
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলায় পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসানকে (তাইম) হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। এই মামলায় আজ রোববার ওপেনিং স্টেটমেন্ট বা সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়। মূলত সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালের কোনো মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।
সূচনা বক্তব্যে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, এটি কেবল একজনকে হত্যা করার বিচার নয়; এটি এমন এক অপরাধের বিচার, যা ছিল সুপরিকল্পিত, সংগঠিত এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত একটি অপরাধ; যা মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছে।
সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের পর গতকাল এ মামলায় পরে একজন সাক্ষীর জবানবন্দিও নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এ এই মামলার বিচার চলছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এই মামলায় মোট ১১ জন আসামি। এর মধ্যে ৯ জন পলাতক। তাঁরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন, ডেমরা অঞ্চলের সাবেক উপকমিশনার মো.মাসুদুর রহমান, ওয়ারী অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার এস এম শামীম, সাবেক সহকারী কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো.জাকির হোসাইন, সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো.ওহিদুল হক ও সাবেক উপপরিদর্শক সাজ্জাদ উজ জামান।
কারাগারে আছেন দুই আসামি, তাঁরা হলেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হাসান ও সাবেক এসআই মো. শাহদাত আলী। গতকাল তাঁদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে তাইম। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা পদচারী-সেতুর কাছে গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁকে। তাইম নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজী নগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়তেন।
এই মামলায় গতকাল প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন মো. রাহাত হোসাইন। তাইম গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
জবানবন্দিতে রাহাত বলেন, ‘২০২৪ সালের ২০ জুলাই দুপুরে তাইমসহ তাঁরা তিনজন কাজলা ফুটওভার ব্রিজের (পদচারী-সেতু) নিচে অন্য আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছিলেন। ওই সময় মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার ও যাত্রাবাড়ী থানার দিক থেকে শত শত পুলিশ সদস্য বৃষ্টির মতো গুলি করতে করতে কাজলা ফুটওভার ব্রিজ হয়ে শনির আখড়ার দিকে যাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে তাঁরা ফুটওভার ব্রিজের পাশে চায়ের দোকানে আশ্রয় নেন। এর কিছুক্ষণ পর ২৫ থেকে ৩০ জন পুলিশ সদস্য সেই চায়ের দোকানের সামনে আসে। তখন কিছু পুলিশ সদস্য উচ্চ স্বরে বলছিল “সবাইকে ক্রসফায়ার করে দে”।’
রাহাত জবানবন্দিতে বলেন, ‘ওই সময় পুলিশ সদস্যরা চায়ের দোকানের শাটার খুলে তাঁদের টেনেহিঁচড়ে বের করে। চার থেকে পাঁচজন পুলিশ সদস্য মিলে তাঁকে পেটায়। একইভাবে তাইমকেও কিছু পুলিশ সদস্য পেটায়। হঠাৎ একজন পুলিশ সদস্য গালি দিয়ে তাঁদের দৌড় দিতে বলে। ঠিক তখনই তাইম দৌড় দেয়। এরপর একজন পুলিশ সদস্য (টি-শার্ট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট পরিহিত) পেছন থেকে তাইমকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি করে। শরীরে গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গে তাইম মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।’
জবানবন্দিতে রাহাত বলেন, ‘মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর তিনি দৌড়ে গিয়ে তাইমকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তখন পুলিশের আরেক সদস্য (টি-শার্ট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট পরিহিত) তাঁদের দিকে লক্ষ্য করে বারবার গুলি করতে থাকে। একটি গুলি তাঁর ডান পায়ের পাতায় বিদ্ধ হয়। গুলির মধ্যে বন্ধুকে বাঁচাতে না পেরে তাঁকে রেখে তিনি দৌড় দেন। তখন পুলিশ তাঁকে লক্ষ্য করে আবার গুলি করতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি রাস্তায় পড়ে যান। তখন দুজন আন্দোলনকারী এসে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে ২৫ জুলাই তাইমের বড় ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলতে জানতে পারেন, তাইম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন।’