ঢাকা-কলম্বো-কাঠমান্ডু—সর্বত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত ক্ষণ ছিল সহিংস। তিন দেশেই গণ–আন্দোলন রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীকে জটিল পরিস্থিতির মুখে ফেলে
বাংলাদেশ ২০২৪-এ যাকে ‘গণ-অভ্যুত্থান’ বলছিল, শ্রীলঙ্কায় সিংহলিদের কাছে দুই বছর আগে সেটা ছিল ‘আরাগালায়া’। তামিলদের কাছে ‘পহরাত্তম’। নির্বাচিত সরকারকে তাড়াতে গিয়ে নেপালিরা এক বছর পর সেটাকে বলছিল ‘জেন-জি অভ্যুত্থান’। কলম্বোতে শুরু হওয়া এই সুনামি ঢাকা-কাঠমান্ডু হয়ে তেলাপোকার রূপ ধরে তরঙ্গ তুলেছে সর্বশেষ বিশাল ভারতেও।
পটভূমিতে কিছু ভিন্নতা থাকলেও প্রায় একই ধাঁচে চার সংগ্রামের শুরু এবং প্রাথমিক রাজনৈতিক লক্ষ্যে পৌঁছে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ-তরুণীরা বিশ্ববাসীর মনোযোগ কাড়ছে পুনঃপুন। আন্তর্জাতিক মহল এখন তাকিয়ে নেপাল-শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানোত্তর পরিস্থিতির দিকে এবং নিশ্চিতভাবে ভারতীয় ‘ককরোচ’দের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেও।
নয়াদিল্লি থেকে জুলাইয়ের বার্তাটি বেশ স্পষ্ট: দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অতৃপ্ত তারুণ্যের রাজনৈতিক বাসনার অনেকখানি দেখা এখনো বাকি।
২০২২-এর মার্চে শ্রীলঙ্কায় আরাগালায়ার তাৎক্ষণিক কারণ ছিল অর্থনৈতিক দুর্দশা, বিশেষ করে জ্বালানিসংকট। বাংলাদেশে অসন্তোষ উসকে দেয় রাষ্ট্রীয় নিয়োগে অন্যায্য কোটা। নেপালে শাসকদের দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ তছরুপ এবং ভারতে যুবকদের নিয়ে প্রধান বিচারপতির কটু মন্তব্য।
বাংলাদেশে যেমন ২০২৪-এর জুনের মাঝামাঝি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি দলের সমর্থকদের হামলা আন্দোলন ছড়ানো উসকে দেয়, নেপালে সেটা ঘটে ২০২৫-এর ৪ সেপ্টেম্বর ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব নিষিদ্ধ করায়।
শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ-নেপালের মধ্যে সংগ্রাম সফল হতে বেশি সময় লাগে প্রথম দেশে। দ্রুততম ছিল নেপালের অধ্যায়। সব দেশে প্রতিপক্ষের পরিণতি ছিল কাছাকাছি।
চার দেশেই শাসকদের প্রতি আরও অনেক অসন্তুষ্টি ছিল। আরাগালায়ার মাঝেই সিংহলি ও তামিল তরুণদের কাছে হঠাৎ জনপ্রিয়তা পায় ‘সিস্টেম চেঞ্জ’ শব্দ দুটি—যেভাবে বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’।
শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ-নেপালের মধ্যে সংগ্রাম সফল হতে বেশি সময় লাগে প্রথম দেশে। দ্রুততম ছিল নেপালের অধ্যায়। সব দেশে প্রতিপক্ষের পরিণতি ছিল কাছাকাছি। তিন দেশে সর্বোচ্চ নির্বাহী পদচ্যুত হয়। লঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে মালদ্বীপের পথে রওনা দেন ২০২২-এর ১৪ জুলাই। তার আগে মে মাসে তাঁর ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষেও বিদায় নেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালান ২০২৪-এর ৫ আগস্ট। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি ২০২৫-এর ৯ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করে ৫০০ মাইল দূরের এক সামরিক গ্যারিসনে আশ্রয় নেন। চলতি বছরের ২৮ মার্চ তিনি গ্রেপ্তারও হন। তবে এপ্রিলে ছাড়া পান। তাঁর বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানকালীন হত্যা মামলার তদন্ত চলছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও অনেক মামলা। সর্বশেষ ভারতীয় ‘ককরোচ’দের হাতে আরএসএস-বিজেপি পরিবার হারাল ‘প্রথম উইকেট’। মনোযোগ পাওয়ার মতো বিষয়, বিরোধী শিবিরে ভয় কাটিয়ে দিয়েছে নয়াদিল্লির চলতি জুলাই।
অনেকের হয়তো মনে আছে, গোতাবায়া কিছুকাল পরে দেশে ফিরেছিলেন। এখন তাঁর বিদেশ যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা আছে। রাজনীতি থেকেও দূরে আছেন তিনি। অন্য দুই দেশের পদচ্যুত দুজন এখনো নিজ নিজ দলীয় অবস্থান ছাড়েননি। তবে শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পারেননি।
বাংলাদেশ-নেপাল-লঙ্কার গণ-আন্দোলনের পূর্বাপর খবরে বারবার হাসিনা, অলি ও গোতাবায়ার নাম এলেও তিন জায়গাতেই শাসক-পরিবারগুলোও ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু ছিল। লঙ্কায় রাজাপক্ষে পরিবার, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নিকটজনেরা এবং নেপালে অলি ও অন্য সাবেক শাসকদের পারিবারিক জীবনধারা আন্দোলনকারীদের অসন্তোষের বড় উপলক্ষ ছিল। নেপালে জেন-জিরা এ রকম প্রতিপক্ষকে বলত ‘নেপো-কিড’, অর্থাৎ ‘প্রভাবশালীদের বাচ্চা’রা। সামাজিক মাধ্যমে নেপো-কিডদের ভোগবিলাস আর ক্ষমতার অপব্যবহারের খবরে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত মানুষেরা বিরক্ত ছিল; যা ছিল আসলে সমাজের উৎকট ধনবৈষম্যজনিত ক্ষোভ।
ধনবৈষম্য, আয়বৈষম্য, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতি তিন দেশে প্রবাসীদেরও আন্দোলনে শামিল করে। প্রতিটি দেশ বিপুলভাবে প্রবাসী আয়নির্ভর হওয়ায় তাদের সাড়া আন্দোলনকারীদের কৌশলগত সুবিধা দেয়।
ভারতের তরুণ-তরুণীদের জুলাই-জাগরণও বহির্বিশ্বে প্রবাসীদের মধ্যে ঢেউ তোলার মুখে নরেন্দ্র মোদি শিক্ষামন্ত্রীকে বলি দিয়ে পরিস্থিতি থামালেও বিজেপি শিবিরে এই প্রথম অজানা আতঙ্ক ভর করেছে।
ঢাকা-কলম্বো-কাঠমান্ডু—সর্বত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত ক্ষণ ছিল সহিংস। ক্ষমতার ভরকেন্দ্র হিসেবে প্রধান নির্বাহীর বাসস্থান বা দপ্তর দখলকে চূড়ান্ত শক্তি-পরীক্ষা হিসেবে নেওয়ার মডেল দেখিয়েছিল প্রথমে কলম্বো, পরে ঢাকা। রক্তক্ষয় ও ভাঙচুর বেশি হয়েছে বাংলাদেশ-নেপালে। কাঠমান্ডুর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত ডিসেম্বরে এক তদন্ত শেষে আন্দোলনকালীন ভাঙচুরে ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ক্ষতির কথা জানায়। বাংলাদেশে সে রকম কোনো হিসাব হয়েছে বলে জানা যায় না। তবে এখানে জীবনহানি ছিল বিপুল। প্রায় এক হাজার মানুষ মারা যায় অভ্যুত্থানকালে। নেপালে এ রকম মৃত্যুর ঘটনা ৮০-এর কাছাকাছি। শ্রীলঙ্কায় ১০ জন। এই তিন দেশেই গণ-আন্দোলন রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীকে জটিল পরিস্থিতির মুখে ফেলে। শ্রীলঙ্কায় চূড়ান্ত মুহূর্তে বিক্ষোভকারীদের দমনে অস্বীকৃতি জানায় তারা; যা বেশ বিস্ময় তৈরি করে এবং আন্দোলনকারীদের জন্য স্বস্তির হয়। বাংলাদেশেও চিত্র ছিল অনুরূপ। নেপালের বেলায় শুরুতে ভাঙচুর থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিলেও পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব নেয়। তাতে অস্থায়ী সরকার গঠন সহজ হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসও সে রকম। ভারতের সমকালীন ইতিহাসেও এটা অভিনব ছিল—শিক্ষার্থীদের সমাবেশে এসে একজন পুলিশ সংহতি জানিয়ে চাকরিতে ইস্তফা দিচ্ছে।
নেপালে ক্ষমতাচ্যুত অলি নিজ আসনে প্রদত্ত ভোটের এক-চতুর্থাংশ পেয়ে বিরাট ব্যবধানে হারেন। ৩৬ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহর কাছে ৭৪ বছর বয়সী তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর এ রকম পরাজয় ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক স্পষ্ট যৌথ-সাধারণ-ইচ্ছার স্মারক।
এ রকম যাবতীয় অভিজ্ঞতার মধ্যে ইতিমধ্যে তিন দেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচন হয়েছে। দেশ-বিদেশে এসব নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও নেপালে ক্ষমতাচ্যুত দলগুলোও নির্বাচনে অংশ নেয়। ক্ষমতাচ্যুতদের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের ভার জনগণের হাতে দেওয়ার ফল ছিল চমকপ্রদ। শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত রাজপক্ষেদের প্রতিনিধি নমল রাজাপক্ষে (গোতাবায়ার ভাতিজা এবং মাহিন্দা রাজপক্ষের পুত্র) মাত্র ২ শতাংশ ভোট পান। বিজয়ী অনূঢ়া পান ৪২ শতাংশ। পরবর্তী পার্লামেন্ট নির্বাচনে রাজপক্ষেদের দল আসন পায় ৩টি, যা আগের নির্বাচন থেকে ১৪২টি কম!
নেপালে ক্ষমতাচ্যুত অলি নিজ আসনে প্রদত্ত ভোটের এক-চতুর্থাংশ পেয়ে বিরাট ব্যবধানে হারেন। ৩৬ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহর কাছে ৭৪ বছর বয়সী তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর এ রকম পরাজয় ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক স্পষ্ট যৌথ-সাধারণ-ইচ্ছার স্মারক। বাংলাদেশে জনতাকে সেভাবে আওয়ামী লীগের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। ভারতের তরুণদের বিক্ষোভের লক্ষ্য আপাতত সরকার ফেলে দেওয়া ছিল না—তবে সেখানের মিছিল ও বিক্ষোভের শক্তির কাছে সরকারি একগুঁয়েমি হার মেনেছে। ‘তন্ত্রে’র ওপর ‘গণে’র এক দফা জয় হয়েছে।
নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে যারা ক্ষমতা হারাল এবং নির্বাচনে যারা বিজয়ী হয়ে এল, তাদের সবার আদর্শিক ও ভূরাজনৈতিক পক্ষপাতের ব্যাপক মূল্যায়ন হয়েছে ইতিমধ্যে। তিন দেশেই পুরোনো দ্বিদলীয় ছক বেশ ঝাঁকুনির মুখে পড়েছে গণ-অভ্যুত্থানে। লঙ্কায় ‘আরাগালায়া’ মধ্য-বামদের প্রভাব বাড়িয়েছে রাজনীতিতে। বাংলাদেশে জিতেছে মধ্য-ডানেরা। নেপালে বিজয়ী জাতীয়তাবাদী মধ্যপন্থী তরুণদের সমন্বয়ে পুনর্গঠিত ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’। ভারতের বেলায় আন্দোলন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নিয়ে হলেও প্ল্যাকার্ড বেশি ছিল গেরুয়া মতাদর্শের বিরুদ্ধে।
তরুণদের মধ্যে আম্বেদকরের আবেদন বৃদ্ধি তাৎপর্যপূর্ণ সামাজিক লক্ষণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অন্য তিন দেশে নির্বাচন শেষে তিন নির্বাহী প্রধান প্রথমবারের মতো এ রকম দায়িত্ব নিলেন। তিনজনেরই বয়স ষাটের নিচে। নিজ নিজ দেশে এখনো তাঁরা জনপ্রিয়তায় নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশ এগিয়ে। তবে তিন দেশেই তিন ধরনের দক্ষিণপন্থার চাপ স্পষ্ট—নির্বাচনী গণতন্ত্রে যাদের আগ্রহ কম। নির্বাচন পেতে গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোকে বেশ বেগও পেতে হয়েছে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে। নেপালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশে মবের বিস্তার দেখে সাড়ে ছয় মাসে নির্বাচন দিয়ে বিদায় নেয়।
অগ্রগামী গণ-অভ্যুত্থানকারী হিসেবে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব বেশি হচ্ছে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে। স্পষ্টত অর্থনৈতিক অগ্রগতি বেশি লঙ্কায়। তবে পদ্ধতিগতভাবে সংস্কারের বেপরোয়া আয়োজন দেখা যাচ্ছে নেপালে নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে। বাধাবিপত্তি এবং বিতর্কও বেশি সেখানে।
তিন দেশের দুটিতে আন্দোলনকারী তরুণ শক্তির ভেতর থেকে একাধিক সংগঠনের জন্ম হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় অভ্যুত্থানকারী তরুণ শক্তির একাংশ অনূঢ়াদের এনপিপি জোটের বাইরে থাকলেও পুরোনো বড় দলগুলোর সঙ্গে যায়নি। নেপালে ব্যতিক্রম একটা প্রবণতা দেখা গেল। অভ্যুত্থানকারী বিভিন্ন গ্রুপ নির্বাচনের আগে পুরোনো দলগুলোকে হারানোর প্রয়োজনে নিজেরাই বালেন্দ্র শাহকে সামনে রেখে নবীন স্বতন্ত্র পার্টির ছায়ায় একত্র হয়। এই উভয় দেশে অভ্যুত্থানকারীরা পুরোনো বিতর্কিত দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়ার বদলে আন্দোলনকালীন প্রত্যাশার ওপর দাঁড়িয়েই এখনো সক্রিয়। ফলে কাঠমান্ডু এবং কলম্বোর রাজনীতিতে সংস্কারবাদী ঝোঁক প্রধান ধারা হয়ে আছে। বাংলাদেশে সাংগঠনিক জোটবদ্ধতায় জেন-জিদের বড় একাংশকে কাছে পেয়েছে মাওলানা মওদুদি প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী। বাকিরা অ্যাকটিভিস্ট গ্রুপের আদলে পুনর্গঠিত হওয়ার চেষ্টায় আছে। ‘রাষ্ট্র সংস্কারে’র প্রশ্নে হাল ছাড়তে চাইছে না তারা। ভারতেও ককরোচদের বড় একাংশ সক্রিয় রাজনীতিতে থাকবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
এই লেখা তৈরির সময় নেপালে স্বতন্ত্র পার্টির ক্ষমতাসীন হওয়ার বয়স ১০০ দিনের মতো হলো। বাংলাদেশে তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা পাঁচ মাস পার করেছে। শ্রীলঙ্কায় অনূঢ়া কুমার দিশানায়েকে অবশ্য প্রায় দুই বছর পার করে ফেলেছেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে।
অগ্রগামী গণ-অভ্যুত্থানকারী হিসেবে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব বেশি হচ্ছে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে। স্পষ্টত অর্থনৈতিক অগ্রগতি বেশি লঙ্কায়। তবে পদ্ধতিগতভাবে সংস্কারের বেপরোয়া আয়োজন দেখা যাচ্ছে নেপালে নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে। বাধাবিপত্তি এবং বিতর্কও বেশি সেখানে। ভারতেও আন্দোলনের নৈতিক ও আদর্শিক জোর এবং পাশাপাশি পুলিশি দৌরাত্ম্য প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি আগামীর দিকে বহু দূর নিয়ে গেছে। তবে নয়াদিল্লি শান্ত হওয়া মাত্র রাষ্ট্রবিদ্যার ভাবুকেরা নতুন করে ভাবতে বসেছেন—তারুণ্যের নবতর এই রুদ্ররূপ দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আদৌ পরিবর্তন কিছু ঘটাতে পারছে কি না?
গণ-অভ্যুত্থানের মুহূর্তে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে দুর্দশায় ছিল শ্রীলঙ্কা। গোতাবায়া ক্ষমতার ২৯ মাসেই দেশকে খাদের কিনারে নিয়ে গিয়েছিলেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দেউলিয়া অবস্থা থেকে অর্থনীতির উত্তরণ। রণিল বিক্রমাসিংহের সরকার সেটা পেরেছিল। অনূঢ়াদের জনতা বিমুক্তি পেরামুনার নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারও অর্থনৈতিক বিষয়ে যত্নের সঙ্গে কাজ করছে। ফল হিসেবে সম্প্রতি দেশটি বিশ্বব্যাংক থেকে উচ্চ-মধ্য আয়ের দেশের স্বীকৃতি পেল। গত বছর তাদের জিডিপি বেড়েছে ৫ শতাংশ। পর্যটন ও প্রবাসী আয়েও প্রবৃদ্ধি এসেছে। তবে নতুন সরকারও আইএমএফের পরামর্শ মেনেই চলছে। তার জন্য অধিকতর র্যাডিক্যালদের সমালোচনাও আছে।
শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধ করেছিল, বিশেষ করে ব্যাংক খাতকে প্রায়-দেউলিয়া পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করে। তবে উভয় জায়গায় রাজনৈতিক সংস্কারের প্রধান ক্ষেত্রগুলোতে অগ্রগতি আসেনি।
লঙ্কায় গণ-অভ্যুত্থানকালে সংস্কারের প্রধান প্রত্যাশা ছিল প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং তামিল এলাকার স্বায়ত্তশাসন। দুটোই এখনো অমীমাংসিত। তবে অনূঢ়া কুমার প্রতিশ্রুতি রাখবেন বলে মানুষ এখনো বিশ্বাস করছে। বিস্ময়করভাবে তাঁর সিংহলি-প্রধান দল সমকালীন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনেক তামিল ভোট পেয়েছে। অনূঢ়া তাঁর দলকে সিংহলি জাতীয়তাবাদ থেকে শ্রীলঙ্কান জাতীয়তাবাদে টেনে আনছেন। শাসনতান্ত্রিক সংস্কারে মৌলিক পরিবর্তন না ঘটলেও গত বছরের গ্লোবাল ডেমোক্রেটিক ইনডেক্সে লঙ্কা ১৫ ধাপ এগোয়। এই জুলাইয়ে স্থানীয় গবেষণা সংস্থা সিপিএর জরিপে দেখা গেছে, বিরোধীদলীয় প্রধান নেতার চেয়ে অনূঢ়া জনপ্রিয়তায় প্রায় আড়াই গুণ এগিয়ে আছেন (৭৫%/২৯%)।
তবে বহুকালের বিতর্কিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রত্যাশিত সংস্কার না হওয়া নিয়ে স্থানীয়ভাবে অসন্তুষ্টি আছে। অনূঢ়ার সরকার প্রাদেশিক নির্বাচন দিতেও বিলম্ব করছে; যা এক বছরের মধ্যে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। সম্প্রতি উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েও সরকার বিতর্কের মুখে আছে।
তিন দেশের মধ্যে বাংলাদেশেই অন্তর্বর্তীকালীন আমলে রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রশ্নে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ছিল বেশি। ১১টি খাতে সংস্কারের জন্য কমিশন গঠিত হয় এবং কমিশনগুলো করণীয় হিসেবে অনেক সুপারিশও দেয়। তার সামান্যই বাস্তবায়ন হয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ক্ষমতা কমিয়ে স্থানীয় সরকারের দিকে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, পুলিশ বাহিনীর সংস্কার এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে মানবাধিকার কমিশনের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলোতে অগ্রগতি কিছু নেই। বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমানোর অতি প্রাচীন বিষয়েও অগ্রগতিতে বাধা পড়েছে।
ভারতে ককরোচদের একাংশ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থারও রূপান্তর চাইছে এখন। আন্দোলনকারী প্রায় সবাই ‘আজাদি’র কথা বলেছে বারবার—মিছিলে, স্লোগানে। যার ব্যবহারিক ছাপ হয়তো দেখা যাবে দেশটির নিকট ভবিষ্যতের রাজনীতিতে। হয়তো তারা বুঝতে পারছে সমস্যা কেবল একজন শিক্ষামন্ত্রী বা প্রধান বিচারপতি নয়।
সংস্কার প্রশ্নে এই চার দেশের মধ্যে কেবল বাংলাদেশেই গণভোট হয়। যদিও সেই জনরায় কাজে অনুবাদ হয়নি। তিন অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংশ্লিষ্ট ছয় সরকারই সামরিক আমলাতন্ত্রের সংস্কার প্রশ্ন এড়িয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিবাদের বড় এক ইস্যু নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে গঠিত হবে, সে প্রশ্নও অমীমাংসিত হয়ে আছে; যা ভবিষ্যৎ অস্থিরতার নিশ্চিত ভয় দেখাচ্ছে। তারেক রহমানের সরকার অবশ্য সংস্কার প্রশ্নে ধৈর্য ধরতে বলছে বারবার।
শুরুতে নেপালেও সুশীলা কার্কির নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর সংস্কারধর্মী পদক্ষেপের প্রবল চাপ ছিল। কার্কি সরকার মন্ত্রিসভায় দেশের খ্যাতনামা সংস্কারবাদীদেরই নেয়। তবে ওই সরকার শেষমেশ নির্বাচনটুকুই গুরুত্ব দিয়ে করে এবং বিদায় নেয়।
নেপালে তরুণ প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বে নতুন সরকার এসে প্রথম দিনই ১০০ দফা সংস্কার এজেন্ডা ঘোষণা করেছে। অধিকাংশ এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। অগ্রগতি অবশ্য কম। ১০০ দিন শেষে সরকার নানান তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে এখন পর্যন্ত ৮৭ শতাংশ সফলতার (!) দাবি করেছে। তবে ১০০টি সংস্কার লক্ষ্যের পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে কেবল ৬টি। অন্যগুলোতে চেষ্টা চলছে।
নতুন সরকারের সংস্কার এজেন্ডার মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্ট পদে সরাসরি নির্বাচন এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানো। এ ছাড়া প্রবাসী নেপালিদের ভোটাধিকার দিতে চাইছে তারা। দেশের বর্তমান ফেডারেল ব্যবস্থা নিয়েও বালেন্দ্র শাহর ভিন্ন চিন্তা আছে। তবে অন্যান্য রাজনৈতিক দল এসব উদ্যোগে শীতল প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যে সরকার খরচ কমাতে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমিয়ে ১৮-তে নিয়ে এসেছে। দুর্নীতিবিরোধী বড় পদক্ষেপ হিসেবে রাজনীতিবিদ ও প্রশাসকদের গত দুই দশকের সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের হিসাব নথিকরণ উদ্যোগ শুরু হলেও উচ্চ আদালতে এই কমিশনের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বহুল আলোচিত এই উদ্যোগে ইতিমধ্যে ২৫ হাজার জনকে ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব দিতে নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। নোটিশের জবাবও এসেছে প্রায় ১৪ হাজার।
গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ-নেপাল-লঙ্কা তিন দেশই বিদেশনীতিতে লক্ষণীয় বদল ঘটিয়েছে। তিন প্রধানমন্ত্রীই চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছেন।
বালেন্দ্র সরকারের একটা চমৎকার উদ্যোগ ছিল, ছয়টি দলের নির্বাচনী ইশতেহারে মিল আছে এমন বিষয়গুলো নিয়ে ১৮ দফা ‘জাতীয় অঙ্গীকারপত্র’ তৈরি। এটাকে তারা বলছে ‘কমন ন্যাশনাল কমিটমেন্ট ডকুমেন্ট’। ২২ পাতার এই দলিলে ১৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় ৩ হাজার ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য ঠিক হয়েছে। তাতে এ-ও আছে, নেপাল দেশ হিসেবে আর চীন-ভারতের ‘বাফার স্টেট’ হিসেবে থাকতে চায় না, আপন শক্তিতে উজ্জ্বল এক সংযোগকারী হতে চায়।
গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ-নেপাল-লঙ্কা তিন দেশই বিদেশনীতিতে লক্ষণীয় বদল ঘটিয়েছে। তিন প্রধানমন্ত্রীই চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছেন। এশিয়ার দুই পরাশক্তিও অভ্যুত্থানের ধাক্কা সামলে পুরোনো প্রভাব ফিরে পেতে সৃজনশীল নানান চেষ্টায় আছে। ওয়াশিংটনও তার স্বার্থে সক্রিয়।
অভ্যুত্থানের পরপর বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিতর্কিত বাণিজ্যচুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে গেলেও শ্রীলঙ্কা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সময় নিজ সীমানায় যুক্তরাষ্ট্রের যোদ্ধাদের নামতে দেওয়ার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করার হিম্মত দেখায়। নেপালের নতুন সরকারও সীমান্ত নিয়ে চীন-ভারত উভয় দেশের সঙ্গে সাহসের সঙ্গে বাক্য বিনিময় করছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও প্রথম বিদেশ সফরে ভারত-চীনের বদলে তৃতীয় দেশে গিয়ে মধ্যপন্থার বার্তা দিলেন।
এসব ঘটনার মধ্যেই ভারতে নতুন চরিত্র হিসেবে ককরোচদের উত্থান। অনশন ও সমাবেশের মতো অহিংস পদ্ধতিকে তারা নিজ দেশের ভঙ্গুর গণতন্ত্রকে পুনর্গঠিত করার পথ উপায় হিসেবে পছন্দ করেছে। এ রকম ভারতই হয়তো আশপাশের প্রতিবেশীদের আরাধ্য। প্রযুক্তির সূত্রে কাছাকাছি চলে আসা নতুন প্রজন্ম ক্রমে নতুন এক দক্ষিণ এশীয় গণতান্ত্রিক অক্ষশক্তি হয়ে ওঠার পথে রয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলছে। তবে পুরোনো বন্দোবস্তে এখনো ফাটল ধরাতে পারেনি তারা—যদিও সমস্যা শনাক্ত করতে পারাও চিকিৎসার এক ধাপ অগ্রগতি।
* আলতাফ পারভেজ: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক