আট হাজার সরকারি চাকুরের মুক্তিযোদ্ধা সনদ সন্দেহজনক

মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরকারি চাকরি পাওয়া ব্যক্তিদের জমা দেওয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও তথ্য যাচাই–বাছাই করছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। সূত্র জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত যাচাইয়ে অন্তত আট হাজার জনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও তথ্য সন্দেহজনক পাওয়া গেছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি ১০০ জনের নাম যাচাই করতে গিয়ে ৭ থেকে ৮ জনের দেওয়া তথ্য সঠিক নয় বা তথ্যে গরমিল রয়েছে বলে উঠে আসছে।

মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ নিয়ে যাঁরা সরকারি চাকরি করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার। ১৪ আগস্ট সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন ফারুক–ই–আজম। পরদিনই তিনি মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন। যদিও যাচাই–বাছাই শেষ করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি ১০০ জনের নাম যাচাই করতে গিয়ে ৭ থেকে ৮ জনের দেওয়া তথ্য সঠিক নয় বা তথ্যে গরমিল রয়েছে বলে উঠে আসছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী ১৪ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে যাঁরা চাকরি করছেন, তাঁদের পাঠানো তথ্যে গরমিল ও ভুলভ্রান্তি ছিল। তাঁদের কাছ থেকে আবারও তথ্য চাওয়া হয়েছে। সে কারণে সময় বেশি লাগছে। তিনি বলেন, তালিকা যাচাই–বাছাই শেষ। এখন পরিবীক্ষণের কাজ চলছে। তবে এ মন্ত্রণালয়ে জনবল কম। এ জন্য তালিকা চূড়ান্ত করতে সময় লাগছে।

নিজেদের সহকর্মীদের বাঁচানোর চেষ্টা হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘এটা একেবারে ভুল। কাজের চাপ থাকায় তালিকা করতে সময় লাগছে।’

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে ১৯৭২ সাল থেকেই মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছিল। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের নির্ধারিত কোটার ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করে। ২০১১ সালে মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদেরও ওই কোটাসুবিধার আওতায় আনা হয়। সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা কোটার পরিমাণ ছিল ৩০ শতাংশ। মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ বিভিন্ন কোটা বাতিল হয় জুলাই আন্দোলনের ফলে।

যখনই সরকার ভুয়া সনদে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরিজীবীদের নাম প্রকাশ করতে যাবে, তখনই তদবির শুরু হবে। ফলে এ তালিকা হয়তো কখনো আলোর মুখ দেখবে না।
এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার, সাবেক রেক্টর, বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি কতজনের

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ৫৭টি মন্ত্রণালয় এবং নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশনে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠির সঙ্গে একটি ছক উল্লেখ করা হয়। ছকে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির নাম ও পদবি, মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির সম্পর্ক, এমআইএস (মুক্তিযোদ্ধার তালিকার তথ্যভান্ডার) নম্বর, ভারতীয় তালিকা ও লাল মুক্তিবার্তায় নাম এবং গেজেটের তথ্য জানতে চাওয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদে যাঁরা চাকরি নিয়েছেন, তাঁদের তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এঁদের চাকরিচ্যুত করার ক্ষমতা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে তথ্য আসতে থাকে। সব তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ক্যাডার ও নন-ক্যাডার মিলে চাকরি করছেন ৯০ হাজার ৫২৭ জন। উল্লেখ্য, সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, অনেকে সঠিক তথ্য দেননি। আবার অনেকের তথ্যে গরমিল ছিল। ৩৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে আসা তথ্য অসম্পূর্ণ পাওয়া যায়। এরপর ৭৬৯ জনের কাছ থেকে আবারও তথ্য চাওয়া হয়। পরে তাঁদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র আরও জানিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৯০ হাজার ৫২৭ জনের তথ্য প্রাথমিক যাচাই–বাছাইয়ের কাজ শেষ করেছে। এখন আবার পরিবীক্ষণ চলছে। ৬৭ হাজার চাকরিজীবীর তথ্য পরিবীক্ষণের কাজ শেষ হয়েছে। বাকিদের পরিবীক্ষণের কাজ শেষ করতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে।

পরিবীক্ষণ শেষ হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কতজনের জমা দেওয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ অথবা তথ্য সঠিক নয়, তা আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ বলতে রাজি হননি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদে যাঁরা চাকরি নিয়েছেন, তাঁদের তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এঁদের চাকরিচ্যুত করার ক্ষমতা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

কামালের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি এবং চাকরি লাভসহ বিভিন্ন সুবিধা পেতে জন্মদাতা পিতা মো. আবুল কাশেম ও মা মোছা. হাবীয়া খাতুনের পরিবর্তে আপন চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আহসান হাবিব ও চাচি মোছা. সানোয়ারা খাতুনকে পিতা-মাতা সাজান।

মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ জমা দিয়ে সরকারি চাকরি করার খবর বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। ভুয়া সনদ ব্যবহার করে ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের কোটায় প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি নিয়েছিলেন কামাল হোসেন। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ছিলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জালিয়াতি ধরা পড়ার পর তাঁকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় কামাল হোসেন এখন কারাগারে।

কামালের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি এবং চাকরি লাভসহ বিভিন্ন সুবিধা পেতে জন্মদাতা পিতা মো. আবুল কাশেম ও মা মোছা. হাবীয়া খাতুনের পরিবর্তে আপন চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আহসান হাবিব ও চাচি মোছা. সানোয়ারা খাতুনকে পিতা-মাতা সাজান।

২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি প্রথম আলো তৎকালীন পাঁচজন সচিব মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও যে সনদ নিয়েছেন, সে বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাঁরা হলেন তৎকালীন স্বাস্থ্যসচিব নিয়াজ উদ্দিন মিঞা, তখন ওএসডি হওয়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকী, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সচিব এ কে এম আমির হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান (তখন প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় বেসরকারীকরণ কমিশনের চেয়ারম্যান) এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (ওএসডি) আবুল কাসেম তালুকদার। পরে তদন্ত শেষে তাঁদের সনদ বাতিল করা হয়।

গোঁজামিল দিয়ে আর কত দিন রাষ্ট্র চলবে? স্বচ্ছতার জন্য এ তালিকা প্রকাশ করা উচিত।
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার

‘হয়তো কখনো আলোর মুখ দেখবে না’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) মোট ১২টি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় মোট ৩৯৬ জনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই ৩৯৬ জনের সনদ ব্যবহার করে তাঁদের পরিবারের কেউ সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন কি না, তা যাচাই জরুরি। সরকার চাইলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারত। তবে নেওয়া হয়নি। অবশ্য কারও কারও মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল করা হলেও আদালতের আদেশে তা তাঁরা ফিরে পান।

সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ভুয়া সনদ ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যাঁরা চাকরি করছেন, কোনো রাজনৈতিক সরকারই তাঁদের নাম প্রকাশের ব্যাপারে স্বচ্ছ ছিল না। তিনি বলেন, যখনই সরকার ভুয়া সনদে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরিজীবীদের নাম প্রকাশ করতে যাবে, তখনই তদবির শুরু হবে। ফলে এ তালিকা হয়তো কখনো আলোর মুখ দেখবে না।

আবদুল আউয়াল মজুমদার আরও বলেন, গোঁজামিল দিয়ে আর কত দিন রাষ্ট্র চলবে? স্বচ্ছতার জন্য এ তালিকা প্রকাশ করা উচিত।