
এবারের বাজেটেও কওমি শিক্ষাধারার জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। এতে বঞ্চিত হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কওমি মাদ্রাসার ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। যদিও দেওবন্দি ঘরানার মূলনীতি ‘উসুলে হাশতেগানা’য় সরকারি অর্থায়ন গ্রহণ না করার রীতি রয়েছে। তবে কওমি মাদ্রাসার স্বকীয়তা বজায় রেখে সরকারি বরাদ্দ নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তাবনা দাঁড় করাতে হবে, যাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকা যায়।
‘কওমি তরুণদের বাজেট–ভাবনা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে কওমি অঙ্গনের তরুণ আলেমদের আলোচনায় এসব বিষয় উঠে এসেছে। আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর তোপখানা রোডে শিশুকল্যাণ পরিষদের সম্মেলনকক্ষে ‘সাধারণ আলেম সমাজ’–এর ব্যানারে এই বৈঠক হয়।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসলামি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক আবদুল্লাহ মাসুম। তিনি বলেন, ওলামায়ে কেরামদের মধ্যে যারা ইসলামি দল করেন, তাঁরা একসময় বাজেট নিয়ে কথাই বলতেন না। এখন অবশ্য কথা বলেন। কিন্তু বাজেট নিয়ে তাঁদের উপস্থাপন অনেকটা বামপন্থীদের মতো।
আবদুল্লাহ মাসুম বলেন, এবারের বাজেটে রাজস্বনীতি ও প্রশাসনকে আলাদা করার উদ্যোগ, করবহির্ভূত আয়ে গুরুত্বারোপ ও বাজেট বক্তব্য বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু করার বিষয়গুলো ইতিবাচক। আর সীমাবদ্ধতাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এবারের বাজেট বক্তব্যে ২০০৫-০৬ সালের সঙ্গে তুলনা করা। এর ফলে তথ্যগত কিছু জায়গায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক অনেকগুলো মূলনীতি গ্রহণ করা হলেও সেখানে ইসলামি অর্থনীতির কথা উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি কওমি শিক্ষার কথাও সেখানে উল্লেখ নেই।
দেওবন্দি ঘরানার মূলনীতি ‘উসুলে হাশতেগানা’র কথা উল্লেখ করে আবদুল্লাহ মাসুম বলেন, কওমি মাদ্রাসার স্বকীয়তা বজায় রেখে এবং হস্তক্ষেপমুক্ত অবস্থায় সরকারি বরাদ্দ নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তাবনা দাঁড় করাতে পারলে ভালো হবে।
রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক
কওমি মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থী মোফাজ্জল ইবনে মাহফুজ এখন লেদার ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সদস্য সচিব। বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন ব্যবসা করি, তখন আমরা এটাকে আটা, মধু বা কালিজিরার মধ্যে সীমাবদ্ধ করি।’
বাংলাদেশ ইসলামি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ গঠনের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন জানিয়ে মোফাজ্জল ইবনে মাহফুজ বলেন, এটি প্রতিষ্ঠা করা গেলে ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের ব্যবসার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারবে।
ইমাম সমাজ বাংলাদেশের মহাসচিব মুফতি মো. মিনহাজ উদ্দীন বলেন, বিদ্যমান ওয়াক্ফ সম্পত্তির অবস্থা নাজেহাল। এই সম্পত্তির আধুনিকায়ন এবং আমানতদারির সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে মাদ্রাসার জরুরত (প্রয়োজন) পূরণ তো হবেই, সরকারও রাজস্ব পাবে। কওমি মাদ্রাসার জন্য সাহায্য চাওয়ার বিষয়টি পরিহার করে বরাদ্দের দাবি তুলতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের সদস্যসচিব সানাউল্লাহ খান বলেন, রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারেনি কওমি অঙ্গন। সম্পর্ক তৈরি না হলে রাষ্ট্র কখনো কওমি মাদ্রাসা নিয়ে ভাববে না। এতিম মানেই কওমি মাদ্রাসা—এই চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের সভাপতি মুহাম্মদ রায়হান আলী বলেন, কওমি সনদের স্বীকৃতি কোনো কাজে আসছে না। এই স্বীকৃতি যাতে কাজে লাগে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে।
‘রাষ্ট্র, বাজেট, অর্থনীতি বুঝতে হবে’
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন লেখক–গবেষক মুসা আল হাফিজ। তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে ভর্তুকি স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। সরবরাহব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।
কওমি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মুসা আল হাফিজ বলেন, ‘আমরা পুরো রাষ্ট্র, বাজেটের প্রক্রিয়া, দেশের অর্থনীতি বুঝতে পারছি কি না, এটা গুরুত্বপূর্ণ।’
গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজক সাধারণ আলেম সমাজের মুখপাত্র রিদওয়ান হাসান বলেন, রাষ্ট্রে শিক্ষার ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু নাগরিক অধিকারে কোনো ভিন্নতা থাকতে পারে না। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অধিকারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তা অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি এনবিআরে জমা দেওয়া হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে অন্যদের মধ্যে সাধারণ আলেম সমাজের সভাপতি মাছুম বিল্লাহ মাহমুদী ও সাধারণ সম্পাদক আকিফ আবদুল্লাহ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রচার সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী, প্রথম আলোর ধর্ম বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মনযূরুল হক, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক ইউসুফ পিয়াস, বৈষম্যবিরোধী কওমি ছাত্র আন্দোলনের নেতা মো. মাকছুদুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য দেন।