রেস্তোরাঁয় খাবার খাওয়া
রেস্তোরাঁয় খাবার খাওয়া

গবেষণা

গান শুনতে শুনতে খেলে খাবারের স্বাদ বাড়ে

খাওয়ার সময় পাশে পছন্দের গান বাজলে কি খাবার বেশি সুস্বাদু হয়ে ওঠে? অনেকে খেতে খেতে গান শোনেন। কেউ খাচ্ছেন আর ব্যাকগ্রাউন্ডে সংগীত বা মিউজিক বেজে চলেছে; তাতে কি খাবারের স্বাদ বেড়ে যায়? যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে এ কৌতূহল থাকলেও এর পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তি বা প্রমাণ মানুষের হাতে ছিল না। তবে এখন আছে।

কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয় ও আরহাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সংগীতের সঙ্গে স্বাদের সম্পর্কের জৈবিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পেয়েছেন। গত জুনে তাঁদের গবেষণার ফলাফল বিখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে প্রকাশিত হয়েছে।

এতে গবেষকেরা বলছেন, স্বাদ কেবল খাবারের নিজস্ব কোনো গুণ বা বৈশিষ্ট্য নয়। স্বাদ এমন একটি অনুভূতি যা মস্তিষ্কের মাধ্যমে তৈরি হয়। এ নতুন জ্ঞান রেস্তোরাঁ, ক্যানটিন, হাসপাতালসহ নানা জায়গায় খাওয়ার মান ও অভিজ্ঞতাকে উন্নত করার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

গবেষণায় ৪৮ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক অংশগ্রহণকারী অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের নিউরো–ইমেজিং বা মস্তিষ্কের স্ক্যান ডেটা সংগ্রহ করা হয়।

গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, খাবার খাওয়া মানুষের অন্যতম মৌলিক ও বহু–ইন্দ্রিয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা। স্বাদ কেবল জিহ্বার কাজ নয়। বরং এটি গন্ধ, দৃষ্টি, স্পর্শ ও শ্রবণেন্দ্রিয়ের যৌথ অনুভূতির ফসল। এর আগের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে শব্দের সঙ্গে স্বাদের একটি সুনির্দিষ্ট মিল বা সংযোগ রয়েছে, যেমন উচ্চ পিচ বা সুরের সংগীত মিষ্টির ভাব বাড়াতে পারে। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে শব্দ ও স্বাদকে একসঙ্গে প্রক্রিয়াজাত করে এবং সংগীত কীভাবে মস্তিষ্কের ভেতরে স্বাদের অনুভূতিকে প্রভাবিত করে, তা এত দিন অজানাই ছিল। গবেষকেরা মূলত এই স্নায়বিক বা নিউরাল মেকানিজম উদ্ঘাটন করতেই এ গবেষণা পরিচালনা করেছেন।

গবেষণাপদ্ধতি

গবেষণায় ৪৮ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক অংশগ্রহণকারী অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের নিউরো–ইমেজিং বা মস্তিষ্কের স্ক্যান ডেটা সংগ্রহ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা যখন স্ক্যানারের ভেতরে শুয়ে ছিলেন, তখন বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাঁদের মস্তিষ্কের সক্রিয়তা পরিমাপ করা হয়। গবেষণায় কিছু আধুনিক প্রযুক্তি ও পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল অডিটরি স্টিমুলি, টেস্ট স্টিমুলি, এমআরআই ও এফএমআরআই, গাস্টোমিটার ও নয়েজ-ক্যানসেলিং হেডফোন।

এফএমআরআই স্ক্যান করে দেখা গেছে, মানুষ যখন শুধু স্বাদ নেওয়ার চেয়ে সংগীত শোনার সঙ্গে কোনো খাবার বা দ্রবণ গ্রহণ করে, তখন মস্তিষ্কের স্বাদ প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল অনেক জোরালোভাবে সাড়া দেয়। অর্থাৎ সংগীত মস্তিষ্কের ভেতরে স্বাদ গ্রহণের অনুভূতিকে বাড়িয়ে দেয়।

গবেষণাটি তিনটি ধাপে পরিচালিত হয়।

১. মিউজিক: টেস্ট ইন্টারঅ্যাকশন টাস্ক। এমআরআই স্ক্যানারে থাকা অবস্থায় অংশগ্রহণকারীদের একই সঙ্গে সংগীত শোনানো হয় এবং জিবে মিষ্টি বা টক দ্রবণ দেওয়া হয়। এখানে মোট চারটি ভিন্ন মিশ্রণ বা কম্বিনেশন পরীক্ষা করা হয়।

২.মিউজিক ওনলি ও টেস্ট ওনলি টাস্ক: এ প্রক্রিয়ায় শুধু সংগীত শুনিয়ে এবং আলাদাভাবে স্বাদের দ্রবণ খাইয়ে মস্তিষ্কের পৃথক প্রতিক্রিয়া মাপা হয়।

৩. আচরণগত মূল্যায়ন: স্ক্যান শেষ করার পর অংশগ্রহণকারীদের একটি আইপ্যাডের মাধ্যমে বিভিন্ন অনুপাতে তৈরি করা খাদ্যের দ্রবণ ও সংগীতের মিশ্রণে তাদের নিজস্ব অনুভূতি (স্বাদের তীব্রতা, পছন্দ বা প্রীতিকর ভাব এবং শব্দ ও স্বাদের সামঞ্জস্য) ৯-পয়েন্ট স্কেলে রেট করতে বলা হয়। প্রাপ্ত ফলাফলগুলো তুলনা করা হয়।

আচরণগত ফলাফলে দেখা গেছে, মিষ্টি সংগীত শোনার সময় পরীক্ষামূলক দ্রবণগুলোর স্বাদ মানুষের কাছে অনেক বেশি প্রীতিকর বা আনন্দদায়ক মনে হয়েছে। অর্থাৎ সঠিক সংগীত মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে যা পরোক্ষভাবে খাবারের অভিজ্ঞতাকে উন্নত করে।

গবেষণা ফলাফল

গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল পাওয়া যায়। একটি হচ্ছে মস্তিষ্কের সক্রিয়তা বৃদ্ধি। অন্যটি হচ্ছে, খাবারের আকর্ষণ ও আনন্দ বৃদ্ধি।

এফএমআরআই স্ক্যান করে দেখা গেছে, মানুষ যখন শুধু স্বাদ নেওয়ার চেয়ে সংগীত শোনার সঙ্গে কোনো খাবার বা দ্রবণ গ্রহণ করে, তখন মস্তিষ্কের স্বাদ প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল অনেক জোরালোভাবে সাড়া দেয়। অর্থাৎ সংগীত মস্তিষ্কের ভেতরে স্বাদ গ্রহণের অনুভূতিকে বাড়িয়ে দেয়।

আচরণগত ফলাফলে দেখা গেছে, মিষ্টি সংগীত শোনার সময় পরীক্ষামূলক দ্রবণগুলোর স্বাদ মানুষের কাছে অনেক বেশি প্রীতিকর বা আনন্দদায়ক মনে হয়েছে। অর্থাৎ সঠিক সংগীত মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে যা পরোক্ষভাবে খাবারের অভিজ্ঞতাকে উন্নত করে।

কান ও জিহ্বা একে অপরের পরিপূরক। তাই বলা যেতে পারে, সঠিক সংগীত খাবারকে করে তুলতে পারে আরও বেশি আনন্দময় ও সুস্বাদু।

সাধারণ মানুষের কী লাভ

বিজ্ঞানী বা গবেষক ছাড়াও এ গবেষণা থেকে অন্যদের সুফল পাওয়ার সুযোগ আছে। রেস্তোরাঁ বা ক্যাফেগুলো খাবারের মেনুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংগীতের আয়োজন রাখতে পারে যা গ্রাহকদের খাওয়ার অভিজ্ঞতাকে আরও বেশি উপভোগ্য ও আকর্ষণীয় করে তুলবে। আবার বয়স্ক ব্যক্তি বা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যেসব রোগীর খাওয়ার রুচি বা স্বাদ নেওয়ার ক্ষমতা কমে গেছে  (যাঁরা পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে আছেন), তাঁদের ক্ষেত্রে সঠিক বা অনুকূল সংগীত পরিবেশন করে খাওয়ার অভিজ্ঞতা ও পুষ্টি গ্রহণ উন্নত করা সম্ভব হতে পারে।

খাবারে অতিরিক্ত চিনি বা কৃত্রিম উপাদান না বাড়িয়েই শুধু সঠিক শব্দ বা সংগীতের পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে খাদ্যের স্বাদ ও মিষ্টির অনুভূতি বহাল রাখা বা বাড়িয়ে তোলা সম্ভব।

কান ও জিহ্বা একে অপরের পরিপূরক। তাই বলা যেতে পারে, সঠিক সংগীত খাবারকে করে তুলতে পারে আরও বেশি আনন্দময় ও সুস্বাদু।