যুক্তরাষ্ট্রের মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক হেলাল মহিউদ্দীন
যুক্তরাষ্ট্রের মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক হেলাল মহিউদ্দীন

হেলাল মহিউদ্দীনের লেখা

মধ্যবিত্ত ভাঙছে, রাষ্ট্র কি ভালো আছে

ডেইলি স্টার-এর বাংলা সংস্করণ গত আগস্টে মোহাম্মদপুরের এক গৃহিণীর গল্প ছেপেছিল। তিনি মাসে ৫০০ টাকা করে জমাতেন। ছয় মাসে এমনই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে যে তাঁর এই সামান্য সঞ্চয়ক্ষমতাটুকুও শেষ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২১ শতাংশ। জুনে আয় বেড়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ, দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ বেতন বাড়লেও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের দামের আছর সব ঘরেই পড়েছে। এই সংকটের জন্য প্রধানমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন। 

এগুলো যতটা দারিদ্র্যের চিহ্ন, তার চেয়ে বেশি নিচে নামার ভীতিচিহ্ন। মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী বারবারা এরেনরাইখ মধ্যবিত্তের এই মনস্তত্ত্বের
নাম দিয়েছিলেন ‘ফিয়ার অব ফলিং’—পতনের ভয়। মধ্যবিত্তের ক্ষুধাভীতি কম। এক বেলা না খেলেও সে কাউকে জানাবে না, কিন্তু এক সিঁড়ি নিচে পড়ার ভয়ে ঘুম হারাম করে। চলতি সময়ে মধ্যবিত্ত সিঁড়িটি ভেজা, শেওলাজমা। অনেকেই পিছলে নিচে পড়ে যাচ্ছে।

পিপিআরসির ২০২৫ সালের মে মাসের এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। আরও ১৮ শতাংশ মানুষ যেকোনো সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত চার বছরে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে; আরও প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে টলোমলো অবস্থায় আছে। এদের অংশই নিম্নমধ্যবিত্ত—স্কুলশিক্ষক, ছোট দোকানি, বেসরকারি অফিসের হিসাবরক্ষক, প্রবাসী উপার্জনকারীর স্বদেশে বাসরত পরিবার। 

জাতীয় সঞ্চয়পত্র ছিল মধ্যবিত্তের শেষ ভরসা। প্রথম আলোর হিসাবে টানা চার বছর ধরে সঞ্চয়পত্রে নিট বিক্রি ঋণাত্মক। শুধু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেই ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকার বেশি মূল্যমানের সঞ্চয়পত্র ভাঙানো হয়েছে। সঞ্চয়পত্র ভাঙানো মানে ভবিষ্যৎ ভেঙে বর্তমান চালানো। মেয়ের বিয়ে, বাবার চিকিৎসা আর নিজের বার্ধক্যের জন্য তিল তিল করে জমানো টাকা খেয়ে নিচ্ছে মাসের বাজার।

২

খাতা-কলমে হলেও গরিবের জন্য অন্তত সামাজিক সুরক্ষা আছে। ধনীর আছে প্রভাব। কিন্তু মধ্যবিত্তের আছে শুধুই দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে সহ্য করে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা। সে টিসিবির লাইনে দাঁড়াতে লজ্জা পায়। আবার সুপারশপের শেলফের দিকে হাত বাড়াতেও ভয় পায়। 

রোনাল্ড রিগ্যান একবার রসিকতা করে বলেছিলেন, ইংরেজি ভাষার সবচেয়ে ভয়ংকর বাক্য হলো, ‘আমি সরকার আছি আপনাকে সাহায্য করতে।’ অনেক দিন পরে ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র নির্মাতা মাইকেল মুর এক আলাপচারিতায় এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘সরকার তো ভুরু কুঁচকে বলে, তুমি তো মধ্যবিত্ত, তোমার আবার সাহায্য লাগে নাকি?’

রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক মহলে বদ্ধমূল ধারণা, গরিবকে সাহায্য করতে হয় পেট বাঁচাতে; ধনীকে সাহায্য করতে হয় সরকার বাঁচাতে। মধ্যবিত্ত ঠিকই কোনো না কোনোভাবে নিজের পথ বের করে নেবে। দুর্নীতি-টুর্নীতি করলে আমরা চোখ বন্ধ করে রাখব। কিন্তু দুর্নীতি তো সবার ‘কাপ অব টি’ নয়। সবাই সরকারি চাকরিজীবীও নন।

৩

আন্তোনিও গ্রামসি জেলখানায় বসে লিখেছিলেন, পুরোনো মরে যাচ্ছে, কিন্তু নতুন জন্ম নিতে পারছে না। এই মাঝামাঝি কালটি বিপজ্জনক। বাংলাদেশও আটকে আছে এক মাঝামাঝি কালপর্বে। শুধু সময় নয়, নতুন ও পুরোনোর মাঝখানে আটকে পড়েছে পতনশীল মধ্যবিত্তও। চব্বিশে এই বর্গটি সবচেয়ে বেশি আশাবাদী ছিল। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির অমিলে এখন তার হতাশাও বেশি। এই মধ্যবিত্তকে এখন আর শ্রেণি বলার জো নেই, বর্গ বলা চলে। সে বর্গও নানা উপবর্গে বিভক্ত হচ্ছে। একটি উপবর্গ হলো জেন-জি মধ্যবিত্ত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় ৪১ শতাংশ পড়াশোনা, চাকরি, প্রশিক্ষণ কোনো কিছুতেই। তরুণীদের মধ্যে এই হার ছিল ৬২ শতাংশ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলো থেকে পাস করা স্নাতকদের ২৮ শতাংশের বেশি ছিল সম্পূর্ণ বেকার। 

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে এই পরিসংখ্যানও জেন-জিদের ক্ষোভের আগুনের লাকড়ি হয়েছিল। তারা সরকার বদলাতে পেরেছে, কিন্তু জীবন-জীবিকা বদলাতে পারেনি। তাদের অভিমানী অংশ ‘হয় দেশ ছাড়ব, না হয় সব জ্বালিয়ে দেব’ ভাবনায় আসক্ত। বিপজ্জনক ভাবনা—প্রথমটি দেশের জন্য, দ্বিতীয়টি নিজেদের জন্য। 

কার্টুন: এস এম রাকিবুর রহমান

আরেকটি অংশ ‘প্রিক্যারিয়াত’ হতে বাধ্য হচ্ছে। ফুডপ্যান্ডা, দারাজ, পাঠাও, কুরিয়ার ডেলিভারি, অনলাইন বাজার, টেলিমার্কেটিং, শপিং মল, চায়নিজ রেস্তোরাঁ ও দূরপাল্লার পরিবহনে অ্যাটেন্ডেন্টের কাজ নিচ্ছে। দিন আনা দিন খাওয়া হয়তো হচ্ছে, টেনেটুনে ঘরভাড়াও হয়তো জুটছে। কিন্তু সুরক্ষা? ভবিষ্যৎ? কণা পরিমাণও নেই। 

ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ গাই স্ট্যান্ডিং এ রকম পতনশীল মধ্যবিত্তদের নাম দিয়েছিলেন ‘দ্য নিউ ডেঞ্জারাস ক্লাস’। এদের পেশা অস্থায়ী, আয় অনিশ্চিত, ভবিষ্যৎ অস্পষ্ট। এরা শিক্ষিত অথচ নিরাপত্তাহীন; ক্ষুব্ধ, উদ্বিগ্ন ও বিচ্ছিন্ন। বাধ্য হয়ে ঝুঁকছে লোকরঞ্জনবাদী ও চরমপন্থী রাজনীতির দিকে। ভেতরে–ভেতরে ফুঁসছে ডেঞ্জার ঘটানোর জন্য। 

আরেকটি উপবর্গ ক্ষমতার স্বাদ ফিরে পাওয়া মধ্যবিত্ত। এই অংশটির ভাবনায় শুধুই ‘ক্ষতিপূরণ’-এর দাবি। এরা দীর্ঘদিন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত, তাই সুসময়ে সব সুবিধা লুটে নেওয়াকে ভাবছে তাদের ন্যায্য অধিকার। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বাণী—‘চাঁদাবাজির দায় দলের নয়, ব্যক্তির’—এই গোষ্ঠীর জন্য প্রচ্ছন্ন আশকারা।

‘ঘাপটি মেরে থাকা মধ্যবিত্ত’ আরেকটি উপবর্গ। অফিসে, ব্যাংকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, সরকারি দপ্তরে বিপুলসংখ্যক মধ্যবিত্ত আছেন, যাঁরা পতিত সরকারের কট্টর সমর্থক ছিলেন, এখনো আছেন। এখন তাঁরা প্রকাশ্যে চুপ; কথা বলেন রুদ্ধদ্বার আড্ডায় আর এনক্রিপ্টেড গ্রুপে। এই উপবর্গের মধ্যবিত্ত প্রথমে নিজেদের ‘ঘটনাচক্রে রাজনৈতিক সংখ্যালঘু’ মনে করে; তারপর নিজেদের দেখে ‘সামাজিক সংখ্যালঘু’ হিসেবে। এই ভাবনাসূত্র ঘূর্ণিবাত্যার মতো বিপজ্জনক। ভাবনাগুলো লুকিয়ে রাখা, বিষ জমিয়ে রাখা বিপর্যয়ের প্রস্তুতি। 

‘দুর্বৃত্ত মধ্যবিত্ত’ সবচেয়ে স্থিতিশীল উপবর্গ। এদের একাংশ কর্মকর্তা, ঠিকাদার, শিক্ষক, সাংবাদিক, সম্পাদক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, পেশাজীবী নেতা। এদের রং বদলাতে সময় লাগে না। উদ্দেশ্য—যত দ্রুত সম্ভব উচ্চবিত্তের কাতারে উঠে যাওয়া। এদের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশের নাম দিয়েছি ‘কাকতাড়ুয়া বুদ্ধিজীবী’। এদের দেখা মেলে টিভি টক শোতে ক্ষমতাসীন দলের হয়ে কথার কুস্তিতে নামতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও যখন কাকতাড়ুয়া সেজে টিভি পর্দায় আসেন, তখন হতাশ হতেই হয়। আগে অনেকে এদের বলত ‘জাস্টিফিকেশন লীগ’; এখন হয়তো বলবে ‘জাস্টিফিকেশন দল’। 

৪

মধ্যবিত্ত যুবসমাজের সাংস্কৃতিক পতন আতঙ্কিত হওয়ার মতো। ‘ট্যাগিং’ সংস্কৃতি এবং ফেসবুক আদালত সাংস্কৃতিক পতনের উপসর্গ। অনলাইনে বিচার ও রায়। শাস্তি ‘ট্যাগিং’। শাহবাগী, ফ্যাসিস্টের দোসর, ভারতের দালাল, পাকিস্তানপন্থী, নাস্তিক, মৌলবাদী ইত্যাদি ট্যাগ লাগানো সহজ। কারণ, এসবে যুক্তি লাগে না। সরকারের অদলবদল হয়। ট্যাগগুলোরও অদলবদল হয়। বাস্তবতাবিবর্জিত অর্থহীন, সারবত্তাহীন ট্যাগিং; কিন্তু এসবের ফল বিধ্বংসী। ঘৃণা-বিদ্বেষ, বিভাজন, শত্রুতা, জিঘাংসা-প্রতিহিংসা রাষ্ট্রের সংহতি ও সুসংবদ্ধতার ক্ষতি করে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যোগাযোগ স্বাস্থ্যকর, গোলযোগ ভীতিকর। যোগাযোগের সক্ষমতা ২০২৪ সালে সরকার পতনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়েছিল। কিন্তু গোলযোগ ভীতিকর, কারণ তা নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন বাড়িয়ে অপশাসন দীর্ঘায়িত করে।

খাতা-কলমে হলেও গরিবের জন্য অন্তত সামাজিক সুরক্ষা আছে। ধনীর আছে প্রভাব। কিন্তু মধ্যবিত্তের আছে শুধুই দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে সহ্য করে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা। সে টিসিবির লাইনে দাঁড়াতে লজ্জা পায়। আবার সুপারশপের শেলফের দিকে হাত বাড়াতেও ভয় পায়

তা ছাড়া ভার্চ্যুয়াল ঘৃণা ভার্চ্যুয়াল জগতে আটকে থাকে না। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে ২০২৫ সালে গণপিটুনিতে অন্তত ১৯৭ জন মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। মাজার ও ভাস্কর্যে হামলা, বাড়িঘরে হামলা ইত্যাদি প্রতিটি ঘটনার আগে ফেসবুকে উসকানি প্রচার করা হয়; মূলত তরুণ-যুবক বয়সীরাই এসব করে। গণপিটুনিতেও তারা লাঠি হাতে নেয়, পোস্ট লেখে, শেয়ার করে। ‘উচিত শিক্ষা হয়েছে’ বলে মন্তব্য করে। ন্যূনতম অপরাধবোধ নেই। 

সম্প্রতি শামীম নামের একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত যুবককে হত্যা করা হয়েছে ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে। হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিটির অনুশোচনা তো নেই-ই, উল্টো তার কৃতিত্ব জাহিরের পোস্ট দেখে মনে হয়েছে—দেশে কার্যত কোনো সরকার নেই। আইন খাতা-কলমে থাকলেও অকার্যকর। 

মনোবিজ্ঞানে ‘হতাশা-আগ্রাসন তত্ত্ব’ নামে একটা পুরোনো ধারণা আছে। হতাশ মানুষ তার ক্ষোভের আসল উৎসে আঘাত করতে না পারলে দুর্বলতর কাউকে খোঁজে। বাজারদরকে চড় মারা যায় না, বিদ্যুৎ বিলকে মামলায় ফেলা যায় না, কিন্তু পাশের মানুষের মতকে সজোর আঘাত করা যায়। স্ত্রীর ওপর রাগ ঝাড়তে ঘরের বিড়ালকে জোরে লাথি মারা যায়। 

ফেসবুকে আদালত বসানোর মতো মধ্যবিত্তীয় সাংস্কৃতিক অধঃপতনটি শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালের পর থেকে। শেখ হাসিনার অপশাসন ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পথে নামলেই গুম, খুন, হামলা-মামলা ছিল বিরোধিতাকারীর অবধারিত নিয়তি। নিরুপায় মধ্যবিত্ত ক্ষোভ ঝাড়ার উপায় পেয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিন্নমতকে শায়েস্তা করার জন্য সরকারপক্ষও নামিয়ে দিয়েছিল অগণিত অসংখ্য উগ্র সাইবার যোদ্ধাকে। অশ্লীলতা ও সাইবার সন্ত্রাস ছিল তাদের মূল হাতিয়ার। 

প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে ২০২৬ সালে এসে আমাদের রাষ্ট্র কতটা বদলেছে? সারা বিশ্বেই রাষ্ট্রের ভালো–মন্দ বোঝার অন্যতম বড় নির্ণায়ক হলো মধ্যবিত্তের অবস্থা। মধ্যবিত্ত ভালো থাকলে রাষ্ট্র ভালো আছে। মধ্যবিত্ত ভালো নেই, রাষ্ট্রও ভালো নেই।

* হেলাল মহিউদ্দীন: শিক্ষক, লিবারেল আর্টস বিভাগ, মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ডাকোটা, যুক্তরাষ্ট্র