
ঈদের ছুটিতে মায়ের সঙ্গে নানাবাড়িতে বেড়াতে এসেছিল দুই ভাই–বোন। নতুন জামা, স্বজনদের সান্নিধ্য আর গ্রামের উৎসবমুখর পরিবেশে ভালোই কাটছিল সময়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই আনন্দ বদলে গেল শোকে।
ছোট ভাইকে বাঁচাতে পানিতে ঝাঁপ দিয়েও শেষরক্ষা হয়নি বড় বোনের। দুজনেই পানিতে ডুবে মারা যায়।
গত বুধবার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের মাজারেরপাড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। দুপুরে বাড়ির পাশে খেলতে গিয়ে বৃষ্টির পানিতে ভরা একটি গর্তে পড়ে যায় পাঁচ বছরের কাইফ। তাকে বাঁচাতে পানিতে ঝাঁপ দেয় ১৫ বছর বয়সী বোন রুশা মণি। কিন্তু সাঁতার না জানায় দুজনেই তলিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তিনটি কারণে শিশুদের জন্য তৈরি হয় ‘নীরব মৃত্যুফাঁদ’।
২০২৪ সালে শেষ করা ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন দেশে ৫১ জনের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে পানিতে ডুবে। এর ৭৫ শতাংশের বেশি শিশু। প্রতিবছর ঈদ বা দীর্ঘ ছুটির সময় এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কারণ এ সময় অনেক পরিবার শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যায়। শিশুরা নতুন পরিবেশে খেলাধুলা করে, আশপাশে থাকে পুকুর, ডোবা, খাল কিংবা বৃষ্টির পানিতে ভরা গর্ত। পরিবারের বড়রা আত্মীয়স্বজন ও উৎসবের ব্যস্ততায় থাকায় অনেক সময় শিশুরা চোখের আড়ালে চলে যায়। আর কয়েক মিনিটের সেই অসতর্কতাই ডেকে আনে বিপদ।
যে তিন কারণে শিশুর ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে সেগুলো জেনে রাখা ভালো।
শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটে বাড়ির আশপাশে। গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশু বাড়ি থেকে ২০ মিটারের মধ্যেই কোনো না কোনো জলাশয়ে পড়ে যায়। সাধারণত দুপুর থেকে বিকেলের মধ্যে এসব দুর্ঘটনা বেশি ঘটে, যখন পরিবারের সদস্যরা কাজ বা বিশ্রামে ব্যস্ত থাকেন। ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে। কারণ, শিশুরা স্কুলে যায় না, সারা দিন বাড়ির বাইরে খেলাধুলা করে। অনেক পরিবার শহর থেকে গ্রামে যায়, যেখানে ঘরের পাশেই থাকে পুকুর বা ডোবা।
নতুন জায়গা শিশুদের জন্য আনন্দের হলেও সেটিই কখনো ঝুঁকির কারণ হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুরা অচেনা পরিবেশে কৌতূহলী হয়ে ওঠে। তারা দৌড়ে বেড়ায়, নতুন কিছু দেখতে চায়। কিন্তু কোথায় গভীর পানি, কোথায় পিচ্ছিল ঘাট, কোথায় ডোবা—এসব সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকে না। বিশেষ করে শহরের শিশুরা গ্রামে গিয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। কারণ, শহুরে পরিবেশে খোলা পুকুর বা খালের সঙ্গে তাদের পরিচয় কম। গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তারা খেলতে খেলতে পানির খুব কাছে চলে যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২০’ অনুযায়ী, ৫ বছরের কম বয়সী ৪৪ শতাংশ শিশুর মৃত্যুর কারণ নিউমোনিয়া। এরপরই পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্থান। এটি প্রায় ৯ শতাংশ।
শিশুদের ডুবে মৃত্যু নিয়ে বুধবার ফোনে কথা হয় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনের সঙ্গে। এ মন্ত্রণালয়ের অধীন শিশু একাডেমি ডুবে মৃত্যুরোধে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তা নিয়েই কথা হচ্ছিল। তিনি তখন নিজের নির্বাচনী এলাকা দিনাজপুরে ছিলেন। ডুবে মৃত্যু নিয়ে কথা বলার সময় মন্ত্রী জানালেন, তাঁর এলাকাতেই ওই দিনই একটি শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। এলাকার একটি ডোবায় হঠাৎ ভারী বৃষ্টিতে পানি জমেছিল। শিশুটি সেই অগভীর ডোবায় ডুবে মারা যায়। বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে উঠান, রাস্তা, নির্মাণাধীন জায়গা কিংবা ফসলের জমিতে পানি জমছে। এই অস্থায়ী জলাশয়ও শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
ঈদের ছুটি সময় এবার দেশের বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি শিশুদের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা জানান মো. আল-আমিন ভূঁইয়া। তিনি ডুবে মৃত্যু নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) গবেষক। তিনি বলেন, এই উৎসবের সময় অভিভাবক বা বড়রাও উৎসবের মেজাজে থাকেন। কিন্তু অচেনা পরিবেশ এবং বৃষ্টির ফলে আটকে থাকা পানি শিশুদের বিপদ বয়ে আনতে পারে। ফি বছর এমন ঘটনা ঘটছে। এবারের বৃষ্টি ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। সিআইপিআরবির গবেষণা অনুযায়ী, ঈদ বা বড় ছুটির সময় দেশে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কম করে হলেও তিন গুণ বেশি থাকে।
পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুকে কখনো একা বাইরে খেলতে না দেওয়া, নতুন জায়গায় গেলে আগে আশপাশের জলাশয় চিহ্নিত করা বা পুকুর বা ডোবার পাশে অস্থায়ী বেড়া দেওয়ার মতো ব্যবস্থা দরকার। ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরামের গবেষণা অনুযায়ী, দেশে ডুবে মৃত্যুর ৩৫ শতাংশই ঘটে দুই ঈদ বা ছুটির সময়।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসচিব গওহার নঈম ওয়ারা মনে করেন, ছুটির সময়ে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর প্রধান কারণ অভিভাবকদের অসচেতনতা। এভাবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে তার উপযুক্ত অনুসন্ধান ও মামলা হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
দুর্যোগবিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা অভিভাবকদের আরও কিছু অসচেতনতার দিক তুলে ধরেন। যেমন অনেক শিশুর মৃগীরোগ থাকে। পানি বা আগুনের সামনে গেলে বা উঁচুতে উঠলে এমন রোগ বেড়ে যেতে পারে। অনেক সময় ছুটিতে এ রোগের ওষুধ নিয়ে যান না অভিভাবক। এর একটি কারণ শিশুর এ রোগ সম্পর্কে কেউ জানুক তা অভিভাবকেরা চান না। কিন্তু অভিভাবকদের এই অন্যায্য আচরণ শেষ পর্যন্ত অনেক শিশুর মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে, বলেন তিনি।