গুলশানের সড়ক ছেয়ে আছে প্রার্থীদের ব্যানারে
গুলশানের সড়ক ছেয়ে আছে প্রার্থীদের ব্যানারে

ভোট ঘিরে এই শহরে এখন উৎসবের আমেজ

এবার ফাগুন আর নির্বাচন হাত ধরাধরি করে এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এখন কয়েক ঘণ্টা দূরত্বে। আর ফাগুন শুরু হবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের এক দিন পর। তবে ফাগুন শুরুর আগেই নির্বাচন ঘিরে শহরে উৎসবের আমেজ ঢুকে পড়েছে। সাদা–কালো ব্যানারে ছেয়ে যাওয়া শহরের জায়গায় জায়গায় প্রার্থীদের নির্বাচনী খুপরি ক্যাম্প অফিস। সড়কে মাথার ওপর ঝুলছে ব্যানার। ফুটপাতের প্রায় ন্যাড়া গাছগুলোও ঢেকে গেছে ব্যানারে। মাঠের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত অবধি ব্যানারই যেন সীমানাপ্রাচীর। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা সশরীর একে অপরের বিপরীতে অবস্থান করলেও পাশাপাশি ঝুলিয়ে রাখা ব্যানারে তাঁদের ‘সহাবস্থান’ চোখে পড়ার মতো।

নির্বাচন ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলে চার দিনের ছুটি শুরু হয়ে গেছে বুধবার থেকে। বুধবার বেলা ১১টায় সড়কে বেরিয়ে চিরচেনা ব্যস্ত সেই রাজধানীর দেখা পাওয়া যায়নি। ছুটির দিনের চেয়েও বেশি নিরিবিলি পরিবেশ দেখা গেছে। যানবাহন কম, লোকজনের চলাচল কম। তবে তুমুল ব্যস্ততা দেখা গেল ভোটকেন্দ্রগুলোতে।

স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার বুঝে নেওয়া, কাপড় দিয়ে ঢাকা বুথ তৈরি, বুথের দায়িত্ব বুঝে নেওয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যদের অবস্থান, প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের বিচরণ ঘিরে মুখর কেন্দ্রগুলো। আর সেই সব কেন্দ্র ঘিরে মুখর ফুটপাতের চায়ের দোকানগুলোও।

‘চায়ের কাপে নির্বাচনী আলাপের ঝড়’ না থাকলেও নির্বাচন ঘিরে কৌতূহল ও গল্প জারি আছে। দোকানি যেমন একগাল হেসে বলেছেন, ‘নির্বাচনের কিছু গল্প তো হবেই’। ঢাকা–১৭ আসনের গুলশান, ঢাকা–১১ আসনের বাড্ডা, রামপুরা, মহানগর আবাসিক এলাকা ও ঢাকা–১২ আসনের তেজগাঁও শিল্প এলাকার মোট ৬টি ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে এসব দৃশ্য। ভোটাররা সবার আগে ভোট দেওয়ার নিরাপত্তা চেয়েছেন।

গুলশান মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। মাঠের স্যাঁতসেঁতে ভাব দূর করতে অফিস সহকারী দীপালি রাণী শুকনো রঙের গুঁড়া ছিটিয়ে দিচ্ছেন

‘ভিআইপি ভোটার’—চলছে পরিচ্ছন্নতা

গুলশান মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের বয়স স্বাধীন বাংলাদেশের বয়সের সমান। ঢাকা–১৭ আসনে এই ভোটকেন্দ্রটি অবস্থিত। কেন্দ্রটিকে ‘ভিআইপিদের কেন্দ্র’ বলে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। এ কেন্দ্রে ভোট দেবেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিএনপির চেয়ারম্যান ও এই আসনের প্রার্থী তারেক রহমান। আসনটিতে মোট ১২ জন প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াত প্রার্থী স ম খালিদুজ্জামানের মধ্যে। মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন।

বেলা সাড়ে ১১টায় কেন্দ্রটিতে গিয়ে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবস্থান নিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) লোকজন এসে হ্যালোজেন লাইটের ব্যবস্থা করছিলেন। নির্বাচন উপলক্ষে মাস দেড়েক আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি রং করা হয়েছে। নারকেলগাছের গোড়াগুলোও রঙের কারণে চকচক করছে। মাঠের এক কোণের স্যাঁতসেঁতে ভাব দূর করার জন্য সেখানে শুকনো রঙের গুঁড়া ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী দীপালি রাণী। তাঁর মতো আরও পাঁচজন কর্মী ব্যস্ত ছিলেন পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার কাজে।

গুলশান মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে হ্যালোজেন লাইট স্থাপনের কাজ করছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কর্মীরা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. রুবেল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা ভিআইপি এলাকা। ফলে নিরাপত্তাব্যবস্থা কিছুটা বেশি আছে। রাতে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা থাকবেন। সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দেড় মাস আগে পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রং করা হয়েছে। এখন শেষ সময়ে কিছু পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হচ্ছে। হ্যালোজেন লাইট ছিল না, এখন ডিএনসিসি থেকে সেই সংযোগ দেওয়া হচ্ছে।’

এই কেন্দ্রে ভোট দেবেন এলাকার ভোটার শারমিন ফারহানা চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর কাছে ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রার্থী ভোট চাননি। তবে চলার পথে একজন প্রার্থীর কর্মীরা ভোট দিতে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘ভোট দিতে যাব। যিনি যোগ্য, তাঁকেই ভোট দেব।’

বাড্ডায় সিরাজ মিয়া মেমোরিয়াল মডেল স্কুল কেন্দ্রে আনা হচ্ছে ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি থেকে দুই মিনিটের দূরত্বে ফুটপাতজুড়ে নির্বাচনী ক্যাম্প করা হয়েছে। এত কম দূরত্বে এত বেশি নির্বাচনী ক্যাম্প করার মানা থাকলেও সেখানে তা মানা হয়নি। এমনই একটি ক্যাম্পে বসে কথা হয় মৎস্যজীবী দলের গুলশান থানার সহসভাপতি মো. গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সবাই ক্যাম্প করতে চায়, এ জন্য সংখ্যায় বেশি হয়ে গেছে।’ তিনি দাবি করেন, তাঁরা প্রতিটি ভোটারের কাছে পৌঁছেছেন। এই এলাকায় কেউ বাড়ির মধ্যে ঢুকতে দেয় না। ফলে বাড়ির ম্যানেজার ও নিরাপত্তাকর্মীর কাছে তাঁরা ভোট চেয়ে লিফলেট দিয়েছেন।

ক্যাম্পের পাশে ফুটপাতের দোকানে তিন বছর ধরে কাজ করেন আল আমিন। তিনি গুলশান মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেবেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চায়ের স্টলে এসে লোকজন নির্বাচনের আলাপ তো কিছুটা করেই।

স্টলে বসে চা পান করছিলেন ধানমন্ডির ভোটার ফিওনা হাসান, নেত্রকোনার ভোটার জবা রিচিল, শরীয়তপুরের ভোটার আশিকুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভোটার মেহেদী হাসান। তাঁরা জানান, কাজের সূত্রে এখানে এসেছেন। মেহেদী হাসান বলেন, তিনি এলাকায় গিয়ে ভোট দেবেন। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ে ওঠার প্রত্যাশা করেন তিনি।

সিরাজ মিয়া মেমোরিয়াল মডেল স্কুল কেন্দ্রের সামনের মাঠ ঘিরে ঝুলছে প্রার্থীদের ব্যানার

আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় ভোটাররা

তেজগাঁও শিল্প এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কাপড় দিয়ে বুথ তৈরি করছেন কয়েকজন কর্মী। প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাবিব বলেন, তিনি ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স বুঝে পেয়েছেন। তাঁর কেন্দ্রে ১ হাজার ৭৬০ ভোটার রয়েছেন। এটা পুরুষ কেন্দ্র।

এলাকাজুড়ে ব্যানার। কেন্দ্রটি ঘিরে ব্যানারের আধিক্য বেশি। এটা ঢাকা–১২ আসনের নির্বাচনী এলাকা। এ আসনে মোট প্রার্থী ১৫ জন। এর মধ্যে দুজন নারী প্রার্থী রয়েছেন। তাঁরা হলেন গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আখতার ও ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মোছা. সালমা আক্তার। মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩২০ জন।

বাড্ডায় সিরাজ মিয়া মেমোরিয়াল মডেল স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ব্যালট বাক্স ও ব্যালটে পেপার নিয়ে প্রবেশ করছেন নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা। প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই মাত্র ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার হাতে পেলাম। এখানে নির্বাচনের প্রস্তুতি সব শেষ। এটা নারীদের কেন্দ্র, ভোটার রয়েছে ৩ হাজার ১৪ জন।’

এই কেন্দ্রটির বাইরে বসেছিলেন ফাতেমা। ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন চালানো এই নারী বলেন, একটা কাজের ব্যবস্থা যেন হয় সেটাই তিনি চান। তাঁর পরিবারে তিনি একাই ভোটার।

এই এলাকাটি ঢাকা–১১ আসনের মধ্যে পড়েছে। একজন নারীসহ মোট ১০ জন প্রার্থী রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, বিএনপির এম এ কাইয়ুম ও জাতীয় নাগরিক পার্টি–এনসিপির মো. নাহিদ ইসলামের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এই আসনের মহানগর আবাসিক এলাকার আল ফুরকান ইংলিশ হাইস্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজ, ওয়ার্ল্ড ভিউ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে এখনো ভোটের সরঞ্জাম এসে পৌঁছায়নি। নির্বাচনের দায়িত্বরত ব্যক্তিরাও আসেননি। ওই দুটি কেন্দ্র ঘুরে রামপুরা একরামুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও নির্বাচনের সরঞ্জাম এসে পৌঁছায়নি।

তেজগাঁও শিল্প এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে কাপড় দিয়ে বুথ তৈরি করছেন নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মী

এলাকার তরুণ ভোটার মুরসালিন নোমানি এই স্কুলেই পড়েছিলেন। তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতি দেখতে এসেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তাঁর পরিবারে পাঁচজন ভোটার রয়েছেন। তাঁরা প্রত্যেকে ভোট দেবেন। এর আগের ভোটগুলোতে তাঁরা কোনো আগ্রহ পেতেন না। এবার নির্বাচন নিয়ে তাঁদের অনেক আগ্রহ। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ভোটের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। নিরাপদে যেন ভোট দিতে পারেন, সেই পরিবেশ চান তিনি।

একরামুন্নেছা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলেন এলাকার কয়েকজন। তরুণ ভোটার মো. আবুল হাসানাত খান সিয়াম বলেন, এখন পর্যন্ত তাঁর কাছে ভোটের পরিবেশ উৎসবমুখর মনে হচ্ছে। চা বিক্রেতা মো. মমতাজউদ্দিন খান বলেন, তিনি চাঁদপুরের ভোটার। আজ রাতেই যাবেন এলাকায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে ভোটের আলাপ করেন সবাই। নজরুল ইসলাম নামের এক ভোটার ভ্যানে মালামাল বিক্রি করেন। তিনি বলেন, তাঁর পরিবারের চার সদস্য ভোট দিতে গ্রামে চলে গেছেন। তবে তিনি বাড়ি খালি রেখে যাবেন না বলে রয়ে গেছেন।

মো. আব্বাস নামে এক ভোটার বলেন, তাঁর পরিবারে ৮টি ভোট রয়েছে। তাঁরা ভোট দেবেন। ভোটার হিসেবে এলাকায় এখন গুরুত্ব বেড়েছে। এটা দেখে ভালো লাগছে। তিনি চান, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ে উঠুক। এলাকায় কোনো চাঁদাবাজি না হোক। দেশে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ থাকুক।