অন্য রকম

ঝরনা কলমের মহব্বত

ঝরনা কলমের লেখা এখনো অনেকের স্মৃতিতে জ্বলজ্বলে
ছবি: প্রথম আলো

‘যেটা ফেলে দেবেন, সেটা ঠিক করাই আমার কাজ।’

যিনি এ কথা বলছেন, তাঁর নাম মোস্তফা কামাল পাশা। এটা তাঁর কাগুজে নাম। মোস্তফা মহব্বত নামেই সবাই তাঁকে চেনেন। যা ফেলে দেওয়ার কথা বললেন, তা হলো ঝরনা কলম বা ফাউন্টেন পেন।

১৯০০ সালের আগে তৈরি সোনার নিবের একটি পার্কার কলম এসেছিল, সেটিও সারাই করে দিয়েছেন এই মহব্বত। যাঁর জীবনের ভালোবাসা বা মহব্বত কালির কলমের প্রতি। ৩৯ বছর ধরে কলম মেরামতের কাজ করে যাচ্ছেন। বলপয়েন্ট, জেলপেন আর কম্পিউটার কি-বোর্ডের যুগেও সারাইয়ের পাশাপাশি নিজের দোকানে বিক্রি করে যাচ্ছেন ঝরনা কলম ও কালি।

রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিচে বারান্দায় একটি শোকেস আর কাচঘেরা দেড়খানা তাক—এই নিয়ে মহব্বত পেন সার্ভিস। দোকানটি টেনেটুনে ১৫ বর্গফুট। কিন্তু কলমপ্রেমীরা এক নামেই চেনেন।

মোস্তফা মহব্বতের দোকানে শ্মশ্রুমণ্ডিত এক তরুণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। দুটি কলম নিয়ে এসেছেন। তরুণের নাম আবদুস সালাম। পেশায় ব্যাংকার। তিনি কলম সংগ্রাহক। সংগ্রহে আছে ৩৫০টির বেশি ঝরনা কলম। সালাম বলেন, ‘২০০৪ সাল থেকে কলম সংগ্রহ করছি।

আর ২০০৮ থেকে মহব্বত ভাইয়ের কাছে আসি। যেকোনো কলম, তা সেটি যত পুরোনোই হোক, মহব্বত ভাই মেরামত করে দিতে পারেন।’ সালামের কাছে আছে জার্মানির বিখ্যাত কলম নির্মাতা মঁ ব্লঁা ১৭টি কলম। সবচেয়ে দামি যেটি, সেটা ফাবের-কাসটেলের। দাম পাঁচ হাজার ইউরো। শেফার হাফ স্টিল ও পারকার এস-১ কলম থাকে দৈনন্দিন কাজের জন্য।

এসবের সঙ্গে কলম সারাইয়ের কাজ তখনো করে গেছি। এভাবে পাঁচ-ছয় বছর চলল।
মহব্বত

এমন অনেক গ্রাহক-সংগ্রাহক রয়েছেন বলে জানালেন মহব্বত। প্রায় ৬০ বছর বয়সী মোস্তফা মহব্বতের কলমপ্রেমের শুরু ১৯৮২ সালে। জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) পড়তেন। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেন পরপর দুবার। মহব্বতের ভবিষ্যৎ নিয়ে মা-বাবা চিন্তিত। চাকরি নিলেন বাংলাদেশ আনসার বাহিনীতে।

‘ডিআইটি ভবন (বর্তমান রাজউক) ছিল আমার কর্মস্থল। চাকরি ভালো লাগে না। অবসর পেলেই বায়তুল মোকাররমে ঘুরতাম। বিভিন্ন দোকানের চাকচিক্য আমাকে টানত।’ বললেন মহব্বত। আনসারের চাকরি ছেড়ে দিলেন দ্রুতই। সেই সময় তাঁর এক খালাতো ভাই বায়তুল মোকাররম মার্কেটের বারান্দায় কলমের পাইকারি দোকান দিয়েছেন। মহব্বতের মা সেই দোকানে বসতে বললেন। কলমের সঙ্গে মহব্বতের ভালোবাসা তৈরি হলো।

মোস্তফা মহব্বত

খালাতো ভাইয়ের দোকানে ছয় মাস কাজ করেন মহব্বত। ব্যবসাটা তাঁরা ছেড়ে দেন। মহব্বত তাঁর এক চাচার কাছ থেকে চার হাজার টাকা ধার করে চকবাজার থেকে কলম-কালি কিনে নিজেই দোকান শুরু করেন। কলম আনেন, বিক্রি করেন—মেরামত করে দেন শখে। অনেক সময় টাকাও নিতেন না। এখনো এ ধারাই চলছে।

ঝরনা কলমের চাহিদা কমে যায় একসময়। বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটে গাজী পেন হাউসের মালিক ২০০৭ সালে মুঠোফোন মেরামতের প্রশিক্ষণ নিতে বলেন মহব্বতকে। মহব্বত সেই বিদ্যা শিখলেন। ‘এসবের সঙ্গে কলম সারাইয়ের কাজ তখনো করে গেছি। এভাবে পাঁচ-ছয় বছর চলল।’ বলেন মহব্বত।

বিদায় নেওয়ার আগে একটি ঝরনা কলম দিয়ে মহব্বত লিখে দেন, ‘মাই নেম ইজ মহব্বত’। এরপর সই করেন। ঝরনা কলমের তাজা লেখা যেন ক্যালিগ্রাফি। বোঝাই যায়, এটা শুধু পেশা নয়, এটা ঝরনা কলমের প্রতি মহব্বতের মহব্বত।

মুঠোফোন মেরামতের কাজে মজা পাচ্ছিলেন না। একসময় সে কাজ ছেড়েই দেন। মহব্বত বললেন, ‘হঠাৎ দেখলাম মার্কেটের একটা কলমের দোকানের মালিক অসুস্থ, দোকান বিক্রি করবেন। ভাবলাম দোকানটা তো নিতে পারি। মাসে মাসে দুই হাজার করে টাকা দেব, এমন ব্যবস্থায় দোকানটা পেলাম। প্রথমে শুধু মেরামত শুরু করলাম।’

নতুন-পুরোনো কলম নিয়ে আবার মহব্বত পেন হাউসের যাত্রা শুরু হলো ২০১৮ সালে। মহব্বত বলেন, ‘ফেসবুকে কলমপ্রেমীদের এক গ্রুপে যুক্ত হলাম। আমার এক গ্রাহক মহব্বত পেন রিপেয়ার সার্ভিস নামে ফেসবুক পেজ খুলে দিলেন। পেজ চালু হওয়ার পর দেখলাম ফাউন্টেন পেন নিয়ে অনেকের আগ্রহ রয়েছে।’

এভাবে ডিজিটাল যুগে পরিচিতি ও পসার বাড়তে থাকে মোস্তফা মহব্বতের। যিনি কাজ করেন একেবারেই ‘অ্যানালগ’ যুগের কলম নিয়ে।

বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের পুরোনো কলম কিনে সারাই করে বিক্রি করেন মহব্বত। কখনো আনান নিলামের ওয়েবসাইট ই-বে থেকে। কেউ কলমের চাহিদা জানালে সংগ্রহ করে দেন তিনি। কথায় কথায় জানালেন, ২০০৬ সালের দিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের কলম মেরামত করে দিয়ে এসেছিলেন বঙ্গভবনে গিয়ে।

মহব্বত জানালেন, পাঁচ-সাত বছর ধরে আবার ঝরনা কলমের চাহিদা বেড়েছে। অরোরা, মঁ ব্লঁা, পার্কার, শেফার, পাইলট, ওয়াটারম্যান, কার্টিয়ার, এস টি দুপোঁ ব্র্যান্ডের কদর কলমপ্রেমীদের কাছে বেশি। ঝরনা কলমের অনিবার্য অনুষঙ্গ দোয়াতের কালি। এখন পাওয়া যায় পাইলট, পেলিক্যান, পলার, ওয়াটারম্যান ইত্যাদি কালি।

বিদায় নেওয়ার আগে একটি ঝরনা কলম দিয়ে মহব্বত লিখে দেন, ‘মাই নেম ইজ মহব্বত’। এরপর সই করেন। ঝরনা কলমের তাজা লেখা যেন ক্যালিগ্রাফি। বোঝাই যায়, এটা শুধু পেশা নয়, এটা ঝরনা কলমের প্রতি মহব্বতের মহব্বত।