
শিল্পায়ন ও নগরায়ণের অজুহাতে ২০২৬ সালে এসে পরিবেশদূষণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পরিবেশদূষণ প্রতিরোধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার উপায়গুলো এখন সুপরিচিত। তাই পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
আজ শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরে প্ল্যানার্স টাওয়ারে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেন সংস্থাটির সহসভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান। বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ‘জলবায়ু-সহনশীল এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দেশে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও সামাজিক অংশগ্রহণের বিষয়গুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। অনেক প্রকল্পে মানসম্মত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না থাকায় বাস্তবায়নের সময় সমস্যা তৈরি হয়। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অভিযোজন কার্যক্রমে তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় হলেও প্রশমন কার্যক্রম যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন অনুবিভাগ) নুরুন নাহার। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের যুগ্মপ্রধান (ডেলটা অনুবিভাগ) এস এম জোবায়দুল কবির। বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন। সঞ্চালনা করেন বিআইপির সহসভাপতি শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান।
নুরুন নাহার বলেন, সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিনিয়োগের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করে, যাতে তারা কম খরচে উদ্যোগ নিতে পারে। তবে অনেক প্রকল্পে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না হওয়ায় বাস্তবায়নের সময় সমস্যা দেখা দেয়। এ জন্য একটি মানসম্মত নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে সবাই একই কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যাচাই করা উচিত বলে মন্তব্য করেন নুরুন নাহার। তিনি বলেন, গবেষণায় পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় পরিকল্পনা কমিশনকে অনেক ক্ষেত্রে রক্ষণশীল অবস্থান নিতে দেখা যায়। ফলে নতুন প্রকল্প গ্রহণে অনীহা তৈরি হয়। ভবিষ্যতে উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিটি পর্যায়ে পরিকল্পনাবিদদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জোবায়দুল কবির বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রতিটি পরিকল্পনায় সামাজিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক—এই তিনটি স্তম্ভের সমন্বয় থাকতে হবে। পরিকল্পনা তৈরির সময় অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তাঁদের মতামত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অভিযোজন খাতে তুলনামূলক বেশি ব্যয় হলেও প্রশমন কার্যক্রম পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে উল্লেখ করেন জোবায়দুল কবির। তিনি বলেন, গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন অপরিকল্পিতভাবে ঘটছে। এটি পরিবেশদূষণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এখন থেকেই সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে জীববৈচিত্র্য ও সংরক্ষণবিশেষজ্ঞ হাসীব মুহাম্মদ ইরফানুল্লাহ বলেন, ২০১৬ সাল থেকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য তহবিল গঠনের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। পরিকল্পনা প্রণয়নে স্থান ও জীববৈচিত্র্যের আন্তসম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপে জীববৈচিত্র্যকে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন ইশতেহার ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে পরিকল্পনাবিদদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
সেমিনারে দুটি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। পরিকল্পনাবিদ নাঈমা ইসলাম তাঁর প্রবন্ধে বলেন, দেশের শিল্পাঞ্চল, বিশেষ করে সাভারে বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। শিল্পকারখানা থেকে নির্গত সূক্ষ্ম বস্তুকণা, কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও বিভিন্ন ভারী ধাতু বায়ুর মান ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নিজের গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে নাঈমা ইসলাম বলেন, লাইকেন বাতাস থেকে সিসা ও তামার মতো ভারী ধাতু শোষণ করতে পারে। শিল্পাঞ্চলে দুই মাস রাখার পর লাইকেনের নমুনায় ভারী ধাতুর ঘনত্বের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে দেখা যায়। এটি বায়ুদূষণ কমাতে লাইকেনের কার্যকারিতা প্রমাণ করে। লাইকেন বায়ুমানের পরিবর্তন শনাক্ত করতে জৈব নির্দেশক হিসেবেও কাজ করতে পারে।
শিল্পাঞ্চলে লাইকেন চাষ ও সংরক্ষণে উৎসাহ দেওয়া, বায়ুমান পর্যবেক্ষণে লাইকেনভিত্তিক ব্যবস্থা চালু এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় প্রকৃতিনির্ভর সমাধান অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগেরও আহ্বান জানান নাঈমা ইসলাম।
অন্য প্রবন্ধে মো. শিবলী সাদিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পরিকল্পনা ও প্রকল্পে বাস্তবায়নযোগ্যতা মূল্যায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রচলিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন থেকে প্রকল্পের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও প্রকল্পটি বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত নির্দেশনা পাওয়া যায় না।
প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব, স্থানীয় পর্যায়ে অর্থায়ন ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, গবেষণালব্ধ উদ্ভাবন বড় পরিসরে প্রয়োগ করতে না পারা এবং সামাজিক আস্থা ও অংশগ্রহণের ঘাটতিকে জলবায়ু কর্মসূচি বাস্তবায়নের বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন শিবলী সাদিক। রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাও বড় প্রতিবন্ধকতা বলে জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, পরিকল্পিত উন্নয়নের মূল ভিত্তি পরিবেশ সংরক্ষণ। বাসযোগ্য, মানবিক ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তুলতে বিআইপি সরকার, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই, সুশৃঙ্খল ও পরিবেশসম্মত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।