
ভালো চাকরি ও সচ্ছল জীবনের আশায় কম্বোডিয়ায় যান দুই বাংলাদেশি তরুণ। তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয় প্রায় ছয় লাখ টাকা করে। কিন্তু দেশটিতে পৌঁছানোর পর তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর পাঁচ হাজার মার্কিন ডলারে ‘বিক্রি’ করে দেওয়া হয় একটি স্ক্যাম সেন্টারে। সেখানে জোর করে অনলাইনে প্রতারণামূলক কাজে বাধ্য করা হতো তাঁদের। কাজ করতে না চাইলে চলত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
দুই তরুণকে কম্বোডিয়ায় পাচার ও প্রতারণার কাজে বাধ্য করার অভিযোগে মানব পাচার চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর পল্টন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. শাওন মোল্লা (২৩) ও মো. সাকিব সরকার (২৬)। তাঁদের বাড়ি গাজীপুরের পুবাইল এলাকায়।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের বরাতে সিআইডি জানায়, স্ক্যাম সেন্টারে অনলাইনে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানালে কিংবা সামান্য ভুল করলেও তাঁদের নির্যাতন করা হতো। সেখান থেকে নিজের ইচ্ছায় বেরিয়ে আসা বা নিরাপদে দেশে ফেরার সুযোগ ছিল না।
দেশে ফিরতে কয়েক দফায় মুক্তিপণ আদায় করার কথা উল্লেখ করে সিআইডি জানায়, একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন ওই দুই তরুণ। স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রির পরে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে তাঁদের পরিবারের কাছে আরেক দফা পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার মুক্তিপণ দাবি করা হয়। সন্তানদের মুক্তির আশায় পরিবারের সদস্যরা মুক্তিপণ দেন। মুক্তির পরও মানব পাচারকারীরা তাঁদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। দেশে ফেরার বিমানের টিকিটের জন্যও আরেক দফা টাকা আদায় করা হয়।
সিআইডি জানায়, মুক্তির পরও তাঁরা প্রায় দুই মাস কম্বোডিয়ার একটি স্থানীয় হোটেলে থাকেন। একপর্যায়ে অনলাইনে ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের সহায়তায় গত ৩ সেপ্টেম্বর তাঁরা বাংলাদেশে ফেরেন। দেশে ফিরে ২৬ অক্টোবর এ ঘটনায় পল্টন থানায় মামলা করা হয়। ওই মামলায় শাওন মোল্লা ও সাকিব সরকারের নাম উল্লেখ করা হয়। পরে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলছে।
নতুন বাজারের নামে প্রতারণা
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার কিছুটা সংকোচিত হয়ে আসছে। এ জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্থিক দিক দিয়ে কিছুটা সচ্ছল ব্যক্তিরা রাশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে যাচ্ছেন। সেখানে গিয়ে অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। রাশিয়ায় অন্য কাজ দেওয়ার নাম করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। এর মধ্যে অনেক বাংলাদেশি হতাহতও হয়েছেন।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কম্বোডিয়ায় যেতে ১২ হাজার ২৬৩ জন বাংলাদেশি ছাড়পত্র নিয়েছেন। দেশটি ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারে ৮ নম্বর অবস্থানে উঠে এসেছে। রাশিয়ান ফেডারেশনে গেছেন ৪ হাজার ৭২৭ জন। রাশিয়া রয়েছে ১৩ নম্বর অবস্থানে।
কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশিদের নেওয়া হয় কলসেন্টারে চাকরির নামে। এরপর তাঁদের দিয়ে করানো হয় অনলাইন প্রতারণা। আন্তর্জাতিক চাপে সম্প্রতি এসব ‘স্ক্যাম সেন্টারে’ অভিযান চালিয়ে সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর জুনে ফিরে এসেছেন ৬৪৬ জন বাংলাদেশি কর্মী। প্রতিদিন ফিরছেন, আরও অনেকে ফেরার অপেক্ষায়।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কম্বোডিয়ার অর্থনীতি বাংলাদেশের চেয়ে ভালো নয়। সেখানে চাকরির সুযোগ কম। তারপরও সেখানে কর্মীদের পাঠানো হয় স্ক্যাম সেন্টারের জন্য। কেউ কেউ দেশে ফিরতে পেরেছেন। অনেকেই দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে বার্তা পাঠাচ্ছেন।