অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়

অভিমত: অনিন্দ্য ইসলাম অমিত

দেশে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে

দেশে গ্যাস সরবরাহে আগে থেকেই ঘাটতি রয়েছে। ফলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ছাড়া তাৎক্ষণিক কোনো বিকল্প নেই। আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি আছে।

বর্তমানে মাত্র দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। কোনো একটি টার্মিনাল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু গ্যাস সরবরাহেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তার অভিঘাত পড়তে পারে।

এবার একটি টার্মিনাল বন্ধের পর তৈরি হওয়া গ্যাস-সংকটে তা দেখা গেছে। যদিও বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই বিকল্প টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

কারিগরি কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে এখন আংশিক সরবরাহ হচ্ছে। আর ওই টার্মিনালের ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালু করার প্রক্রিয়া চলছে। আগে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, এটি চালু করার আগে পরীক্ষা করতে হলে টার্মিনাল ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে। এতে গ্যাসের সরবরাহ আবার কমে যাবে। তাই একটি যৌক্তিক সমাধানের আলোচনা চলছে। এখন বলা হচ্ছে, হয়তো টার্মিনাল পুরোপুরি বন্ধ না করেও বয়লারটি চালু করা যেতে পারে। বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। তবে তা করা গেলে খুবই ইতিবাচক হবে। তাই টার্মিনাল চালুর আগেই এলএনজির বিকল্প জাহাজ তৈরি রাখতে বলা হয়েছে, যাতে সরবরাহ আর ব্যাহত না হয়।

এলএনজি নিয়ে জাহাজ আসার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো বিঘ্ন তৈরি হয়নি; সরবরাহ নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই চলছে। একটি টার্মিনাল যখন বন্ধ ছিল, তখন যেসব সরবরাহকারী ও জাহাজের সঙ্গে আমাদের চুক্তি ছিল, তাদের বারবার বিষয়টি জানাতে হয়েছে। ফলে সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এখন টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে তাদের সঙ্গে আবার নতুন করে সমন্বয় করতে হবে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।

আমরা মনে করছি, ন্যূনতম আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। এতে আমাদের সরবরাহ সক্ষমতা বাড়বে এবং একটি টার্মিনাল কোনো কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও অন্যগুলো দিয়ে সরবরাহ চালু রাখা সম্ভব হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে কোনো আকস্মিক পরিস্থিতি পুরো ব্যবস্থাকে সংকটে ফেলতে না পারে।

বর্তমানে আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রক্রিয়াগত কাজ চলছে। স্থলভাগেও একটি টার্মিনাল নির্মাণে পরামর্শক নিয়োগ চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে জমি অধিগ্রহণের কাজও শুরু হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে। তবে শুধু টার্মিনালের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। গ্যাস আমদানির উৎস, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, স্পট মার্কেটের (খোলাবাজার) ওপর নির্ভরতা, পাইপলাইন অবকাঠামো এবং দেশীয় উৎপাদন—সবকিছুকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে কাজ করছে সরকার।

তবে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করা দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান নয়। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি—সবকিছুই আমদানিনির্ভর জ্বালানিব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। তাই স্থলভাগে অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সমুদ্রের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এতে বিদেশি কোম্পানির সাড়াও আসছে। দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে পারলেই আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।