
‘এক ব্যাগ রক্ত দেখতে সামান্য মনে হলেও এটাই আমার কাছে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। কারণ, রক্ত কৃত্রিমভাবে তৈরি করা যায় না।’
১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় এভাবেই নিজের অনুভূতির কথা জানালেন নিয়মিত রক্তগ্রহীতা ও থ্যালাসেমিয়া রোগী রিপা তাসনিম। তিনি রাজধানীর মালিবাগে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতাল থেকে নিয়মিত রক্ত নেন।
এই হাসপাতালে আজ বৃহস্পতিবার ‘বিশ্ব রক্তদাতা দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। আয়োজক বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন।
অনুষ্ঠানে রিপা তাসনিম বলেন, থ্যালাসেমিয়া, ক্যানসার কিংবা কিডনির রোগীদের জন্য এক ব্যাগ রক্ত কেবল চিকিৎসার অংশ নয়, এসব রোগীদের কাছে এক ব্যাগ রক্ত একটা নতুন আশা, শক্তি ও বেঁচে থাকার বাহন। এই রক্তই তাঁদের আরও কিছুদিন সুস্থভাবে পৃথিবীতে টিকে থাকার সুযোগ করে দেয়।
রিপা তাসনিম স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, ‘আপনাদের এই নিঃস্বার্থ দান প্রতিদিন হাজারো মানুষের জীবন রক্ষা করছে। ফিরিয়ে দিচ্ছে পরিবারের হাসি।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মনজুর মোরশেদ। তিনি থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের বর্তমান কার্যক্রম তুলে ধরে জানান, বর্তমানে তাঁর রোগীদের জন্য প্রতি ১০০ জনে ৩২ জন ডোনার পাচ্ছেন। তবে ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য, আগামী বছরের মধ্যে ডোনারের সংখ্যা প্রতি ১০০ জনে ৫০ জনে উন্নীত করা। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে নানামুখী বাধা রয়েছে বলেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নেন রক্তপরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ মুরাদ সুলতান। যাঁরা রক্ত দেওয়ার মতো মানবসেবার কাজ করেন, তাঁদেরকে মহান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাঁদের সম্মান জানানো আমাদের কর্তব্য। তিনি বাংলাদেশে শতভাগ ‘ভলান্টিয়ারি ব্লাড ডোনেশন’ চালুর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
মুরাদ সুলতান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, জাতীয় রক্তের চাহিদা মেটাতে কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ১ থেকে ২ শতাংশ মানুষের রক্তদান করা জরুরি। যদিও বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ এখনো এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। তিনি এ বিষয়ে সবাইকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিশেষজ্ঞ রাজিয়া সুলতানা। তিনি নিয়মিত রক্তদাতাদের সুস্থ থাকতে নিয়মিত আয়রনসমৃদ্ধ খাবার ও পর্যাপ্ত পানি পান করার আহ্বান জানান।
রাজিয়া সুলতানা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট বিরতিতে রক্তদানের পাশাপাশি রক্তদানের পর ২৪ ঘণ্টা ভারী কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। শতভাগ স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম বাস্তবায়নে তিনি রক্তদাতাদের আহ্বান জানান। বলেন, ‘আমরা যেন নিজেরা নিয়মিত রক্তদান করি। নিজে রক্ত দেওয়ার পাশাপাশি বন্ধু ও পরিচিত ব্যক্তিদের অন্তত তিনজনকে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করি।’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম নিয়ে একটি ভিডিও চিত্র পরিবেশন করা হয়।
আলোচনা সভা শেষে থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালের রোগীদের কল্যাণে সর্বোচ্চসংখ্যকবার রক্তদানকারী ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও রক্তদাতাদের সংগঠনগুলোকে সম্মাননা স্মারক ও সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। এ সময় থ্যালাসেমিয়া রোগী প্রতিনিধি ও রক্তদাতারা নিজ নিজ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
বক্তারা উল্লেখ করেন, বংশগত রক্তস্বল্পতার রোগ থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসায় প্রতি মাসে রক্ত লাগে। দেশে প্রতিবছর ৮ থেকে ১১ হাজার এমন শিশু জন্মাচ্ছে। প্রতি ৯ জনে ১ জন এর বাহক। তাই বিয়ের আগে ‘হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রফোরেসিস’ পরীক্ষার মাধ্যমে বাহক শনাক্ত করে সচেতন হলে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ সম্ভব। কারণ, পিতা–মাতা দুজনেই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে তাঁদের সন্তানও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে তাঁদের একজন বাহক আরেকজন সুস্থ থাকলে সেই ঝুঁকি থাকে না।
আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দা মাসুমা রহমান, মুগদা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালের কনসালট্যান্ট জান্নাতুল ফেরদৌস প্রমুখ।
বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের সম্মেলনকক্ষে দিবস উপলক্ষে দিনব্যাপী স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তরুণ স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতাদের পাশাপাশি ফাউন্ডেশনের কর্মীরাও থ্যালাসেমিয়া রোগীদের রক্তদান করেন।