কারফিউ চলাকালে রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় একটি প্রাইভেট কারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ২১ জুলাই
কারফিউ চলাকালে রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় একটি প্রাইভেট কারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ২১ জুলাই

ফিরে দেখা

হত্যা-নির্যাতনে আন্দোলনে গতির পর কোটা সংস্কার করে রায়

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা। দাবি না মেনে আন্দোলন দমনে নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। আন্দোলন যত গড়িয়েছে, নির্যাতন তত বেড়েছে। নির্যাতন যত বেড়েছে, আন্দোলনও তত জোরালো হয়েছে, ছড়িয়ে পড়েছে।

নির্যাতন–নিপীড়নের এক পর্যায়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলি চালাতে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মীরা। তৎকালীন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে ১৭৭ জন শহীদ হন।

হত্যার পর আন্দোলন আর সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এ অবস্থায় ২০২৪ সালের ২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যখন সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার করে রায় ঘোষণা করেন, তা আন্দোলন প্রশমনে ভূমিকা রাখতে পারেনি। তখনকার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা যায় জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের একটি স্লোগান দিয়ে। সেটি হলো ‘তোর কোটা তুই নে, আমার ভাই ফিরিয়ে দে’।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের তৎকালীন পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ রায়ে সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরির সব গ্রেডে মেধার ভিত্তিতে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন। বাকি ৭ শতাংশ নিয়োগ কোটার ভিত্তিতে দেওয়ার বিধান রাখা হয় রায়ে। এ নির্দেশনার আলোকে নির্বাহী বিভাগকে অবিলম্বে প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ।

যখন রায় ঘোষণা করা হয়, তখনো দেশে কারফিউর পাশাপাশি মাঠে সেনাবাহিনী ছিল। রায়ের দিনও দেশে ১৯ ছাত্র–জনতার মৃত্যু হয়। যাঁদের মধ্যে ৭ জন আগে আহত হয়েছিলেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁদের মৃত্যু হয়। ফলে কোটা সংস্কার নিয়ে আপিল বিভাগের রায় হলেও ছাত্র-জনতাকে নির্বিচার গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথা জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

এ ছাড়া ২১ জুলাই ভোরে ঢাকার পূর্বাচল এলাকায় গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন রাস্তার পাশে ফেলে যান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলামকে (এনসিপি আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য)। এর আগে ১৯ জুলাই মধ্যরাতে খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া এলাকার একটি বাসা থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁকে ব্যাপক নির্যাতন করেন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন।

২০১৮ সালেও সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল। সেই আন্দোলনের পর কোটা পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়। জাতীয় সংসদে সব রকম কোটা বাতিলের ঘোষণার পর ২০১৮ সালের অক্টোবরে যে নির্বাহী পরিপত্র জারি করা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ২০২১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরা হাইকোর্টে রিট করেন।

হাইকোর্ট ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর কোটা পরিবর্তনের পরিপত্রটিকে বাতিল করে দেন। ফলে সব ধরনের কোটা আবার পুনর্জীবিত হওয়ার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়। সরকার এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। এ আপিল নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি হওয়ার প্রথম তারিখটি ঠিক হয় ৪ জুলাই। তবে সেদিন হাইকোর্টের দেওয়া রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের শুনানি মুলতবি করেন আপিল বিভাগ। তখন থেকেই আন্দোলন তীব্র হতে থাকে।