
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রাতে ইউটিউবে র্যাপার সেজান তাঁর ‘কথা ক’ র্যাপ ট্র্যাকটি রিলিজ করেন, ‘বায়ান্নরতে চব্বিশের তফাত কই রে কথা ক!/ দ্যাশটা বলে স্বাধীন তাইলে খ্যাচটা কই রে? কথা ক!/ আমার ভাই-বইন মরে রাস্তায় তর চেষ্টা কই রে? কথা ক!/ কালসাপ ধরসে গলা প্যাঁচায়, বাইর কর সাপের মাথা কো?’
দুই হাত মেলে দিয়ে সাহসের দিগন্ত ছুঁতে চাওয়া রংপুরের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ সেদিন সকালে শহীদ হয়েছেন। আগের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সানজিদা তন্বীদের রক্তাক্ত মুখ নাড়া দিয়ে গেছে আমাদের প্রাত্যহিক কর্মতন্দ্রাকে। সেজানের সেই গান ঘণ্টায় লাখের গতিতে ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে আসছিল আরও আরও তরুণের খুন হওয়ার সংবাদ।
দুই দিন পরে, ১৮ জুলাই, র্যাপার হান্নান গাইলেন, ‘আওয়াজ উডা বাংলাদেশ, আওয়াজ উডা বাংলাদেশ/ রাস্তায় এত রক্ত কাগো?/ আওয়াজ উডা বাংলাদেশ/ রাস্তায় গুল্লি করল কেডা?/ আওয়াজ উডা বাংলাদেশ/ …যেই বুকে কালকে মেডেল ঝুলব ওই বুকে আজকে গুল্লি কে?/ কথা হইল মুরদার দেশে ন্যায়ের আওয়াজ তুলবি কে?/ বায়ান্নরটা ভুলতারি নাই চব্বিশেরটা ভুলবি ক্যা? শিক্ষার মাজা ভাঙবি তাইলে স্কুল–কলেজ খুল্লি ক্যা!’
র্যাপারদের অপ্রমিত গানে ভাষা পাওয়া প্রখর এসব প্রশ্নের তোড়েই কিনা জানি না, ১৮ জুলাই থেকে বন্ধ হয়ে গেল দেশের ইন্টারনেট। সড়কে বাড়তে থাকল তরুণদের তাজা রক্তের স্রোত। পরদিন থেকে দেওয়া হলো কারফিউ, কিন্তু থামল না বিক্ষোভ। ২৪ জুলাই আংশিক ইন্টারনেট ফেরত পেয়েই র্যাপার ‘কোল্ডক্রাফট’ ইউটিউবে গেয়ে উঠলেন, ‘রক্ত দিতে ডরায় না কেউ, হকটা সবার সমান চাই/ ৫২–র তে ২৪ সালের মধ্যে কোনো তফাত নাই/ মইরা গেলেও কথা ক, আর নাইলে কোনো প্রমাণ নাই/ রাস্তা চাইসি নিরাপদ, ওই রাস্তায় মরে পোলাপাইন।’ ৩০ জুলাই ‘চব্বিশের গেরিলা’ নামের র্যাপার দল গাইল, ‘কিরে ঘরে ক্যা?/ বাইর হ!/ দেশে বায়ান্ন আবার শুরু/ ফায়ার শুরু রাবার বুলেট/ বায়ান্ন আবার শুরু।’
১৮ জুলাই থেকে তীব্র উৎকণ্ঠা নিয়ে আমরা শিক্ষকেরা কমবেশি যুক্ত হতে শুরু করেছিলাম আন্দোলনের সঙ্গে, মূলত শিক্ষার্থীদের এত এত রক্ত আর প্রাণ ঝরে যাওয়াকে উপেক্ষা করতে না পেরে, তাঁদের সৎ সাহস আর পাল্টে দেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অগ্রাহ্য করতে না পেরে।
১৬ জুলাই পুলিশি অভিযান চালিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার পর আন্দোলন তখন আরও ব্যাপ্তি নিয়ে আছড়ে পড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আর স্কুল-কলেজ-পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে। ১৮ জুলাই থেকে তীব্র উৎকণ্ঠা নিয়ে আমরা শিক্ষকেরা কমবেশি যুক্ত হতে শুরু করেছিলাম আন্দোলনের সঙ্গে, মূলত শিক্ষার্থীদের এত এত রক্ত আর প্রাণ ঝরে যাওয়াকে উপেক্ষা করতে না পেরে, তাঁদের সৎ সাহস আর পাল্টে দেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অগ্রাহ্য করতে না পেরে।
রাজধানীর প্রগতি সরণিজুড়ে ফুঁসতে থাকা হাজার হাজার তরুণের প্রাত্যহিক জমায়েত, পুলিশের গুলি-গ্রেনেড-টিয়ার গ্যাস কিংবা সরকারদলীয় গুন্ডাদের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পিছু হটা, আবার সামলে নিয়ে একজোট হয়ে রাস্তার দখল নেওয়া, শিক্ষার্থীদের ঝরতে থাকা রক্ত আর প্রাণ, আহতদের নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছোটা—এই সবকিছু মিলিয়ে পরের কয়েকটি দিনকে মনে হয়েছিল অনন্তকাল, একটা শেষ না হতে পারা অনন্ত জুলাই। আমার দেখা এই হাজার হাজার মিছিলের মুখ, সারা দেশের আরও অযুত-লক্ষ তরুণের সঙ্গে মিলে শেষমেশ খুঁজে বের করল তাদের প্রজন্মের ‘গলা পেঁচিয়ে থাকা কালসাপের মাথাটিকে—‘৩৬ জুলাই’ পতন ঘটল শেখ হাসিনা সরকারের।
একজোট হয়ে রাস্তার দখল নেওয়া, শিক্ষার্থীদের ঝরতে থাকা রক্ত আর প্রাণ, আহতদের নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছোটা—এই সবকিছু মিলিয়ে পরের কয়েকটি দিনকে মনে হয়েছিল অনন্তকাল, একটা শেষ না হতে পারা অনন্ত জুলাই।
সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাসে বিপ্লবের ক্ষণমুহূর্তগুলো সাধারণত সংক্ষিপ্ত ও ক্ষণস্থায়ী হয়। কিন্তু ইতিহাসের এই মাহেন্দ্রক্ষণেই নতুন সামাজিক সত্য আর মানুষের যৌথ সত্তা জ্যোতির্ময় হয়—ভাষা পায় সংঘবদ্ধ মানুষের জবানে। বিশ শতকের শুরুতে মানুষের যৌথ সত্তার এই ঝলসে ওঠা তীব্রতম রূপকে ফরাসি সমাজবিদ এমিল দুর্খাইম নাম দিয়েছিলেন ‘কালেকটিভ এফেরভেসেন্স’, যখন সংক্রমিত আবেগের শক্তি ব্যক্তিসত্তাকে ছাপিয়ে নতুন এক সামাজিক সত্য আর সংহতির জন্ম দেয়। ২০২৪ সালের ১৬ থেকে ৩৬ জুলাই আমাদের ইতিহাসের এমনই এক উত্তুঙ্গ কালখণ্ড। আধুনিক সমাজবিদ্যা বলে, এ রকম কালখণ্ডে উদ্ভাসিত সত্য আর সত্তার সন্ধান বিপ্লবের ক্ষণমুহূর্তে উচ্চারিত বা অঙ্কিত গান-স্লোগান-ছবিতে করতে হয়। জুলাইয়ে ঝলসে ওঠা জনমানসের প্রতিবিম্বও তাই প্রথমত আমাদের খুঁজতে হয় জুলাইয়ের গান-স্লোগান আর দেয়ালে দেয়ালে আছড়ে পড়া আবেগের ছাপচিত্রগুলোতে। অভ্যুত্থান-উত্তর সময়ের তত্ত্বাবধায়িত প্রমিত বয়ানে নয়, পরের উচ্চকিত রাজনৈতিক বোলচালে নয়, কোনো তাত্ত্বিক কূটকচালে নয়, কোনো ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বা হা-হুতাশের আহাজারিতে তো নয়ই—এসব সরল সত্য প্রামাণ্য থাকে অশুদ্ধ-অপ্রমিত সব উচ্চারণ আর বানানে গাঁথা আখ্যানে।
সেই বিচারে বায়ান্ন আর চব্বিশের তফাত আসলে নেই, চাকরিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে রাজনৈতিক-ব্যবস্থাকেই পাল্টে দেওয়াটা আমাদের ইতিহাসে এবার প্রথমবার ঘটেনি। বায়ান্নর সেই উত্তাপ আমাদের নতুন জাতিত্ব বোধ দিয়েছিল, পরের সব লড়াইয়ে শক্তি জুগিয়েছিল, একাত্তর সালে এসে আমাদের একটি স্বাধীন দেশ দিয়েছিল। এখন নতুন প্রশ্ন হচ্ছে, ২০২৪–এর এই অভ্যুত্থান আমাদের কোথায় নিয়ে যেতে পারে? কোন নতুন সত্য নির্মাণ করতে চেয়েছেন আমাদের জুলাই–প্রজন্ম? কোন নতুন সত্তাকে আমাদের সংহতির সূত্র করতে চেয়েছে জুলাই?
সমাজবিদ্যার ছাত্র বলেই কিনা জানি না, ১৮ জুলাই থেকে সেই স্নায়ু-শরীর বিপন্ন করা দিনগুলোতেও আমার কানে বারবার বাজত সেজানের র্যাপে ছুড়ে দেওয়া সেই রিদমিক প্রশ্ন, ‘বায়ান্ন আর চব্বিশে তফাত কি রে? কথা ক!’ বারো দিনে মিলিয়ন–মিলিয়ন ভিউ হওয়া এই র্যাপ গানগুলো নিঃসন্দেহে আন্দোলনের তরুণদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিধ্বনি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রথম চারটি র্যাপ গানই কেন চব্বিশের এই অভ্যুত্থানকে মেলাতে চাইছিল বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে?
প্রশ্ন যখন প্রখর হয়ে ওঠে সমাজের ক্রান্তিকালে, উত্তর তখন আসলে সহজ ও সুলভ হয়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আদতে শুধু ভাষার আন্দোলন নয়, রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের রুখে দাঁড়ানোর আন্দোলন। সেই আন্দোলন, আজকে যেমনটা মনে হতে পারে, শুধু মায়ের ভাষায় কথা বলার আবেগময় আবদার ছিল না। এটা ছিল নয়া রাষ্ট্র পাকিস্তানে নাগরিক হিসেবে আমাদের রাজনৈতিক অধিকার আর অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। এটা ছিল নিজের ভাষাকে নিজের রাষ্ট্রের ভাষা করার লড়াই, তার মধ্য দিয়ে সরকারি চাকরিতে বাঙালি শিক্ষার্থীদের ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবার লড়াই। এটা আমাদের ফারসিভাষী মোগল সাম্রাজ্যের ভূমিদাস থেকে, ইংরেজিভাষী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রজা থেকে, আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে ওঠার লড়াই, যার প্রথম প্রতীকী সোপান ছিল রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন।
সেই বিচারে বায়ান্ন আর চব্বিশের তফাত আসলে নেই, চাকরিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে রাজনৈতিক-ব্যবস্থাকেই পাল্টে দেওয়াটা আমাদের ইতিহাসে এবার প্রথমবার ঘটেনি। বায়ান্নর সেই উত্তাপ আমাদের নতুন জাতিত্ব বোধ দিয়েছিল, পরের সব লড়াইয়ে শক্তি জুগিয়েছিল, একাত্তর সালে এসে আমাদের একটি স্বাধীন দেশ দিয়েছিল। এখন নতুন প্রশ্ন হচ্ছে, ২০২৪–এর এই অভ্যুত্থান আমাদের কোথায় নিয়ে যেতে পারে? কোন নতুন সত্য নির্মাণ করতে চেয়েছেন আমাদের জুলাই–প্রজন্ম? কোন নতুন সত্তাকে আমাদের সংহতির সূত্র করতে চেয়েছে জুলাই?
বিপ্লবের ক্ষণমুহূর্তে নতুন সামাজিক সত্য বা সংহতি শুধু নির্মিতই হয় না; ইতিহাস বলে, তারপর সেটা বেহাতও হয়। বিপ্লবের সামাজিক সত্য চাপা পড়ে রাজনীতির বানোয়াট বয়ানে, সংহতি ভেঙে পড়ে রাজনীতির চাপানো বিভাজনে। বিপ্লবকালে ব্যক্তিসত্তাকে ছাপিয়ে যে যৌথ সত্য তৈরি হয়, বিপ্লবকে ব্যক্তির বাহাদুরি বানিয়ে, তার সত্যকে ব্যক্তিপূজার বয়ান তৈরি করে, ইতিহাস নামে বেচতে চায় নতুন শাসকেরা। এসব বয়ান আর বিভাজনের ডামাডোলে চাপা পড়ে অর্থনৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্ন, নাগরিক মর্যাদার প্রশ্ন। এসবের নিচে চাপা দেওয়া হয় বিপ্লবকালে জনমানসে ভেসে ওঠা ‘নয়া বন্দোবস্ত’–এর স্বপ্ন, ক্ষমতাতন্ত্রের স্বেচ্ছাচার আর লুটপাটের পুরোনো বন্দোবস্তটি ক্ষমতার নতুন দাবিদারদের জন্য অটুট রাখবার বাসনায়।
স্বপ্নভঙ্গের অধ্যায়টি পরে রক্তাক্ত হয়েছে মর্মান্তিক সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে, আরও প্রলম্বিত হয়েছে পরের দেড় দশকের সামরিক শাসনে।
ঠিক এভাবেই আত্মসাৎ হয়েছিল বায়ান্ন থেকে একাত্তরের অর্জন। সামন্ত-সামরিক চরিত্রের পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বর্ণবাদী বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে একাত্তরের রাষ্ট্রবিপ্লবে আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গড়া একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম। সামন্তসুলভ পরিবারতন্ত্রের বোধবুদ্ধিতে আচ্ছন্ন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সেই নতুন রাষ্ট্রটিকে একটি ‘পার্টিজান-রিপাবলিক’–এ পরিণত করেছিল অবাধ লুটপাট আর স্বৈরাচারী শাসন কায়েমের মধ্য দিয়ে। এই স্বপ্নভঙ্গের অধ্যায়টি পরে রক্তাক্ত হয়েছে মর্মান্তিক সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে, আরও প্রলম্বিত হয়েছে পরের দেড় দশকের সামরিক শাসনে।
ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে একটি স্বৈরশাসনের পতন এর আগে শেষবার ঘটেছিল ১৯৯০ সালে, এরশাদ সরকারের পতনে। পরের বছর প্রথমবারের মতো একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাত ধরে বাংলাদেশ মোটামুটি চলনসই গোছের একটি নির্বাচনী গণতন্ত্রের পথে পা রাখে, যা নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ক্ষয়ে ক্ষয়ে টিকে ছিল ২০০৮ সাল পর্যন্ত। এরপর চারটি নির্বাচনে পালাক্রমে জয়ী হওয়া রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাষ্ট্র-সরকার-বিচার-নির্বাচনব্যবস্থার সর্বাত্মক দলীয়করণের প্রবণতা, ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও অবিচার, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তাঁবেদারি এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক সহিংসতা মিলিয়ে এই নির্বাচনী গণতন্ত্র ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার মধ্য দিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তার কফিনে শেষ পেরেকগুলো ঠুকতে থাকে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনী তামাশা দিয়ে।
১৫ বছরের এই আওয়ামী দলতান্ত্রিক স্বৈরশাসন ১৯৫২, ১৯৭১ আর ১৯৯০–এর সত্যকেও আত্মসাৎ করেছিল। তাদের এই শাসন-প্রকৌশলের একদিকে ছিল নাগরিকদের—বিশেষত তরুণদের—ধর্মবোধ, মুক্তিযুদ্ধ আর রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রশ্নে বিভাজিত ও বিবদমান করে রাখা; অন্যদিকে রাজনৈতিক ভিন্নমতের নির্দয় দমন-নিপীড়ন। ব্যক্তিপূজা আর বিভাজনের বয়ান দিয়ে নাগরিকের সর্বজনীন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নকে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল একদিকে; অন্যদিকে দলের অনুগত সেবক আর সমর্থকদের লাগামহীন স্বেচ্ছাচার আর লুটপাটের অবাধ সুযোগ দিয়ে দলকেই সরকার বা রাষ্ট্রের প্রতিভূ করে ফেলেছিল আওয়ামী লীগ। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন-কৌশল এবং নজরদারির প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ঘটিয়ে, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে, সাংস্কৃতিক বলয়কে বশ মানিয়ে, সর্বোপরি ভয়কে নাগরিকদের জন্য এক সর্বাত্মক অনুভূতি বানিয়ে কায়েম ছিল এই দলতান্ত্রিক স্বৈরশাসন।
২০২৪–এর জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম সত্য হচ্ছে আমাদের তরুণদের এই ভয়কে অস্বীকার করার সাহস, এক অবিকল্প অজানা গন্তব্যের দিকে পা বাড়ানোর সাহস। ‘বিকল্প নেই’ জাতীয় বানোয়াট সত্যের বিপরীতে বায়ান্ন, একাত্তর বা নব্বইয়ের বেহাত সত্যের খোঁজে পা বাড়ানোর সাহস। পরাক্রমশালী ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে নতুন সত্য বলবার সাহস। ইতিহাসের আবছা পাতা থেকে নিংড়ে নিয়েই তো সেদিন সেজান গেয়েছিলেন, ‘মুক্তির লেইগা যুদ্ধ কইরা মুক্তিডাই তর মিলল কই?/ ভাষার লেইগা লইড়া যদি বোবা হইয়াই পইড়া রই!’ সামন্তসুলভ পরিবার বা দলতন্ত্রের বিপরীতে রাষ্ট্রে নাগরিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ও এই অভ্যুত্থানে প্রতিধ্বনিত সত্য, ‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারও বাপের না’।
কারও পারিবারিক উত্তরাধিকার তো নয়ই, চব্বিশের জুলাই এ দেশে কোনো মজলুমের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যও হয়নি। ‘বৈষম্যবিরোধী’ নামে সূত্রপাত হলেও এটা সর্বহারার একনায়কতন্ত্রে সাম্যবাদী শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যও হয়নি। এই অভ্যুত্থানের সূচনা আওয়ামী দলতান্ত্রিক কোটারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক চাকরিতে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের ন্যায্য সুযোগের দাবি নিয়ে। বংশগত পরিচয়ের বিপরীতে ব্যক্তির মেধার ন্যায্য মূল্যায়ন তো আদতে সামন্ততন্ত্রের বিপরীতে আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মৌলিক প্রতিশ্রুতি। ‘মেধা না কোটা?/ মেধা, মেধা’ সেই সহজ সত্যেরই স্লোগান। চোখের সামনের এসব সহজ সত্য ভুলে রাজনীতির ‘গুপ্ত সত্যে’ আসক্ত আওয়ামী সরকার, অতীতের আর সব স্বৈরাচারের মতোই গোয়েন্দাসূত্রে পাওয়া তথ্যকেই ধ্রুব সত্য জ্ঞান করে নাগরিকদের এই সর্বাত্মক আন্দোলনকে নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেনি।
অথচ চব্বিশের অভ্যুত্থানের সত্য হচ্ছে এই আন্দোলনের মূল নায়ক কোনো একক বা কতিপয় ব্যক্তি নন, কোনো দল বা গোষ্ঠী নয়। এই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে ছাত্র-জনতার এক সম্মিলিত শক্তি, যারা এই প্রলম্বিত স্বৈরশাসনের আশু অবসান চেয়েছে, নাগরিক হিসেবে ব্যক্তি আর বাক্স্বাধীনতা ফেরত চেয়েছে। আর যেকোনো সময়ের যেকোনো সরকারবিরোধী দলের মতো আওয়ামীবিরোধী রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীগুলোও এই আন্দোলনকে শক্তি জুগিয়েছে সত্য, কিন্তু তারা মোটেই এর চালিকা শক্তি ছিল না। এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কার্যকারণ বা চালিকা শক্তি ১৫ বছরের স্বৈরশাসন নিজেই। যে তরুণ প্রজন্মকে আওয়ামী সরকার একদিকে মুক্তিযুদ্ধ আর অন্যদিকে ধর্মবোধকে উসকে দিয়ে প্রতারিত ও বিভাজিত করেছিল ২০১৩ সালের শাহবাগ আর শাপলায়, যে প্রজন্মকে ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনে ধোঁকা দিয়েছিল, যে প্রজন্মকে শুধু নিরাপদ সড়ক চাওয়ায় পুলিশ আর দলের হেলমেট বাহিনী দিয়ে নির্দয় হাতে দমন করেছিল একই বছরে, তাদের যৌথ সত্তাই চব্বিশের এই অভ্যুত্থানের মূল কর্তাসত্তা। তারা ইতিহাসের দলছুট কোনো প্রজন্ম নয়, কোনো ভিনগ্রহের আগন্তুক নয়, তারা জাতি হিসেবে আমাদের আবহমান রাজনৈতিক সংগ্রামেরই উত্তরাধিকার।
চব্বিশের বড় সত্য এটাও যে এই প্রজন্ম আরও অনেক বছর তরুণই থাকবে, রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে তাদের আপাত নীরব ও নির্লিপ্ত পর্যবেক্ষণ জারি থাকবে। সত্য এটাও যে অনেক বছর এ দেশের রাজনীতিকদের চব্বিশের এই সত্তাটিকে, তাদের আবার রাস্তায় নেমে আসার সম্ভাবনাকে মাথায় রেখেই নিজেদের রাজনীতি সাজাতে হবে।
বিপ্লব শুধু বেহাতই হয় না, ইতিহাস সাক্ষী যে এমনকি আপাত ব্যর্থ বিপ্লবের গর্ভ থেকেও নতুন বিপ্লবের কল্পনাশক্তি জন্ম নেয়। ১৮৭১ সালের পারি কমিউন তার রক্তাক্ত পরিসমাপ্তির আগে টিকে ছিল মাত্র ৭২ দিন। কিন্তু সেই ৭২ দিনের বিকল্প সমাজ সম্ভব করেছিল ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবকে, ক্রমেই আমূল বদলে দিয়েছিল ইউরোপের রাজনৈতিক চেতনার পাটাতন। অত দূর বা ইতিহাসের এত পেছনে যেতে না চাইলে ভাবা যেতে পারে আমাদের ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কথা। ‘বিকল্প নেই’ তত্ত্বকে আঁকড়ে টিকে থাকা আওয়ামী সরকারের হাত থেকে সড়কের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়ে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল একটি ট্রাফিক ব্যবস্থার শহরকে সুনিপুণ ব্যবস্থাপনায় চালিয়েছিল স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। আওয়ামী লীগের নির্দয় আক্রমণের মুখে তাদের শেষমেশ পিছু হটতে হয়েছিল, হতাশ হয়ে ঘরে ফিরতে হয়েছিল। ২০২৪ সালে তাঁরাই কিন্তু রাস্তায় ফিরে ঘোষণা দিয়েছেন ‘আমিই বিকল্প’, পতন ঘটিয়েছেন সেই সরকারের। তারপর আবার কিছুদিন মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক সামলে, দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি এঁকে ঘরে আর ক্লাসে ফিরে গিয়েছেন।
চব্বিশের বড় সত্য এটাও যে এই প্রজন্ম আরও অনেক বছর তরুণই থাকবে, রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে তাদের আপাত নীরব ও নির্লিপ্ত পর্যবেক্ষণ জারি থাকবে। সত্য এটাও যে অনেক বছর এ দেশের রাজনীতিকদের চব্বিশের এই সত্তাটিকে, তাদের আবার রাস্তায় নেমে আসার সম্ভাবনাকে মাথায় রেখেই নিজেদের রাজনীতি সাজাতে হবে।
bokhtiar.ahmed@iub.edu.bd
বখতিয়ার আহমেদ: অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)