
মঙ্গলবার কর্মদিবস। দিনভর কাজের ব্যস্ততা শেষে সন্ধ্যায় নর্থ হলিউডের বারব্যাঙ্ক বুলেভার্ডের সায়েন্টোলজি সেন্টারের বিশাল মিলনায়তনে একে একে উপস্থিত হচ্ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কেউ কাজ শেষ করে সরাসরি এসেছেন, কেউ এসেছেন লস অ্যাঞ্জেলেসের দূরের এলাকা থেকে। সিলেটিদের সংগঠনের আয়োজন হলেও সেদিন সেখানে জড়ো হয়েছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বাংলাদেশিরা। উপলক্ষ—বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীকে সংবর্ধনা।
দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে, কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝেও এই আয়োজন যেন অনেকের কাছে ছিল শিকড়ের কাছে ফেরার মতো। পরিচিতদের সঙ্গে কুশল বিনিময়, দেশের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা আর প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা—সব মিলিয়ে সন্ধ্যার আয়োজনটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশি কমিউনিটির মিলনমেলা।
প্রবাসী সিলেটিদের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক সংগঠন জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়া ইনক. (জেএসি) ১ সেপ্টেম্বর এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটি ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসরত সিলেট অঞ্চলের প্রবাসীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে আসছে।
ফুল দিয়ে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীকে স্বাগত জানান আয়োজকেরা। সিলেটের সন্তান এই মন্ত্রী নিজের প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘৩৬ বছর আগে আমি এখানে এসেছিলাম। আমিও প্রবাসী ছিলাম। তাই প্রবাসীদের আমি বুঝতে পারি। এখানে সিলেটের সকলে থাকলেও আমরা সবাই মূলত বাংলাদেশি। আমরা এলাকার উন্নয়নের জন্য যার যার জায়গা থেকে কাজ করব।’
এরপরই মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আর বিভাজনের দিকে যেতে চাই না। এবার সম্মিলিতভাবে দেশটাকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে চাই।’
জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়ার সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল মুনিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আহমেদ ও নির্বাহী কমিটির সদস্য বদরুল আলম মাসুদ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল কাজী মুহাম্মদ জাবেদ ইকবাল, বিশিষ্ট শিল্পপতি ও কেপিসি গ্রুপের চেয়ারম্যান কালী প্রদীপ চৌধুরী এবং এলএইচসিএম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী।
প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, প্রবাসীদের কাছ থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে পাওয়া ৪৬৮টি অভিযোগের মধ্যে ২৮৫টি ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। অভিযোগগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মনিটরিং সেলের মাধ্যমে কাজ করা হচ্ছে।
শ্রমিকদের বেতন-ভাতার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, তিনি শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও রয়েছেন। এবার ঈদের আগে পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বেতন নিয়ে অতীতের মতো আন্দোলন বা বড় ধরনের সমস্যা হয়নি। আলোচনা ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে কাজ করার কথাও বলেন মন্ত্রী।
প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগের কথা জানান মন্ত্রী। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের কী কী সুবিধা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রবাসীদের সেবা আরও সহজ করতে বিমানবন্দরে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
প্রবাসীদের প্রতি দেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, যাঁরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চান, তাঁরা সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। ই-মেইলের মাধ্যমেও যোগাযোগ করা যাবে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কী কী কাগজপত্র লাগবে, কোথায় যোগাযোগ করতে হবে এবং কীভাবে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে—এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও চেকলিস্ট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংককে শিডিউল ব্যাংকে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রবাসীদের জন্য ঋণসুবিধার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের বিনিয়োগ ও অভিজ্ঞতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে।
প্রবাসীদের জন্য বিমানবন্দরে বিশেষ সেবার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পায়। এ বিষয়ে মন্ত্রী জানান, বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী লাউঞ্জ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশে মারা যাওয়া বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও সরকারি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মারা যাওয়া প্রবাসীদের মরদেহ সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশে এনে তাঁদের নিজ বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হজযাত্রীদের জন্য হজ ক্যাম্পসহ প্রবাসীদের সুবিধার জন্য আরও বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল কাজী মুহাম্মদ জাবেদ ইকবাল বলেন, কনসুলেট ও ব্যক্তিগতভাবে তিনি প্রবাসীদের সব ধরনের সহযোগিতা করতে সব সময় প্রস্তুত আছেন।
অনুষ্ঠানে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব ভবন ও কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল মুনিম বিশিষ্ট শিল্পপতি ও কেপিসি গ্রুপের চেয়ারম্যান কালী প্রদীপ চৌধুরীর কাছে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের ভবন নির্মাণে সহযোগিতার আহ্বান জানান। উপস্থিত অন্যরাও এ উদ্যোগে সহযোগিতার আহ্বান জানান।
কালী প্রদীপ চৌধুরী সংগঠনের এই উদ্যোগে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, নিজের জন্মভূমির জন্যও তাঁর কিছু করার ইচ্ছা রয়েছে।
এরপর মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী তাঁকে বাংলাদেশে একটি হাসপাতাল নির্মাণের আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
কালী প্রদীপ চৌধুরীও বাংলাদেশে হাসপাতাল নির্মাণের আগ্রহের কথা জানান। তিনি বলেন, সিলেটের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীর এবং সিলেটিদের জন্য কিছু করতে তিনি আগ্রহী।
অনুষ্ঠানে বক্তারা সিলেটের উন্নয়নে প্রবাসীদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। সৈয়দ নাসির জেবুল তাঁর বক্তব্যে সিলেটের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রবাসীদের ভূমিকার কথা বলেন। সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কবরস্থানসহ বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগে প্রবাসীদের অবদানের প্রসঙ্গও উঠে আসে।
বক্তারা বলেন, সিলেটের সঙ্গে প্রবাসীদের সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক নয়; সামাজিক ও আবেগের বন্ধনও গভীর। দেশের বাইরে থেকেও তাঁরা নিজ এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন।
জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব ভবন নির্মাণের উদ্যোগেও সবাইকে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন প্রবাসীদের একজন প্রতিনিধি। ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপির সভাপতি বদরুল আলম চৌধুরী দেশে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
বক্তারা বলেন, প্রবাসীরা দেশের বাইরে থাকলেও দেশের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক গভীর। দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপদ পরিবেশ থাকলে প্রবাসীদের বিনিয়োগ ও দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও বাড়বে।
সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ আব্দুল মুনিম অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে কমিউনিটির ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, প্রবাসীদের নিজেদের মধ্যে বিভাজন না করে কমিউনিটির স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে গ্রেটার খুলনা অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়ার উপদেষ্টা কাঞ্চন চৌধুরী ও সভাপতি ফারুক হাওলাদার মন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
অনুষ্ঠানে ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপির সভাপতি বদরুল আলম চৌধুরী (শিপলু) এবং সাধারণ সম্পাদক এম ওয়াহিদ রহমানসহ বিএনপির নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ বাসিত, সৈয়দ নাসির জেবুল, মোহাম্মদ আব্দুল মুনিম, সুলতানা রাজিয়া সুবহান, মোয়াজ্জেম আহমেদ রাসেল, মইনুল হক, মুশফিকুর চৌধুরী, বদরুল আলম মাসুদ, আবদুল বাসেত, লোকমান হোসেন, মাহতাব আহমেদ, শিপার চৌধুরী, নাসির খান, আফজাল হোসাইন সিকদার, চপল আনসারি, মনিরুল ইসলাম, আবদুল হাকিম, সাইফুর আনসারি, হাসানাত খন্দকার, নিয়াজ মোহাইমিন, মাহবুবুর রহমান শাহীন, খন্দকার আলম, কাঞ্চন চৌধুরী, লিটু আহমেদ, মার্শাল হক, ইলিয়াস মিয়া, ইলিয়াস সিকদার, মোহাম্মদ হান্নান, খান মুহাম্মদ আলী, আবুল হাশেম, মাহবুবুর রহমান, মোর্শেদ আলম প্রমুখ।
দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে সেদিন সন্ধ্যায় নর্থ হলিউডের ওই মিলনায়তনে এক জায়গায় মিলেছিলেন সিলেট ও বাংলাদেশের নানা প্রান্তের মানুষ। কেউ এসেছিলেন সংগঠনের টানে, কেউ মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে, কেউবা পরিচিত মানুষদের সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে।
তবে পুরো আয়োজনজুড়ে সবচেয়ে বেশি ফিরে এসেছে একটি বিষয়—প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা এবং দেশের উন্নয়নে তাঁদের সম্পৃক্ত করা।
দেশ থেকে দূরে থাকলেও শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখার প্রত্যয় আর বিভাজনের বদলে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়ার এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।