বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫০ শতাংশ গর্ভধারণই ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে, যা মা ও শিশুস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় ঝুঁকি। এই অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধ, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতকরণ এবং জনগণের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য অধিকার সম্পর্কে সর্বস্তরে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে আজ ২৬ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস’। আন্তর্জাতিকভাবে আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য, ‘কোনো বাধা নয়, কেবলই পছন্দ: এখনই নিশ্চিত হোক গর্ভনিরোধক পণ্যের সহজলভ্যতা’।
একসময় দেশে পরিবার পরিকল্পনা বা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা ছিল চরম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ট্যাবু। তবে বিগত কয়েক দশকে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ঘরে ঘরে গিয়ে উঠান বৈঠক, প্রাতিষ্ঠানিক সেবা প্রসার এবং প্রযুক্তির প্রভাবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ফলে কুসংস্কার ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করে পরিবার পরিকল্পনায় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ আজ এক অনন্য সফলতার উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় অর্ধেক গর্ভধারণ অনাকাঙ্ক্ষিত হওয়ার মূল কারণ সঠিক তথ্যের অভাব, আধুনিক নিরোধক পদ্ধতির অপ্রতুলতা এবং পছন্দের স্বাধীনতার অভাব। পরিকল্পিত পরিবার কেবল একজন নারীর প্রজননস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে না, বরং এটি একটি পরিবারের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও শিশুর বিকাশেও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। তাই প্রত্যেক দম্পতির নিজস্ব পছন্দে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করাই এই দিবসের মূল অঙ্গীকার।
পরিবার পরিকল্পনায় বাংলাদেশ প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও তরুণ প্রজন্মের কাছে মানসম্মত প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং সঠিক তথ্য পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সহজলভ্যতা বজায় রাখা এবং পছন্দের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করার মাধ্যমেই দেশকে একটি টেকসই ও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
দেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ইতিহাস বেশ পুরোনো এবং সমৃদ্ধ। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সরকারের একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই সময়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমন্বিত উদ্যোগে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ১৯৭৪ সালে ইউএসএআইডির অর্থায়নে এবং সরকারের সহযোগিতায় দেশে ‘ফ্যামিলি প্ল্যানিং সোশ্যাল মার্কেটিং প্রজেক্ট’ (বর্তমান এসএমসি) শুরু হয়।
এর পরপরই ১৯৭৭ সালে আইসিডিডিআরবির উদ্যোগে চাঁদপুরের মতলবে একটি পরীক্ষামূলক মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্প শুরু হয়। এই ‘মতলব প্রজেক্ট’ ছিল পরিবার পরিকল্পনার ইতিহাসে এক মাইলফলক। সেখানে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনা সেবা ও সচেতনতা দেওয়া হতো। এই মডেল পরবর্তী সময়ে সারা দেশে সরকারিভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে অভাবনীয় পরিবর্তন আনে। ১৯৭০-এর দশকে যেখানে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার (সিপিআর) ছিল মাত্র ৮ শতাংশ, বর্তমানে তা আশাব্যঞ্জক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ প্রজননস্বাস্থ্যে বেশ সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস ২০২২) অনুযায়ী, দেশে সার্বিক গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার ৬৪ শতাংশ। এর মধ্যে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার প্রায় ৫৫ শতাংশ। পদ্ধতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতি হলো খাওয়ার বড়ি, যার ব্যবহারের হার ৩৩ শতাংশ। এ ছাড়া ইনজেকশন ১১ শতাংশ, পুরুষ কনডম ৭ শতাংশ, দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পদ্ধতি ৮ শতাংশ এবং ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ৯ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে।
দেশের মোট প্রজনন হার (টিএফআর) বর্তমানে ২ দশমিক ১৭-তে নেমে এসেছে। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বা ডেলিভারির হার ৬৫ শতাংশ। শিশুদের পূর্ণাঙ্গ মৌলিক টিকাদানের হার ৭৮ দশমিক ২ শতাংশ।
বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ এত সফলতার পরও কিছু জায়গায় আমাদের আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে। যদিও বিডিএইচএস ২০২২-এর তথ্যানুযায়ী গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার ৬৪ শতাংশ ছিল, তবে ২০২৩ সালে এটি সামান্য কমে ৬২ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
দেশে পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদা এখনো ১২ শতাংশ; অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন বিবাহিত নারীর মধ্যে ১২ জন সন্তান জন্মদানে বিলম্ব বা বিরতি চান, কিন্তু উপযুক্ত কোনো গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহার করছেন না। বিশেষ করে ১৫-১৯ বছর বয়সী বিবাহিত কিশোরীদের ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদা সবচেয়ে বেশি (প্রায় ১২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশ)। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বিবাহিত তরুণীদের ২৩ শতাংশ মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া ২০২৩-এর তথ্যমতে, দেশে ১৮ বছরের নিচে বাল্যবিবাহের হার ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ।
গর্ভনিরোধক পদ্ধতি গ্রহণ করার পর তা বন্ধ করে দেওয়ার হার প্রায় ৩০ শতাংশ। মূলত সঠিক কাউন্সেলিংয়ের অভাব, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয় এবং গুজবের কারণে নারীরা স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতি মাঝপথে ছেড়ে দেন। গর্ভনিরোধক পদ্ধতি পরিত্যাগের প্রধান কারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলে জরিপে তথ্যে উঠে এসেছে।
মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে দেখা যায়, গর্ভাবস্থায় অন্তত ৪টি অ্যান্টিনেটাল কেয়ার (এএনসি ৪+) গ্রহণের হার শহরে ৭৭ দশমিক ৪০ শতাংশ হলেও গ্রামে তা মাত্র ৫২ দশমিক ১০ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের ৮৪ শতাংশই সম্পন্ন হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে। দেশে মোট প্রসবের ৪৫ শতাংশ সিজারিয়ানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৩ সালের সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে সিজারিয়ানের হার বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
নবজাতকের মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ২০ জন ছিল, যা ২০২৩-এ বেড়ে প্রতি হাজারে ২৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া ৫ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩১টি।
আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগ পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য ও টিকাদান কর্মসূচিতে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হারও চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে জাতীয় গড়ের চেয়ে কম। অন্যদিকে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে এই হার সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশ সরকার ‘জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশল ২০২৫–৩০’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার ৭৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদা ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
লক্ষ্য অর্জনে যে কার্যকরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার—
সচেতন কাউন্সেলিং: গর্ভনিরোধক পদ্ধতি গ্রহণের আগে ও পরে স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে সঠিক কাউন্সেলিং নিশ্চিত করা, যেন পদ্ধতি পরিত্যাগের হার কমে।
দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতিতে জোর: স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিরাপদ দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পদ্ধতির (আইইউডি, ইমপ্ল্যান্ট) প্রসার ঘটানো।
পুরুষের অংশগ্রহণ: পরিবার পরিকল্পনায় পুরুষদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও সচেতনতা বাড়ানো।
তরুণদের প্রজননশিক্ষা: বাল্যবিবাহ রোধ এবং প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রদান।
সঠিক পরিকল্পনা, সরকারের উদ্যোগ এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় দেশের পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজননস্বাস্থ্য একদিন তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে।