পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’–এর দশম পর্বে অতিথি ‘সম্ভব টেকনোলজিস লিমিটেডে’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হাসিবুর রহমান (বাঁয়ে)
পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’–এর দশম পর্বে অতিথি ‘সম্ভব টেকনোলজিস লিমিটেডে’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হাসিবুর রহমান (বাঁয়ে)

লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩

দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি স্বীকৃতিও নিশ্চিত করতে হবে: হাসিবুর রহমান

তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবসা ও সম্ভাবনার গল্প। তবে একটি উদ্যোগ শুরু করা থেকে সেটিকে টিকিয়ে রাখা এবং এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ নয়। নানা চ্যালেঞ্জ, সিদ্ধান্ত ও শেখার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কীভাবে গড়ে তুলছেন নিজেদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান—সেই সব গল্প নিয়েই প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’। এই পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন সম্ভব টেকনোলজিস লিমিটেডের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হাসিবুর রহমান।

‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা এবং বাস্তব চাকরির বাজারে কাজ করার অভিজ্ঞতা এক নয়। তাই শিক্ষার্থীদের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে সংযোগ বাড়াতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময় থেকেই বুঝতে পারেন, চাকরির বাজারে কী ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে।’

পডকাস্টে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন হাসিবুর রহমান। এ পর্বটি গত শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোয় প্রচারিত হয়।

আড্ডার শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান সম্ভব টেকনোলজিস লিমিটেডের কার্যক্রম এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা সম্পর্কে।

হাসিবুর রহমান বলেন, ‘চাকরি, ট্রেনিং, স্কিল ডেভেলপমেন্ট—অনেক কিছুই নিয়েই সম্ভব টেকনোলজিস লিমিটেড কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের কার্যক্রমের সঙ্গে মোট ৪০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সম্পর্ক রয়েছে, যার মধ্যে ১০ হাজার নারী। আমরা এমন একটি প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছি, যেখানে চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা যায়। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে অনেক মানুষ এর সঙ্গে যুক্ত।’ তিনি বলেন, মূলত এটি একধরনের ম্যাচমেকিং প্রক্রিয়া, যেখানে একজন চাকরিপ্রার্থীর দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে নিয়োগদাতার চাহিদার মিল তৈরি করা হয়।

দেশে গ্র্যাজুয়েটদের বেকারত্ব এবং তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সম্ভব টেকনোলজিসের উদ্যোগ প্রসঙ্গে জানান হাসিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে গ্র্যাজুয়েটদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো চাকরি পাচ্ছেন না। তাই শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করলেই হবে না, চাকরির বাজারের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করাও জরুরি। একজন চাকরিপ্রার্থীর কী ধরনের দক্ষতা রয়েছে এবং নিয়োগদাতা কী ধরনের দক্ষতা খুঁজছেন, তা আমাদের বুঝতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা প্রয়োজন।’

হাসিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি চাকরিপ্রার্থীদের যথাযথভাবে প্রস্তুত করার পাশাপাশি নিয়োগদাতাদের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে। কারণ, শেষ পর্যন্ত একজন প্রার্থীকে সঠিক চাকরির জন্য উপযুক্ত করে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ।’

চাকরিপ্রার্থীদের দক্ষতা এবং নিয়োগদাতাদের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় তৈরির ক্ষেত্রে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন?

সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে হাসিবুর রহমান বলেন, এ ক্ষেত্রে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ তৈরি করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। চাকরির বাজারে কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, তা বুঝে সেই অনুযায়ী মানুষকে প্রস্তুত করতে হবে। তিনি বলেন, ‘নিয়োগদাতাদের সঙ্গে যদি সহজে যোগাযোগ করা যায় এবং তাঁদের প্রয়োজন সম্পর্কে জানা যায়, তাহলে আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। এ জন্য সচেতনতা তৈরি করতে হবে, পার্টনারশিপ ডেভেলপ করতে হবে এবং বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু একটি ফাউন্ডেশন বা প্ল্যাটফর্ম থাকলেই হবে না, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ ও কমিটমেন্টও প্রয়োজন।’

কর্মসংস্থানে নারীদের অংশগ্রহণ এবং তাঁদের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরিতে প্ল্যাটফর্মটির ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চান সঞ্চালক।

হাসিবুর রহমান বলেন, ‘কর্মসংস্থানে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমরা বিশেষ করে নারীদের জন্য যাচাইকৃত চাকরির সুযোগ তৈরি করতে চাই। এখানে শুধু চাকরির বিজ্ঞাপন প্রকাশ করাই আমাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং চাকরির সুযোগটি কতটা নির্ভরযোগ্য এবং চাকরিপ্রার্থীর জন্য কতটা উপযুক্ত, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

হাসিবুর রহমান আরও বলেন, নারীদের প্রয়োজন, দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো বুঝতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগদাতাদেরও এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে নারীরা কাজের সুযোগ পাবেন এবং নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারবেন।

একজন চাকরিপ্রার্থী কীভাবে নিশ্চিত হবেন একটি প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত চাকরিগুলো প্রকৃত ও নির্ভরযোগ্য? এ বিষয়ে জানতে চাইল হাসিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রকৃত ও যাচাইকৃত চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই, চাকরিপ্রার্থীরা এমন একটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করুন, যেখানে তাঁরা নির্ভরযোগ্য চাকরির তথ্য পাবেন।’ তিনি বলেন, শুধু চাকরির বিজ্ঞাপন প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। চাকরির তথ্য, নিয়োগদাতার পরিচয় এবং চাকরিপ্রার্থীর যোগ্যতার সঙ্গে চাকরির সামঞ্জস্য—এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য, প্রমাণ এবং প্রয়োজনীয় রিসোর্সের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।

চাকরিপ্রার্থীদের অভিজ্ঞতা, অবস্থান ও ব্যাকগ্রাউন্ড বিবেচনায় প্রযুক্তি কীভাবে কাজে লাগানো যায়? এ প্রসঙ্গে হাসিবুর রহমান বলেন, ‘প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা চাকরিপ্রার্থীদের অভিজ্ঞতা, অবস্থান, ব্যাকগ্রাউন্ড ও দক্ষতা সম্পর্কে জানতে পারি। এরপর এসব তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের জন্য উপযুক্ত চাকরির সুযোগ খুঁজে বের করা সম্ভব। আমরা এমন ফিচার তৈরি করতে চাই, যা চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতা—দুই পক্ষের জন্যই কার্যকর হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সঙ্গে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সংযোগের বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে।’

এরপর সঞ্চালক বাংলাদেশের চাকরিপ্রার্থীদের আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত করার উপায় সম্পর্কে জানতে চান।

হাসিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এমন সার্টিফিকেশন প্রয়োজন, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং যার মাধ্যমে একজন চাকরিপ্রার্থীর দক্ষতা সম্পর্কে নিয়োগদাতারা ধারণা পেতে পারেন। আমাদের দেশে অনেক দক্ষ মানুষ রয়েছেন, কিন্তু তাঁদের দক্ষতা স্থানীয় নিয়োগদাতাদের কাছেও সব সময় পরিচিত নয়। তাই দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি সেই দক্ষতার যথাযথ প্রমাণ ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করছে। আমরাও সেসব অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারি এবং নিজেদের শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা কাজে লাগাতে পারি।’

একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তুলতে হলে শুধু একটি সেবা বা একটি বাজারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না বলে উল্লেখ করেন হাসিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজেদের ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হবে এবং বিভিন্ন খাতের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ খুঁজতে হবে। প্রযুক্তি, ব্যবসা, শিক্ষা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সহযোগিতা তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারের চাহিদা বুঝে নিজেদের সেবা উন্নত করতে হবে। আমরা যদি দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করতে চাই, তাহলে বাজারের পরিবর্তন বুঝতে হবে, নতুন সুযোগ খুঁজতে হবে এবং নিজেদের কার্যক্রমকে আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।’

সবশেষে সঞ্চালক জানতে চান, আগামী পাঁচ বছরে সম্ভব টেকনোলজিস লিমিটেডকে আপনি কোথায় দেখতে চান?

উত্তরে হাসিবুর রহমান বলেন, ‘আমি সম্ভবকে বাংলাদেশে তৈরি একটি বিশ্বমানের এইচআর সলিউশন হিসেবে দেখতে চাই। আমি চাই, বাংলাদেশ থেকেই এমন একটি সমাধান তৈরি হোক, যা শুধু দেশের বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও সেবা তৈরি করা, যা বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে।’