
চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রে বাঙালি মুসলমানের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও জাতীয় জীবনের একটি মৌলিক সমস্যাকে তুলে ধরা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন লেখক অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেছেন, তারেক মাসুদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জাতীয় সমস্যাকে দেখার চেষ্টা ছিল তাঁর শিল্পীসত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিশেষ করে ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রে বাঙালি কতটা বাঙালি এবং কতটা মুসলিম ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী—এই দ্বন্দ্বকে তিনি চলচ্চিত্রটির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে দেখেছেন।
বাংলাদেশ শর্টফিল্ম ফোরাম আয়োজিত ‘তারেক মাসুদের সাধনা’ শীর্ষক বক্তৃতায় এ কথা বলেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। বাংলাদেশ শর্টফিল্ম ফোরামের ৪০ বছর পূর্তি উদ্যাপন ঘিরে বছরব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এই বক্তৃতা হয়। সোমবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ শর্টফিল্ম ফোরাম মিলনায়তনে এই আয়োজন করে সংগঠনটি। অনুষ্ঠানে তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র নিয়ে চার দিনব্যাপী বিশেষ প্রদর্শনীরও সূচনা হয়। প্রথম দিন সোমবার প্রদর্শিত হয় ‘নরসুন্দর’ ও ‘ইউনিসন’। ২৬ আগস্ট ‘মাটির ময়না’, ২৭ আগস্ট ‘অন্তর্যাত্রা’ এবং ২৮ আগস্ট ‘রানওয়ে’ প্রদর্শিত হবে। প্রতিদিন সন্ধ্যা ছয়টায় প্রদর্শনী শুরু হবে।
সলিমুল্লাহ খান বলেন, তারেকের (মাসুদ) চলচ্চিত্রের বড় শক্তি ছিল নিজের বিশ্বাস ও অবস্থানের প্রতি তাঁর দৃঢ়তা। ‘আদম সুরত’ নামটি নিয়েও সে সময় চলচ্চিত্র আন্দোলনের অনেকের আপত্তি ছিল। কিন্তু তারেক নামটি পরিবর্তন করেননি। ‘আদম সুরত’-এর মাধ্যমে শিল্পী সুলতানের ব্যক্তিজীবনের চেয়ে বৃহত্তর অর্থে বাংলার কৃষক ও মানুষের অন্তর্গত শক্তিকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ‘আদম সুরত’-এর ইংরেজি নাম ‘দ্য ইনার স্ট্রেংথ’ এবং ‘অন্তর্যাত্রা’র নামের মধ্যেও ‘অন্তর’-এর ধারণার উপস্থিতি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গ তুলে সলিমুল্লাহ খান বলেন, বাঙালি মুসলমানের পরিচয়ের ভেতরের দ্বন্দ্বই চলচ্চিত্রটির অন্যতম প্রধান বিষয়। বাঙালি সংস্কৃতি ও মুসলিম ঐতিহ্যের টানাপোড়েন তারেক নিজের বাল্যজীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর চলচ্চিত্র শিল্পের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তারেক মাসুদকে কেবল চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে নয়, একজন শিল্পী হিসেবে দেখার ওপরও গুরুত্ব দেন সলিমুল্লাহ খান। তাঁর মতে, তারেক প্রতিবছর একটি করে ছবি বানানোর তাড়নায় ছিলেন না; নিজের ভাবনা ও শিল্পীসত্তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কাজ করার জন্য সময় নিতেন। ‘আদম সুরত’ নির্মাণে তাঁর সাত বছর লেগেছিল। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি শিল্পী হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন।
তারেক মাসুদের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক কাজের কথা তুলে ধরে সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘নরসুন্দর’, ‘মুক্তির গান’ ও ‘মাটির ময়না’সহ তাঁর বিভিন্ন কাজে মুক্তিযুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। নিউইয়র্কে ‘মুক্তির গান’-এর সম্পাদনার শুরুর দিকে তিনি নিজেও কিছুটা সহযোগিতা করেছিলেন বলে জানান। তারেকের চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত দিক সম্পর্কেও ভালো জ্ঞান ছিল।
সলিমুল্লাহ খান বলেন, তারেক মাসুদ অল্প বয়সে মারা যাওয়ায় তাঁর সৃষ্টিশীলতার আরও বিকাশের সুযোগ হয়নি। বয়স বাড়ার সঙ্গে একজন চলচ্চিত্রকারের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি আরও সমৃদ্ধ হয়। তাই আরও দীর্ঘ জীবন পেলে তারেকের চলচ্চিত্রচর্চা কোথায় গিয়ে পৌঁছাত, তা ভাবার সুযোগ রয়েছে। তবে তাঁর বিদ্যমান কাজ ও লেখাগুলোই তাঁকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তারেক মাসুদের লেখা ‘চলচ্চিত্রের যাত্রা’ বইয়ের প্রসঙ্গ তুলে সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘যাত্রা’ শব্দটি তারেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর চলচ্চিত্র ‘অন্তর্যাত্রা’র নামেও সেই ভাবনার প্রতিফলন রয়েছে। তারেকের লেখায় কবিত্ব ও সাহিত্যপ্রতিভার পরিচয়ও পাওয়া যায়, যদিও তিনি অনেক সময় নিজের সেই প্রতিভা আড়াল করার চেষ্টা করেছেন।
বক্তব্যে তারেক মাসুদের সমালোচনাও করেন সলিমুল্লাহ খান। শিল্পী এস এম সুলতানকে নিয়ে ‘আদম সুরত’ নির্মাণের ইতিহাস বর্ণনায় কিছুটা ঐতিহাসিক ভারসাম্যের ঘাটতি দেখেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, তারেকের বর্ণনায় আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের পরামর্শের কথা এলেও শিল্পী সুলতানকে নিয়ে আহমদ ছফার দীর্ঘদিনের কাজের যথেষ্ট উল্লেখ নেই। সুলতান সম্পর্কে আহমদ ছফার লেখা তারেকের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল দাবি করে সলিমুল্লাহ খান বলেন, এ বিষয়টি বাদ পড়া একধরনের ‘ঐতিহাসিক ভারসাম্যহীনতা’ তৈরি করেছে।
অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদের ছোট ভাই নাহিদ মাসুদ বলেন, তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা ছিল। অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের ‘নরসুন্দর’ চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তারেক মাসুদ অনেক কাজ করেছেন, তবে ‘নরসুন্দর’ সেই ইতিহাসকে দেখার ক্ষেত্রে একটি ভিন্ন জায়গা তৈরি করে। তাঁর চলচ্চিত্র ও কাজের মধ্য দিয়ে যে চিন্তা ও ‘স্পিরিট’ তৈরি হয়েছে, তা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন বলেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের কঠিন সময়ে তারেক মাসুদদের মতো মানুষেরাই এই আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং তাঁদের প্রভাবেই তা এখনো এগিয়ে চলছে। তারেক মাসুদের উত্তরাধিকার ধরে রেখে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নেওয়া এবং চলচ্চিত্রের দর্শক বাড়ানোর দায়িত্ব এখন নতুন প্রজন্মের।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শর্টফিল্ম ফোরামের সভাপতি জহিরুল ইসলাম, প্রথম আলোর উপসম্পাদক এ কে এম জাকারিয়া, চলচ্চিত্র নির্মাতা এন রাশেদ চৌধুরী, মুহাম্মদ কাইয়ুম, আকরাম খান, তারেক বুলবুল।