিলছে অনলাইনে। ঢাকায় কোরবানির অংশীদার খোঁজা ঝামেলার কাজ—এই সমস্যার সমাধান দিচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠান। একটি গরুকে সাত ভাগে ভাগ করে অনলাইনে বুকিং নেওয়া হয়। ভাগের দাম নির্ধারণ করা হয় গরুর আকার অনুযায়ী।

ভাগে কোরবানির সুযোগ

শুধু পুরো গরু নয়, ভাগে কোরবানির সুযোগও এখন মিলছে অনলাইনে। ঢাকায় কোরবানির অংশীদার খোঁজা ঝামেলার কাজ—এই সমস্যার সমাধান দিচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠান। একটি গরুকে সাত ভাগে ভাগ করে অনলাইনে বুকিং নেওয়া হয়। ভাগের দাম নির্ধারণ করা হয় গরুর আকার অনুযায়ী।

সেবাটি পুরোপুরি ঝামেলামুক্ত। ঈদের দিন পশু জবাই থেকে শুরু করে মাংস প্রস্তুত করে সরাসরি বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। যাঁরা সারা বছর এসব প্রতিষ্ঠান থেকে মাছ-মাংস কেনেন, তাঁরাই মূলত এই সুবিধা বেশি নিচ্ছেন।

২০১৬ সাল থেকে ঢাকায় এই অনলাইন শেয়ারিং সিস্টেম চালু করে সেতারা ফার্ম। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা বাবলু চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সেবাটি এখন বেশ জনপ্রিয়। এবার তাঁদের বেশির ভাগ প্যাকেজ আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, এখন প্রবাসীদের পাশাপাশি অনেক পেশাজীবীও অনলাইনে ভাগে গরু কিনছেন।

অনলাইনে শুধু পশু কেনা নয়, কসাই খোঁজার সুবিধাও এখন মিলছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। চাহিদা বাড়ায় অনেক উদ্যোক্তা এখন শুধু কসাইসেবা দেওয়ার দিকেও ঝুঁকছেন। ডিজিটাল পশুর হাটের এটি নতুন একটি দিক।

অনলাইনে মিলছে কসাই সেবাও

অনলাইনে শুধু পশু কেনা নয়, কসাই খোঁজার সুবিধাও এখন মিলছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। চাহিদা বাড়ায় অনেক উদ্যোক্তা এখন শুধু কসাইসেবা দেওয়ার দিকেও ঝুঁকছেন। ডিজিটাল পশুর হাটের এটি নতুন একটি দিক।

তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সময়ের চাপ। ডানাজ স্টোর নামের একটি অনলাইন কসাইসেবার উদ্যোক্তা মো. কবীর প্রথম আলোকে বলেন, অধিকাংশ মানুষ সকাল সাতটার মধ্যেই কোরবানি শেষ করতে চান। ফলে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক কসাইয়ের প্রয়োজন পড়ে, যা সামলানো কঠিন হয়ে যায়।