বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ভাইরাসে এমন কোনো জিনগত পরিবর্তন ঘটেনি, যা প্রচলিত টিকার কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) একটি অনুসন্ধানের প্রাথমিক ফলাফলে এ তথ্য জানা গেছে। প্রাদুর্ভাবের ব্যাপকতার কারণে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, এই অনুসন্ধানের ফল তা সমর্থন করে না। তবে নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি অর্থাৎ ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা এই প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত ১৫ হাজার ২৭২ জন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭২১ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হামের কারণে ৯৫ জন মারা গেছে।
হাসপাতালভিত্তিক অনুসন্ধানের চিত্র
আইসিডিডিআরবি এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত একটি যৌথ অনুসন্ধান চালান। সেখানে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৪১ শিশুকে এই অনুসন্ধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৩২৪ জনের হাম পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়।
৩ থেকে ৮ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে হাম শনাক্ত হওয়ার হার ছিল সবচেয়ে বেশি; এই বয়সী ১৪১ শিশুর মধ্যে ১৩৭ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। মূলত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া হামের অ্যান্টিবডি প্রথম কয়েক মাসেই দ্রুত কমে যাওয়ার কারণে এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির প্রথম ডোজ ৯ মাসের আগে না দেওয়ায় এই বয়সীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে।
গবেষকেরা এই শিশুদের চারটি দলে ভাগ করে বিশ্লেষণ করেন। এতে দেখা যায়, নিয়মিত টিকা পাওয়ার বয়স হয়নি, এমন ৯ মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের (৯৭.৩ শতাংশ) হাম শনাক্ত হয়েছে; টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের (৯৭ শতাংশ) হাম শনাক্ত হয়েছে; এক ডোজ টিকা পাওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জনের (৯২ শতাংশ) হাম পজিটিভ হয়েছে এবং সুপারিশ করা দুই ডোজ টিকা পাওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের (৭৬ শতাংশ) হাম শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এই তথ্যের অর্থ এই নয় যে দুই ডোজ টিকা পাওয়া দেশের সব শিশুর ৭৬ শতাংশই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। ৭৬ শতাংশের এই পজিটিভ হওয়ার হারটি কেবল ওই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সন্দেহভাজন ২১ শিশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই অনুসন্ধানে হামে আক্রান্ত হয়নি, এমন কোনো সুস্থ শিশু অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তাই এ তথ্য থেকে জনসংখ্যার মধ্যে টিকার সামগ্রিক কার্যকারিতার হার নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য আরও বড় পরিসরে বা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।
টিকার কোনো সুরক্ষা না থাকা শিশুদের মধ্যে পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার হার (প্রায় ৯৭ শতাংশ) থেকে কমে দুই ডোজ পাওয়া শিশুদের মধ্যে তা ৭৬ শতাংশ হওয়া মূলত প্রচলিত টিকা কার্যকর থাকার ইঙ্গিত দেয়।
ভাইরাসের ধরন ও জিনগত পরিবর্তন
জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি বি৩ জিনোটাইপ বা ধরনের। এটি বিশ্বের অন্যান্য দেশের হামের প্রাদুর্ভাবেও শনাক্ত হয়েছে। ভাইরাসের জিনগত বিন্যাস বুঝতে আইসিডিডিআরবি ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে ফাইলোজেনেটিক গবেষণা করেছে। এর মধ্যে ১৮টি নমুনা আইসিডিডিআরবি এবং ৩৭টি নমুনা রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) সিকোয়েন্স করেছে।
গবেষকেরা ভাইরাসের এইচ প্রোটিনের অ্যান্টিবডি শনাক্তকারী ‘এপিটোপ’ অঞ্চলে চারটি মিউটেশন বা পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন। এইচ প্রোটিন ভাইরাসকে মানুষের কোষে প্রবেশ করতে সহায়তা করে। তবে এই মিউটেশন শনাক্ত হলেও তা টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যেতে সক্ষম, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হামের ভাইরাস এখনো একটি একক সেরোটাইপ হিসেবে রয়েছে এবং টিকার মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডি ভাইরাসটির একাধিক স্থান শনাক্ত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
আইসিডিডিআরবির সংক্রামক রোগ বিভাগের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, ‘আমাদের অনুসন্ধানে ভাইরাসটি টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার হার কম ছিল। তবে হাসপাতালভিত্তিক এই অনুসন্ধান দিয়ে জনসংখ্যা পর্যায়ে টিকার সামগ্রিক কার্যকারিতার হার নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।’
দুই ডোজ টিকা পাওয়া ১৬ শিশুর হাম শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বলছেন, এর সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে—টিকা নেওয়ার পর কিছু শিশুর শরীরে যথেষ্ট শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডি কমে যাওয়া বা অপুষ্টি।
সংস্থার সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘হাম প্রতিরোধ এবং গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের হার তুলনামূলকভাবে বেশি বলে জানানো হলেও এই প্রাদুর্ভাব এত বড় কেন হলো, সেটিও আমাদের বুঝতে হবে।’
ল্যাবরেটরির সহকারী বিজ্ঞানী কামরুন নাহার বলেন, ‘শিশুরা কেন টিকা নিতে পারছে না এবং জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের যে হার জানানো হচ্ছে, তার আড়ালে কোনো কোনো এলাকায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়েছে কি না, তা আমাদের নির্ধারণ করতে হবে।’
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, টিকা নেওয়া কিছু শিশু কেন আক্রান্ত হয়েছে এবং শিশুরা কখন মায়ের অ্যান্টিবডি হারায়, তা জানতে আইসিডিডিআরবি আরও বিস্তৃত গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করছে।
বর্তমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আইসিডিডিআরবি দেশের চারটি প্রধান বিভাগীয় হাসপাতালে একটি ক্লিনিক্যাল কোহর্ট গবেষণা শুরু করেছে। গবেষকেরা অভিভাবকদের প্রতি জোর দিয়ে বলেছেন, তাঁরা যেন টিকা দিতে দেরি না করেন এবং শিশুর বয়স অনুযায়ী প্রাপ্য হাম-রুবেলা টিকার সব ডোজ নিশ্চিত করেন।