‘পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা: তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। ৮ অক্টোবর
‘পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা: তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। ৮ অক্টোবর

ডিসেম্বরের আগেই গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পন্ন হবে, আশা পানিসম্পদমন্ত্রীর

চলতি বছরের ডিসেম্বরের আগে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে আশাবাদের কথা জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেছেন, গঙ্গা চুক্তিতে মূল অগ্রাধিকার থাকবে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ফিরিয়ে আনা।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ‘পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা: তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা’ শীর্ষক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পানিসম্পদমন্ত্রী এ প্রত্যাশার কথা জানান। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস-বিস) নিজেদের মিলনায়তনে এ আয়োজন করে।

শহীদউদ্দীন চৌধুরী জানান, আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চের মধ্যে পদ্মা ব্যারাজের কাজ দৃশ্যমান হবে। এ ছাড়া তিস্তা বহুমুখী প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে আগামী বছর সরকার মূল কাজ শুরু করতে চায় বলেও জানান তিনি।

পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রজেক্ট এবং বাংলাদেশের জন্য মাস্টারমাইন্ড প্রজেক্ট। যেখানে বাংলাদেশের মোট অঞ্চলের তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ এর সুফল পাবে। পদ্মা ব্যারাজের কাজ দৃশ্যমান করার জন্য একনেকে পাস হয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চের যেকোনো এক সময়ে কাজ দৃশ্যমান হবে।’

‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ’ মন্তব্য করে শহীদউদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘এটি একটি খরস্রোতা নদী। ভারত থেকে উজানের পানি যেভাবে ভাটি এলাকায় আসছে, দীর্ঘদিন থেকে এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে ওই অঞ্চলের মানুষ জীবনধারণ করছে। আমরা এই মহাপরিকল্পনার নামে যা আলোচনা করছি, এটা নিয়ে প্রচুর সেমিনার হয়েছে এবং হচ্ছে। বুয়েটের যেসব বিশেষজ্ঞ সদস্য রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, মিটিং করেছি এবং দায়িত্ব দিয়েছি। দেশি-বিদেশি অনেক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছি। কারণ, তাঁদের কারিগরি সহায়তা বা টেকনিক্যাল সাপোর্ট নেওয়া আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন।’

পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘খুব শিগগির এর ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ হাতে নিতে হবে। স্টাডির ভিত্তিতেই আমরা প্রজেক্টের কাজ শুরু করব। আমরা আশা করছি, এটি সম্পূর্ণ করতে কিছুটা সময় লাগবে। ২০২৭ সালের মধ্যে সব শেষ করে যেন ২০২৭ সালে মূল কাজ শুরু করা যায়, সেদিকে আমাদের বিশেষ নজর রয়েছে।’ তিনি বলেন, অন্যদিকে গঙ্গা চুক্তি নিয়ে সবাই বেশ উদ্‌গ্রীব। ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর এই ৩০ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ১৯৭৭ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় প্রথম পাঁচ বছরের জন্য চুক্তি হয়েছিল, যাতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল। কিন্তু ১৯৯৬ সালে সেই গ্যারান্টি ক্লজ বাদ রেখে চুক্তিটি নবায়ন বা নতুন চুক্তি করা হয়।

পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘১২ ডিসেম্বরের আগেই আমাদের নতুন চুক্তি করতে হবে। সেই অনুযায়ী বাংলাদেশ এবং ভারত উভয় পক্ষ যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বৈঠকের ভিত্তিতে আমরা আশাবাদী যে ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বরের আগেই চুক্তি সম্পন্ন হবে। সেখানে আমাদের মূল অগ্রাধিকার থাকবে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো গ্যারান্টি ক্লজ ফিরিয়ে আনা।’

পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা প্রকল্পে বহির্বিশ্বের কোনো চাপ বা প্রতিবন্ধকতা অনুভব করছেন কি না, জানতে চাইলে শহীদউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘পদ্মা ও তিস্তার পাড়ে যাঁরা বাস করেন, তাঁরা আমাদের দেশেরই মানুষ। আমার দেশের মানুষের স্বার্থ ও চাপই আমার কাছে সবচেয়ে বড় চাপ। সেই চাপকে ধারণ করে দেশের মানুষের কল্যাণ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজের সমীক্ষা সম্পন্ন করতেই ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগেছিল। পরবর্তী সময়ে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে তা চূড়ান্ত করে কাজ হাতে নিয়েছি। তিস্তার মতো বৃহদায়তন প্রকল্পের সমীক্ষা রাতারাতি বা এক-দুই মাসে সম্ভব নয়। অতীতে যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা পর্যাপ্ত কারিগরি সহায়তা নিয়ে কাজ শেষ করেননি। তাই আমাদের সরকার নিজ উদ্যোগেই এই কাজ সম্পন্ন করে প্রকল্পটিকে দৃশ্যমান রূপ দেবে।’

ভারতের প্রতিনিধিদের নাম চেয়েছে ঢাকা

বিসের সেমিনার উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। ৮ অক্টোবর

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টনে সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি কমিটি গঠন করেছে এবং ভারতের প্রতিনিধিদের নাম চাওয়া হয়েছে।

আজ বিসের সেমিনার উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা চায়। পানিবণ্টনের বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনের অবস্থান রয়েছে। পানি ইস্যুতে সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সংলাপ প্রয়োজন।

প্রতিমন্ত্রী জানান, এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ এরই মধ্যে একটি কমিটি গঠন করেছে এবং ভারতের পক্ষের প্রতিনিধিদের নাম চাওয়া হয়েছে।

গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ভারতের কাছে নাম চেয়েছি, যাতে আমাদের প্রতিনিধিরা তাদের সঙ্গে সংলাপ ও আলোচনা শুরু করতে পারেন। এখন আমাদের তাদের জবাবের অপেক্ষা করতে হবে।’

ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, খুব শিগগির এ বিষয়ে জবাব পাওয়া যেতে পারে। এরপর দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে পরবর্তী দফার পানি চুক্তি নবায়নের পথ প্রশস্ত হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে সহযোগিতার মানসিকতা থাকলে পানি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান সম্ভব। কূটনীতি ও সংলাপের মাধ্যমেই এসব বিষয় সমাধান করতে হবে।