
‘বিয়ের সময় বলছিল, আমার মেয়েরে অন্তর দিয়া মহব্বত করব। এই কারণে বিয়ে করলাম। এখন আমার মেয়েটারে অ্যাসিড মাইরা পোড়ায় দিল। আমার সঙ্গে ঝগড়া, মেয়েরে ক্যান পোড়াইল?’ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই প্রতিবেদককে এমন অনুযোগ করছিলেন মোরশেদা আক্তার (২৫)। এই হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে দগ্ধ সন্তানের চিকিৎসায় ৯ দিন ধরে অবস্থান করছেন তিনি।
মোরশেদার অভিযোগ, দ্বিতীয় স্বামী খোকন মিয়া ২৩ জুন তাঁর শিশুসন্তান মারিয়া আক্তারকে (৮) অ্যাসিডে পুড়িয়ে দিয়েছেন। তবে খোকন মিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মোরশেদার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার গোপালদী পৌরসভায়। স্বামীর বাড়ি গোপালদীর গায়েনপাড়ায়। মোরশেদার মায়ের বাড়িতে শিশুটির দগ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে।
নতুন প্রজন্মকে অ্যাসিড সহিংসতা নিয়ে সচেতন করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বড় ধরনের প্রচারাভিযান দেশব্যাপী শুরু করা উচিত।জাহাঙ্গীর হোসেন, নির্বাহী পরিচালক, এএসএফ
গতকাল রোববার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, মারিয়া শুয়ে আছে। মুখের বাঁ পাশ দগ্ধ। তাকে ঘিরে বসে আছেন মা মোরশেদা, খালা হাসিনা বেগম ও নানি সাহেদা বেগম।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মো. আশিকুর রহমান হাসপাতালে প্রথম আলোকে বলেন, দগ্ধের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, এটা অ্যাসিডে পোড়া। শিশুটির মুখের বাঁ পাশ থেকে বড় অংশ পুড়ে গেছে। চোখের ভেতর কর্নিয়া অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে। এ ছাড়া হাত, পা ও ডান হাঁটু দগ্ধ হয়েছে।
মারিয়ার মা মোরশেদা প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম স্বামী ফরিদ মিয়া তাঁর ও মেয়ের কোনো ভরণপোষণ দিতেন না। তাঁকে তালাক দিয়ে অন্যত্র বিয়ে করেন। তিনি বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে মা-মেয়ের খরচ চালাতেন। পাঁচ মাস আগে কাছাকাছি এলাকার রাজমিস্ত্রি খোকন মিয়াকে (৫৫) নিজের পছন্দে বিয়ে করেন। খোকন মিয়ার আগের স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনি আছে।
মোরশেদা বলেন, মেয়ে মারিয়াকে তাঁর সঙ্গে থাকতে দেবেন, এমন শর্তেই তিনি খোকন মিয়াকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলেন। প্রথম দু-এক মাস তাঁর মেয়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছেন খোকন। পরে আর মেয়েকে সহ্য করতে পারতেন না। খোকন বলতেন, মারিয়াকে যেন তিনি মায়ের কাছে রেখে আসেন। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া হতো। এমন ঝগড়ার মধ্যে মাস দুয়েক আগে তিনি মেয়েকে নিয়ে মায়ের বাড়িতে চলে যান। গত ২৩ জুন তাঁর মায়ের বাড়িতে খোকন আসেন এবং অনেকক্ষণ অবস্থান করেন। রাত আটটার দিকে তাঁর মেয়ের দিকে খোকন সিরিঞ্জ দিয়ে অ্যাসিড ছুড়ে মারেন।
জানতে চাইলে খোকন মিয়া মুঠোফোনে বলেন, ‘এসব অভিযোগ সত্য নয়। আমি অ্যাসিড কোথায় পাব? আমি কি অ্যাসিড নিয়ে ঘুরি? আমাদের ঝগড়ার সময়ে মোরশেদা আমার গায়ে হাত তুললে আমি সামনে থাকা ভাতের গরম মাড়ের বালতিতে লাথি মারি। সেই মাড় মারিয়ার গায়ে লেগে পুড়ে গেছে।’ এদিকে ভাতের মাড় হলে কাপড়সহ পুড়ে গেল কেন, সেই প্রশ্ন করেছেন মোরশেদা।
গোপালদী তদন্তকেন্দ্রের ওসি ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, মারিয়া নামের এক শিশু অ্যাসিডে দগ্ধ হয়েছে বলে শিশুটির নানি সাহেদা বেগমের লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। তবে অভিযোগটি ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় তারা (পুলিশ) অভিযোগকারীকে থানায় এসে কথা বলতে বলেছেন। তিনি বলেন, শিশুটির পরিবার এখন ঢাকায়। শিশুর নানি ঢাকা থেকে এলাকায় ফিরে এলে মামলা নেওয়া হবে।
অ্যাসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশনের (এএসএফ) নির্বাহী পরিচালক সরদার জাহাঙ্গীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, যেকোনো প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে শিশুদের এমন সহজ লক্ষ্যে পরিণত করা হচ্ছে। শিশু মারিয়াকে তিনি হাসপাতালে গিয়ে দেখেছেন এবং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চিকিৎসার জন্য কিছু অর্থসহায়তা দিয়ে এসেছেন।
অ্যাসিড-সহিংসতা কমে আসায় এ ধরনের অপরাধে নজরদারি কমে এসেছে। নতুন প্রজন্মকে অ্যাসিড সহিংসতা নিয়ে সচেতন করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বড় ধরনের প্রচারাভিযান দেশব্যাপী শুরু করা উচিত।