আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি

‘ওসি বলেন ফায়ার, এরপর আমার পায়ে গুলি করা হয়’

যশোরের চৌগাছা উপজেলায় ছাত্রশিবিরের দুই নেতার পায়ে গুলির ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ আজ মঙ্গলবার সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচার শুরু হয়।

সূচনা বক্তব্যের পর এ মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ভুক্তভোগী চৌগাছা থানা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন। তিনি ওই ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরেন।

ট্রাইব্যুনালে আজ সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর মোহাম্মদ জহিরুল আমিন। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বিরোধী দলগুলো আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলন দমনে বিরোধী দলের সক্রিয় কর্মীদের টার্গেট করে গুম, ক্রসফায়ার ও নির্যাতন করতে থাকে সরকার। এরই অংশ হিসেবে ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট ছাত্রশিবিরের দুই নেতার পায়ে গুলি করে তাঁদের পঙ্গু করে দেওয়া হয়।

২০১৬ সালে যশোরের চৌগাছা থানা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন ও সাহিত্য সম্পাদক রুহুল আমিনের পায়ে গুলি করা হয়। এ ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে করা মামলায় আটজনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে পলাতক পাঁচ আসামি হলেন যশোরের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুর রহমান, চৌগাছা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান, সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) মোকলেছুজ্জামান, সাবেক এসআই মো. জামাল হোসেন ও সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মাজেদুল ইসলাম। আর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন সাবেক এসআই এস এম আকিকুল ইসলাম, সাবেক কনস্টেবল কাজী জহুরুল হক ও সাবেক কনস্টেবল মো. সাজ্জাদুর রহমান।

সূচনা বক্তব্যের পর এ মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ভুক্তভোগী ইসরাফিল হোসেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, বর্তমানে তিনি যশোরে ইবনে সিনা হাসপাতালে পাবলিক রিলেশন অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। যখন তিনি আক্রান্ত হন, তখন তিনি চৌগাছা থানা শিবিরের সেক্রেটারি ছিলেন। তাঁর সঙ্গে পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়া রুহুল আমিন ছিলেন তখনকার চৌগাছা থানা শিবিরের সাহিত্য সম্পাদক।

ইসরাফিল হোসেন বলেন, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট দুপুরে তিনি ও তাঁর বন্ধু রুহুল আমিন সাংগঠনিক কাজ শেষে মোটরসাইকেলে করে যশোর শহর থেকে চৌগাছার নারায়ণপুরে যাচ্ছিলেন। সেদিন বিকেলে চৌগাছার বন্দলীতলা গ্রামে পৌঁছালে পুলিশ তাঁদের থামায়। পুলিশ তাঁদের আটক করে থানায় নিয়ে যায়। সেদিন রাত ১১টার পর তাঁদের চৌগাছা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমানের কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁদের মারধর করা হয়।

ভুক্তভোগী বলেন, নির্যাতনের একপর্যায়ে আসামি সাবেক এসআই আকিকুল ওসিকে বলেন, ‘স্যার, এদের ব্রেন ওয়াশ করা, এরা কিছু বলবে না। এদেরকে গুলি করে দেন।’ সরকারবিরোধী আন্দোলনে কারা কারা সঙ্গে জড়িত, তা তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। পরে রাত ১২টার দিকে তাঁদের আবার হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

ইসরাফিল হোসেন বলেন, এসআই আকিকুলের নেতৃত্বে পরদিন (২০১৬ সালের ৪ আগস্ট) সকালে চৌগাছা থানা থেকে তাঁদের যশোর ডিবি (পুলিশের গোয়েন্দা শাখা) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে ডিবির একজন সদস্য তাঁদের বলেছিলেন, এসপির (পুলিশ সুপার) নির্দেশ আছে; রাতে তাঁদের ক্রসফায়ার দেওয়া হবে। সেদিন সন্ধ্যার পর এসআই আকিকুলের নেতৃত্বে ডিবি অফিস থেকে তাঁদের নিয়ে চৌগাছা থানার উদ্দেশে রওনা দেওয়া হয়। পথিমধ্যে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাঁকে হাতকড়া পরানো হয় এবং চোখ গামছা দিয়ে বাঁধা হয়। চৌগাছার বন্দলীতলা মাঠের পাশে তোতা মিয়ার বাড়ির সামনে তাঁদের গাড়ি থেকে নামায় এবং রাস্তার পাশে দাঁড় করায়।

ইসরাফিল হোসেন বলেন, একপর্যায়ে ওসি মশিউর বলেন ফায়ার অফ (গুলি বন্ধ করো)। এর অল্প কিছুক্ষণ পর ওসি মশিউর বললেন, সাজ্জাদ, জহুরুল ‘ফায়ার’। সঙ্গে সঙ্গে একটি বিকট শব্দ হয় এবং তাঁর বন্ধু রুহুল আমিন ‘ও মাগো’ বলে চিৎকার করে ওঠেন। এর অল্প কিছুক্ষণ পর তিনি বাঁ পায়ের হাঁটুতে বন্দুকের স্পর্শ পান এবং তাঁর পা গুলিবিদ্ধ হয়। এরপর তিনি পড়ে যান এবং পুলিশ তাঁর হাতকড়া ও চোখের বাঁধন খুলে দেয়। তিনি চোখ খুলে দেখেন, তাঁর বন্ধু পাশে পড়ে আছে। পুলিশ কিছু ধুলাবালি তাঁদের ক্ষতস্থানে মেখে তা গামছা দিয়ে বেঁধে দেয়। সেখানে তিনি ওসি মশিউর, এসআই আকিকুল, এএসআই মাজেদ, কনস্টেবল জহুরুল ও সাজ্জাদকে দেখতে পান।

ক্ষতস্থানে বালু দেওয়ার কারণে ইনফেকশন হলে তাঁর পায়ে পচন ধরে যায় উল্লেখ করে ইসরাফিল হোসেন বলেন, ফলে তাঁর বাঁ পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়। এ সময় সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে তাঁর বাঁ পা দেখান, যা হাঁটুর ওপর থেকে বিচ্ছিন্ন। এই পুরো ঘটনার জন্য আনিসুর রহমান, মশিউর রহমান, আকিকুল ইসলাম, মাজেদ, সাজ্জাদ ও জহুরুলের শান্তি চান তিনি।