পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’–এর একাদশতম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন ফ্যাশন ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা সাফিয়া সাথী
পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’–এর একাদশতম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন ফ্যাশন ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা সাফিয়া সাথী

লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩

দেশীয় কারুশিল্পে ব্রাইডাল ফ্যাশনের নতুন সম্ভাবনা গড়ছেন সাফিয়া সাথী

তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবসা ও সম্ভাবনার গল্প। তবে একটি উদ্যোগ শুরু করা থেকে সেটিকে টিকিয়ে রাখা এবং এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ নয়। নানা চ্যালেঞ্জ, সিদ্ধান্ত ও শেখার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কীভাবে গড়ে তুলছেন নিজেদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান—সেই সব গল্প নিয়েই প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’। এই পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন ফ্যাশন ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা সাফিয়া সাথী।

‘বাংলাদেশ মানেই শুধু নির্দিষ্ট কিছু ঐতিহ্যবাহী কাপড়—এভাবে ভাবলে চলবে না। দৈনন্দিন ব্যবহারের আধুনিক পোশাকেও আমাদের কাপড় ব্যবহার করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের কাপড়ের উপস্থিতি আছে; কিন্তু নকশা, পোশাক তৈরির ধরন ও বিশ্বব্যাপী প্রচারের ঘাটতির কারণে আমরা অনেক ক্ষেত্রে বড় ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারিনি।’

পডকাস্টে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন সাফিয়া সাথী। প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে গত শনিবার পর্বটি প্রচারিত হয়।

শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান সাফিয়া সাথী কীভাবে পরিবারের প্রত্যাশা আর নিজের স্বপ্নের মধ্যে সমন্বয় করেছেন?

উত্তরে সাফিয়া সাথী বলেন, ‘আমার বাবা চাইতেন তাঁর সন্তানদের অন্তত একজন আইনজীবী বা ব্যারিস্টার হোক। তাঁকে খুশি করার জন্য কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতাম, বড় হয়ে ব্যারিস্টার হতে চাই। কিন্তু মন থেকে আমার আগ্রহ ছিল ফ্যাশন ডিজাইনের প্রতি। বাবাকে না দেখিয়ে লুকিয়ে সেলাই করতাম। বাবা ফ্যাশন ডিজাইনকে তখন খুব সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে দেখতেন না। তবে তিনি চাইতেন, তাঁর মেয়েরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হোক। আমি নিজের আগ্রহটা ধরে রেখেছিলাম এবং অবসর সময়ে এ নিয়েই কাজ করতাম।’

ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে পড়ার ইচ্ছা থাকলেও অন্য একটি সাবজেক্টে পড়াশোনা করেছেন সাফিয়া সাথী। প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে সঞ্চালক জানতে চান, সেই সময় নিজের আগ্রহ ধরে রেখেছিলেন কীভাবে?

সাফিয়া সাথী বলেন, ‘আমার ইচ্ছা ছিল ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে পড়ার। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করি। তখন মনে হতো, নিজের প্যাশন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। তবে ফ্যাশনের প্রতি আগ্রহটা কখনো হারিয়ে ফেলিনি। ক্লাসের বাইরে অবসর সময়টুকু পুরোপুরি এ কাজে দিতাম। সেই সময়ই নিজের অনলাইন পেজ শুরু করি। আমার কাছে এটা একধরনের ভালো নেশার মতো ছিল।’

এরপর সঞ্চালক জানতে চান, আপনার ছোটবেলা তো টাঙ্গাইলে কেটেছে। তাঁতের শাড়ির জন্য পরিচিত এই এলাকার পরিবেশ আপনার নকশার ভাবনায় কতটা প্রভাব ফেলেছে?

সাফিয়া সাথী বলেন, ‘সেটা অনেক প্রভাব তো ফেলেছেই। তবে আমাদের পরিবারেও সৃজনশীলতার চর্চা ছিল। আমার বড় ভাইয়েরা ছবি আঁকতেন, ছোটবেলায় আমিও ছবি আঁকতাম। তাঁতের শাড়ির রঙের সমন্বয়, কাপড়ের বুনন ও টেক্সচার আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করে।’ তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় মা যখন তাঁতের শাড়ি কিনতেন, তখন শাড়িগুলোর ভাঁজ খোলা এবং একেকটি নকশা বেরিয়ে আসা দেখার মধ্যে অন্য রকম আনন্দ পেতাম। এখন বুঝতে পারি, ছোটবেলা থেকেই যেকোনো ধরনের কাপড়ের প্রতি আমার আলাদা আকর্ষণ ছিল।’

আপনার ডিজাইনগুলো অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়াতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই নকল হয়ে যেত। এই চ্যালেঞ্জ কীভাবে সামলেছেন?

জানতে চাইলে সাফিয়া সাথী বলেন, ‘আমি যখন বিভিন্ন জায়গায় ব্লক দিয়ে কাজ করাতাম, তখন আমার ডিজাইনের যেসব উপাদান সহজে নকল করা সম্ভব, সেগুলো দ্রুত কপি হয়ে যেত। হয়তো একটি ডিজাইনের নমুনা তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশ করেছি, পরের সপ্তাহেই দেখতাম সেটি অন্যরা নকল করে বাজারে নিয়ে এসেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি ব্যবসার জন্য কঠিন ছিল। পরে আমি বুঝতে পারি, এমন কিছু নিয়ে কাজ করতে হবে, যেখানে নকশার পাশাপাশি কাজের সূক্ষ্মতা, কারিগরি দক্ষতা ও নিজস্বতা গুরুত্বপূর্ণ।’

এরপর সঞ্চালক জানতে চান, আপনি এখন কাজ করছেন নিজস্ব ডিজাইনে বিয়ের পোশাক নিয়ে, এই জায়গাটিকে বেছে নেওয়ার পেছনে কী ভাবনা কাজ করেছে?

উত্তরে সাফিয়া সাথী বলেন, ‘আমি চেয়েছি বাংলাদেশের মানুষ যেন বিশেষ অনুষ্ঠান বা বিয়ের পোশাক কেনার জন্য অন্য দেশে যেতে বাধ্য না হন। আমাদের দেশেই দক্ষ কারিগর আছেন, ভালো কাপড় আছে এবং নকশা তৈরির সম্ভাবনাও অনেক। এসবকে কাজে লাগিয়ে এমন পোশাক তৈরি করা সম্ভব, যেগুলো মানুষ বিশেষ দিনে পরতে চাইবেন। আমার লক্ষ্য ছিল দেশীয় উপকরণ ও কারিগরি দক্ষতা দিয়ে স্বতন্ত্র কিছু তৈরি করা।’

ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অর্থায়ন ও টিকে থাকার চ্যালেঞ্জও ছিল সাফিয়া সাথীর। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে কীভাবে নিজের উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়েছেন?

এ প্রসঙ্গে সাফিয়া সাথী বলেন, ‘শুরু থেকেই ব্যবসাটা নিজের সামর্থ্যের মধ্যে পরিচালনা করার চেষ্টা করেছি। ব্যাংকঋণ পাওয়াও সহজ ছিল না। অনেক সময় একজন ম্যানেজার নিয়োগের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হতো, সেই টাকা একজন কারিগরের কাজে দিতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। আমার কাছে শুধু মুনাফা নয়, কাজের মান ও ব্যবসাটিকে টেকসইভাবে এগিয়ে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোথায় বিনিয়োগ করলে কাজের মান বাড়বে, সেটি ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

যাঁরা তাঁতের শাড়ি বোনেন বা হাতে কাজ করেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আপনি কী করেন?

সঞ্চালকের এই প্রশ্নের উত্তরে সাফিয়া সাথী বলেন, ‘টাঙ্গাইলে গিয়ে তাঁতিদের জীবনযাপন দেখলে তাঁদের জন্য আরও কিছু করার ইচ্ছা হয়। আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব, তাঁদের কাছ থেকে সরাসরি বেশি পণ্য অর্ডার করার চেষ্টা করি, যাতে তাঁদের ব্যবসা সচল থাকে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই আমি সাধারণত ৮০ শতাংশ অর্থ দিয়ে দিই। কারও বিল আটকে রেখে পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করি না। আমার কাছে কারিগরদের ন্যায্য মূল্য দেওয়া এবং তাঁদের কাজের প্রতি সম্মান দেখানো খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

আড্ডার শেষ পর্যায়ে সঞ্চালক জানতে চান, একটি ব্র্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কাজ ও জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া জরুরি। ভবিষ্যতে নিজের নামের বাইরে প্রতিষ্ঠানকে আপনি কীভাবে সামনে এগিয়ে নিতে চান?

সাফিয়া সাথী বলেন, ‘আমার পরিকল্পনা হলো, ব্র্যান্ডটি আমার নামে থাকলেও এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম বা আমার দলের সদস্যরা কাজগুলো এগিয়ে নিতে পারেন। আমাদের অনেক নকশা আছে, যেগুলো সময় পেরিয়েও প্রাসঙ্গিক থাকবে। সেগুলোর যথাযথ নথি তৈরি করা দরকার, যাতে ভবিষ্যতেও সেগুলো নিয়ে কাজ করা যায়। এ জন্য আমার একটি একাডেমি খোলার পরিকল্পনা আছে। পাশাপাশি কারিগর ও কর্মীদের দল আরও বড় করতে চাই, যেন আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারি।’