
ক্যানসারে রোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাই কারও ক্যানসার ধরা পড়লে তাঁর পাশে দাঁড়াতে হবে। রোগী যত আশাবাদী ও সচেতন হবেন, রোগ নিরাময়ের হার তত বাড়বে।
‘বিশ্বমানের ক্যানসার-চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনায় কথাগুলো বলেন জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক এবং মহাখালী জেনারেল হাসপাতালের টিউমার ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন নাসিহা তাহসিন। ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে এসকেএফ অনকোলজি।
এখনো ক্যানসার নিয়ে রয়েছে নানা ভ্রান্ত ধারণা ও সচেতনতার অভাব। তাই ইউনিয়ন ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্যানসার কন্ট্রোলের (ইউআইসিসি) উদ্যোগে প্রতিবছর ৪ ফেব্রুয়ারি ‘বিশ্ব ক্যানসার দিবস’ পালন করা হয়।
আলোচনার এ পর্বে ক্যানসার নিয়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক পরামর্শ দেন অধ্যাপক ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা। পর্বটি বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সরাসরি প্রচারিত হয় প্রথম আলো ডটকম এবং প্রথম আলো, এসকেএফ অনকোলজি ও এসকেএফের ফেসবুক পেজে।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থাপক জানতে চান, এ বছরের বিশ্ব ক্যানসার দিবসের প্রতিপাদ্যটি আসলে কী বার্তা দিচ্ছে?
ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা বলেন, সচরাচর কেউ ক্যানসারে আক্রান্ত হলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং একাকীত্ব বোধ করেন। তাই এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য রাখা হয়েছে ‘অনন্যতায় ঐক্য’। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মানসিকভাবে সহায়তা করা। আগে মনে করা হতো ক্যানসার মানেই জীবনের ইতি। কিন্তু এখন ক্যানসারের জন্য অনেক আধুনিক চিকিৎসা রয়েছে। ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া মানেই জীবনের শেষ নয়।
ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা আরও বলেন, ‘৫০ শতাংশ ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। কেউ ক্যানসারে আক্রান্ত হলে আমাদেরকে সাহস দিতে হবে, তাঁদের সহযোগিতা করতে হবে। এমনকি যাঁরা সুস্থ হয়ে উঠেছেন, প্রয়োজনে তাঁদের সম্মিলনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। যাতে তাঁরা হতাশ হয়ে না পড়েন, কারণ, মানুষ যত আশাবাদী হন, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তত বাড়তে থাকে।’
এরপর উপস্থাপক জানতে চান, ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত সবচেয়ে ভুল ধারণা কোনটি?
উত্তরে ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা বলেন, ক্যানসার হলে মৃত্যু অবধারিত, এটাই ভুল ধারণা। যক্ষ্মা নিয়েও আগে এ রকম একটি ধারণা প্রচলিত ছিল, কিন্তু এই ধারণা মোটেও ঠিক নয়।
ডা. গোলাম মোস্তফা আরও বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার ধরা পড়লে নিরাময়ের হার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। যেমন মেয়েদের জরায়ুমুখে অ্যাডিনোকার্সিনোমা নামের একটি ক্যানসার দেখা দেয়। এটি দ্বিতীয়, তৃতীয় এমনকি চতুর্থ স্টেজে পৌঁছালেও নিরাময় সম্ভব। এ ছাড়া ব্রেইন, স্বরনালিসহ বিভিন্ন অঙ্গে ক্যানসার দেখা দিতে পারে। সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এগুলো নিরাময় সম্ভব। তাই মানুষকে সচেতন করতে হবে এবং তাঁদের সঠিক তথ্য দিতে হবে।
ক্যানসার কি শুধু বয়স্কদের রোগ, নাকি তরুণেরাও এতে আক্রান্ত হতে পারেন? উপস্থাপকের এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘ক্যানসার মোটেও শুধু বয়স্কদের রোগ নয়। শিশুদেরও ক্যানসার হতে পারে। শিশুদের সাধারণত পাঁচ ধরনের ক্যানসার বেশি দেখা দেয়। যেমন চোখ, কিডনি, লিভার, নার্ভ এবং ব্লাড ক্যানসার। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের চেয়ে শিশুদেরই ব্লাড ক্যানসার বেশি হয়ে থাকে। তবে শিশুদের যে ক্যানসারগুলো হয়, এগুলোর জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিলে নিরাময় হার অনেক বেশি।
প্রসঙ্গক্রমে উপস্থাপক জানতে চান, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পরিবর্তন কী ক্যানসার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে?
উত্তরে ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমরা প্রকৃতির অংশ। তাই আমাদের চারপাশের পরিবেশ যত ভালো হবে, আমাদের সুস্থ থাকার হার বাড়বে। আমাদের বাতাসে কার্বনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। এটি আমাদের স্বাস্থ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তুলা, কটন, তামাক কিংবা জুটের কারখানায় যাঁরা কাজ করেন, তাঁদেরও ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে। অনেক বেশি এক্স-রে কিংবা গামা-রে’র সংস্পর্শে এলেও ক্যানসার দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া যাঁরা সরাসরি সূর্যের আলোতে কাজ করেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে।’
এ প্রসঙ্গে ডা. গোলাম মোস্তফা আরও বলেন, ‘খ্যাদাভ্যাস ক্যানসারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। আমরা যেসব খাবার খাই, এগুলো অনেক প্রভাব ফেলে। যেমন দেশের বাইরে থেকে আমাদের দেশে যে ফলগুলো আসে, এগুলোতে ফরমালিন থাকে। ফরমালিন ও আর্সেনিকযুক্ত খাবার খেলে যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাঁদের ক্যানসার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ ছাড়া যাঁরা ওভার-কুকড কিংবা মাংস ও তেল-চর্বিজাতীয় খাবার বেশি খেয়ে থাকেন, তাঁদেরও ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই খাদ্যতালিকায় সব সময় শাকসবজি জাতীয় খাবার রাখতে হবে।’
আলোচনার শেষ পর্যায়ে ডা. গোলাম মোস্তফা জানান, এখন পর্যন্ত তাঁর দেখা ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই সুস্থ জীবন যাপন করছেন। তবে যাঁরা একেবারেই শেষ ধাপের দিকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন, তাঁদের একেবারেই নিরাময় করা সম্ভব হয়নি।
তাই ক্যানসার হলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি এবং হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে বলেন, ‘মনে আশা যত বেশি থাকবে, ক্যানসার থেকে সুস্থ হওয়ার হার তত বেশি।’