
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও আদাবর থানার পৃথক দুটি হত্যা মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের জামিন বহাল রয়েছে। হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনে ‘নো অর্ডার’ দিয়েছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক আজ বুধবার এ আদেশ দেন।
ওই দুই মামলাসহ পৃথক সাত মামলায় সাবেক এই প্রধান বিচারপতির জামিন বহাল রয়েছে। তবে অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন ঘিরে আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় আপাতত খায়রুল হক কারামুক্তি পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবীরা।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর তথ্যমতে, প্রথমে পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও আদাবর থানার পৃথক ওই দুটি হত্যা মামলায় গত ৩০ মার্চ খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
ওই দুই মামলায় ১২ মে হাইকোর্ট রুল দিয়ে খায়রুল হককে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। এই জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক আবেদন করে। আবেদন দুটি আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের আজকের কার্যতালিকায় ৫ ও ৬ নম্বর ক্রমিকে ওঠে। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দা সাজিয়া শারমিন। খায়রুল হকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু ও মোস্তাফিজুর রহমান খান এবং আইনজীবী জাহাঙ্গীর হোসেন।
ওই দুই মামলায় ১২ মে জামিনের পর খায়রুল হকের কারামুক্তির পথ খুলেছিল বলে জানান খায়রুল হকের অন্যতম আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহীন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০২৪ সালের যাত্রাবাড়ী থানার আরেকটি হত্যা মামলা, যেটির এজাহারে খায়রুল হকের নাম নেই, সে মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখাতে ১৬ মে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ। এর আগে খায়রুল হকের পরিবারের পক্ষ থেকে এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ মে হাইকোর্ট সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া খায়রুল হককে গ্রেপ্তার না দেখাতে ও হয়রানি না করতে নির্দেশ দেন। তবে ১৭ মে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত খায়রুল হককে আদালতে হাজির করতে ও শুনানির জন্য ২৩ মে দিন রাখেন। হাইকোর্টের আদেশ (সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া গ্রেপ্তার না দেখাতে) যুক্ত করে হাজিরা পরোয়ানা বাতিল চেয়ে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আজ আবেদন করা হয়েছে। উভয় আবেদনের ওপর ২৩ মে শুনানির দিন রয়েছে। যে কারণে আপাতত খায়রুল হক কারামুক্তি পাচ্ছেন না।’
খায়রুল হক ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা–সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন।
বিচারপতি খায়রুল হককে গত বছরের ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাঁকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদলের কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর পর থেকে তিনি কারাগারে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার–সংক্রান্ত রায় জালিয়াতির অভিযোগে খায়রুল হকের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৭ আগস্ট শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন। একই অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় গত বছরের ২৫ আগস্ট আরেকটি মামলা করেন নুরুল ইসলাম মোল্লা নামের এক ব্যক্তি। এ ছাড়া বিধিবহির্ভূতভাবে প্লট গ্রহণের অভিযোগে গত বছরের আগস্টে খায়রুল হকের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদলের কর্মী হত্যা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা–সংক্রান্ত রায় জালিয়াতির অভিযোগে করা পৃথক চার মামলায় হাইকোর্ট ৮ মার্চ খায়রুল হককে জামিন দেন। দুদকের করা অপর মামলায় হাইকোর্ট থেকে ১১ মার্চ জামিন পান তিনি।
হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক আবেদন করে। আবেদনগুলো গত ৮ এপ্রিল আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের কার্যতালিকায় ওঠে। সেদিন আদালত আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য নির্ধারণ করেন।
এর ধারাবাহিকতায় শুনানি নিয়ে আপিল বিভাগ ২৮ এপ্রিল রাষ্ট্রপক্ষের করা পৃথক লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) ও আবেদন খারিজ করে দেন। ফলে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদলের কর্মী হত্যাসহ পৃথক পাঁচ মামলায় খায়রুল হকের জামিন বহাল থাকে।
তবে ওই পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর যাত্রাবাড়ী ও আদাবর থানার পৃথক দুটি হত্যা মামলায় ৩০ মার্চ খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই দুই মামলায় ১২ মে হাইকোর্ট থেকে তিনি জামিন পান। এই জামিন চেম্বার আদালত আজ বহাল রেখেছেন। এর মধ্য দিয়ে সাত মামলায় খায়রুল হকের জামিন বহাল রয়েছে।