ব্যবসায়ী সোহাগ শিকদারের স্বজনদের আহাজারি। গতকাল শরীয়তপুরের জাজিরার ডুবিসায়বরে
ব্যবসায়ী সোহাগ শিকদারের স্বজনদের আহাজারি। গতকাল শরীয়তপুরের জাজিরার ডুবিসায়বরে

দুর্ঘটনায় ১৪ জনের মৃত্যু

কেউ যাচ্ছিলেন ছুটিতে, কেউ ব্যবসার কাজে, ফেরা হলো না তাঁদের

স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে পূজার ছুটি কাটাতে বড় বোনের বাসায় যাচ্ছিলেন রুবিনা আক্তার (৩৬)। পথে একই বাসে ওঠেন তাঁর স্বামী শহিদুল ইসলাম। গন্তব্য ছিল রাজশাহী। কিন্তু সেখানে আর পৌঁছানো হলো না তাঁদের। নাটোরের বড়াইগ্রামে ট্রাকের সঙ্গে বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন শহিদুল (৪০) ও আট বছরের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮)। গুরুতর আহত রুবিনা ও তাঁর ছেলে লাবিব হোসেন (১০) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রুবিনা জানেন না স্বামী ও মেয়ে বেঁচে নেই।

গতকাল মঙ্গলবার ভোর চারটার দিকে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩২ জন।

রুবিনা পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পূবালী ব্যাংকের সুবিদখালি শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তাঁর স্বামী শহিদুল ইসলাম ব্র্যাক ব্যাংকের মাগুরা শাখায় ক্রেডিট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁদের মেয়ে তাছফিয়া তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত। ছেলে লাবিব পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

রুবিনার ভগ্নিপতি শহিদুর রহমান রাজশাহীর পাঠানপাড়া এলাকায় থাকেন। তিনি ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা। তাঁর বাসায়ই পূজার ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা ছিল রুবিনাদের।

শহিদুর রহমান জানান, পটুয়াখালী থেকে রওনা হয়েছিলেন রুবিনা ও তাঁর সন্তানেরা। পথে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন শহিদুল। নির্ধারিত সময়ে তাঁরা না পৌঁছানোয় খোঁজ নিতে গিয়ে দুর্ঘটনার খবর পান তিনি।

নাটোর-পাবনা মহাসড়কের ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বাস। গতকাল নাটোরের বনপাড়া হাইওয়ে থানার সামনে

গতকাল সকাল ১০টার দিকে প্রথম আলোকে শহিদুর রহমান বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমার শ্যালিকা ও ভায়রা ওমরাহ করে এসেছেন। দুজনই ব্যাংকে চাকরি করেন। পূজার ছুটিটা আমাদের বাসায় কাটাতে চেয়েছিলেন। সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল।’
শহিদুর নাটোর সদর হাসপাতালে ভর্তি লাবিবের পাশে আছেন। তাঁর স্ত্রী রয়েছেন রুবিনার সঙ্গে। রুবিনা বনপাড়া পাটোয়ারী ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন।

গতকাল সকাল সাড়ে আটটার দিকে ওই ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, ব্যথায় কাতরাচ্ছেন রুবিনা। স্বামী ও সন্তানদের খোঁজ জানতে চাইছেন বারবার। কিন্তু যে স্বামী ও মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ছুটি কাটাতে যাচ্ছিলেন, তাঁদের মৃত্যুর খবর তাঁকে দেওয়া হয়নি।

প্রাণ হারালেন শরীয়তপুরের পাঁচ ব্যবসায়ী

এ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পাঁচ ব্যবসায়ী। কৃষিপণ্যের বীজ ও অন্যান্য পণ্য কিনতে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুরে যাচ্ছিলেন তাঁরা। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় জাজিরার কাজীরহাট বাজার থেকে যাত্রা শুরু করেন সাতজন ব্যবসায়ী। বাকি দুজন আহত হয়েছেন।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন জাজিরার বড়কান্দি ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর মাদবরকান্দি এলাকার জুয়েল মাদবর (৪০), সালাল মোল্যা (৪৫), সোহাগ শিকদার (৩০), আবদুস সামাদ ফকির (৭০) ও পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার শাহিন ব্যাপারী (২৫)।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাত ব্যবসায়ী প্রথমে নাওডোবা থেকে বাসে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় যান। পরে বরগুনা থেকে ছেড়ে আসা চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি স্পেশাল পরিবহনের বাসে ওঠেন তাঁরা। বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে নয়জন নিহত হন। পরে বিভিন্ন হাসপাতালে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়।

নিহত জুয়েল মাদবর রবিশস্য কেনাবেচার পাশাপাশি কাজীরহাট বাজারে রড-সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। তাঁর ভগ্নিপতি বাদল জমাদ্দার প্রথম আলোকে বলেন, জুয়েলের ছোট দুই সন্তান ও স্ত্রী রয়েছেন। সোমবার বিকেলে রাজশাহীর উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। ভুট্টার বীজ ও ভুট্টা কেনার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। গতকাল সকালে দুর্ঘটনায় জুয়েলের মৃত্যুর খবর পান তাঁরা।

কাজীরহাট বণিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, নিহত ব্যবসায়ীদের মরদেহ আনতে তাঁরা নাটোরের পথে রওনা হয়েছেন। আহত দুই ব্যবসায়ীর স্বজনেরা তাঁদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে রাজশাহীতে গেছেন।

বড়কান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর খলিফা জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো এলাকায় নেওয়া হবে। সেখানে একসঙ্গে শ্রদ্ধা জানানো হবে। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরে দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।