মেট্রোরেল
মেট্রোরেল

মেট্রোরেল

দাঁড়িয়ে গেলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী, অথচ বসে থাকলেন তরুণ ও মধ্যবয়সী পুরুষেরা

উত্তরা দক্ষিণ স্টেশন থেকে মেট্রোরেলে উঠলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী। সময়টা বুধবার দুপুরবেলা। বগিতে বসার কোনো জায়গা ফাঁকা ছিল না। বাধ্য হয়ে তাঁকে দাঁড়িয়েই পুরো পথ যেতে হলো। অথচ তাঁর পাশেই ছিল বয়স্ক ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ছয়টি আসন। এসব জায়গায় বসেছিলেন তরুণ ও মধ্যবয়সী পুরুষ যাত্রীরা। ট্রেন চলতে শুরু করার পর পরের স্টেশনগুলো থেকে ভিড় বাড়তে থাকল। ট্রেনের স্পিকারে বয়স্ক ব্যক্তি ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের বসার জায়গা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশনা বাজল কয়েকবার। কিন্তু সেখানে বসে থাকা যাত্রীদের কেউ ওই নারীকে জায়গা ছেড়ে দিলেন না।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি মেট্রোরেলের সামনের একটি কোচ কেবল নারীদের জন্য নির্ধারিত। এর বাইরে সাধারণ প্রতিটি কোচে সন্তান কোলে থাকা নারী, অন্তঃসত্ত্বা নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বসার সুবিধার জন্য ‘অগ্রাধিকার আসন’ রাখা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ কোচে এই নিয়ম মানার ক্ষেত্রে যাত্রীদের সচেতনতার বড় ঘাটতি দেখা যায়।

বেলা সোয়া ১টার দিকে শাহবাগ স্টেশনে কথা হয় মিরপুরের বাসিন্দা জিনাত তাজনিনের সঙ্গে। ৪৩ বছর বয়সী এই নারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি নিয়মিত এই পথে মেট্রোরেলে যাতায়াত করেন। জিনাত জানান, সাধারণ বগিতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য আলাদা আসন চিহ্নিত থাকলেও অনেক সময় তাঁদের বসতে দেওয়া হয় না। বেশির ভাগ সময় তরুণ ও যুবকেরা এসব জায়গা দখল করে থাকেন। নারী যাত্রীদের সঙ্গে শিশু থাকলেও অনেকে আসন ছেড়ে উঠতে চান না।

জিনাত নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, কিছুদিন আগে মিরপুর ১০ স্টেশন থেকে এক নারী সন্তান কোলে নিয়ে ট্রেনে ওঠেন। ওই সময় তাঁদের জন্য নির্ধারিত আসনে কয়েকজন তরুণ বসে ছিলেন। অনুরোধ করার পরেও তাঁরা ওঠেননি। উল্টো তাঁরা মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকার ভান করেন। আসন ছেড়ে দেওয়ার কথা বললে অনেকে কড়া ভাষায় নারীদের আলাদা কোচে যাওয়ার কথা বলেন।

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থী মেট্রোরেলে চলাচলের নিয়ম সম্পর্কে নিজের না জানার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, মেট্রোরেলে নারীদের জন্য আলাদা বগি থাকার বিষয়টি তিনি জানতেন। কিন্তু সাধারণ বগিতেও যে নির্দিষ্ট যাত্রীদের বসার বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর ধারণা ছিল না। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে যাওয়ায় তিনি তাড়াহুড়া করে সাধারণ বগিতে উঠে পড়েন। পরে স্পিকারে ঘোষণা শুনে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ তাঁকে নিজের জায়গা ছেড়ে দেননি।

মেট্রোরেলে নিয়মিত যাতায়াত করা যাত্রীরা বলছেন, সাধারণ বগিতে শিশু কোলে নারী কিংবা বয়স্ক ব্যক্তিরা উঠলেও অনেকে চোখ ফিরিয়ে মুঠোফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। স্পিকারে বারবার সচেতনতামূলক নির্দেশনা দেওয়া হলেও বাস্তবে তা মানার কোনো তদারকি চোখে পড়ে না। যাত্রীদের ভাষ্য, শুধু নিয়ম লিখে রাখা কিংবা স্পিকারে ঘোষণার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ না করে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের বসার অধিকার নিশ্চিতে কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

এ বিষয়ে মেট্রোরেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিএমটিসিএলের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন‍্যান্স) মো. নজরুল ইসলাম বুধবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, নারী, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের আসনগুলোতে স্টিকার লাগানো আছে। ছবি দেওয়া হয়েছে। ট্রেনের ভেতর ভিডিও ডিসপ্লেতে দেখানো হয়। অডিও ঘোষণা প্রচার করা হয়। চার ধরনের নির্দেশনা থাকার পরেও যদি না মানা হয়, তা দুঃখজনক। যাত্রীরা সচেতনতা থেকে মানবেন, এটাই চাওয়া। এখন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। এটা না করা লাগলেই ভালো হতো। তারপরও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা লাগছে।

বুধবার ভ্রাম্যমাণ আদালত মিরপুর ১১ মেট্রোরেল স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদ করে। সেই সঙ্গে মেট্রোরেলের কোচে অগ্রাধিকার আসনগুলোতে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত (বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও প্রবীণ ব্যক্তি) যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয় বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।