
বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া, পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল এবং প্রশ্নের মান নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সমাবেশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার দিনভর বিক্ষোভের পর সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের সামনের সড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ লাঠিপেটা করে তাঁদের সরিয়ে দেয়। তবে কিছুক্ষণ পর তাঁরা আবার জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
রাত পৌনে ১০টার দিকে শিক্ষার্থীরা নতুন কর্মসূচি দিয়ে বিক্ষোভ শেষ করেন। তাঁরা জানিয়েছেন, আজ বুধবারের নির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত না করলে বেলা তিনটায় সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে ‘লংমার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি পালন করা হবে। শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়ার জন্য শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এদিকে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের নিয়ে তাঁর বক্তব্যের জন্য গতকাল সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
গতকাল সকাল থেকে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্তত ১৩ জেলায় বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে ঢাকা, বরিশাল ও টাঙ্গাইলে মহাসড়ক অবরোধ এবং চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করা হয়। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব, মিরপুরের ইসিবি চত্বর ও উত্তরায় দিনভর বিক্ষোভ-সড়ক অবরোধে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এতে অনেকে পরীক্ষা দিতে পারেননি। তাঁদের দাবি, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার অবসান না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত, যাঁরা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাঁদের পরীক্ষা আবার নিতে হবে।
এ ছাড়া শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের ফার্মের মুরগির সঙ্গে তুলনা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অযাচিত মন্তব্যের জন্য ক্ষমা না চাইলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে বলে দাবি করেন শিক্ষার্থীরা।
দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের পর সন্ধ্যায় অধিবেশন চলাকালে জাতীয় সংসদ ভবনে ঢোকার চেষ্টা করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় পুলিশ লাঠিপেটা করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তবে দাবি পূরণ হয়নি উল্লেখ করে রাত ৮টার দিকে আজ বুধবারের সব বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা বর্জনের ডাক দেন শিক্ষার্থীরা। পরে ৮টা ১০ মিনিটের দিকে তাঁরা আবার সংসদ ভবনের মূল ফটকের সামনে সড়ক অবরোধ করেন।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধের মধ্য দিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। এরপর তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে গিয়ে অবস্থান নেন। সেখান থেকে পুলিশ সরিয়ে দিলে বকশীবাজারে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে যান। তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন এবং ‘ভুয়া’, ‘ভুয়া’ স্লোগান দেন। একপর্যায়ে ইট ছোড়েন ও শিক্ষা বোর্ডের ফটকে ধাক্কাধাক্কি করেন। সেখান থেকে ফিরে বিকেল পৌনে চারটার দিকে তাঁরা আবার সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন।
সায়েন্স ল্যাবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলার মধ্যে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে শিক্ষার্থীদের বিষয়গুলো দেখার আশ্বাস দিয়ে তাঁদের পড়ার টেবিলে ফেরার অনুরোধ জানান শিক্ষামন্ত্রী। পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের দুটি ভুল প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীরা পূর্ণ নম্বর পাবেন জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব কেন্দ্রে সমস্যা হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে প্রয়োজনে আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে।
এই ঘোষণার পর বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। পরে সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে মিছিল নিয়ে জাতীয় সংসদের সামনে অবস্থান নেন তাঁরা। সংসদ অধিবেশন চলার মধ্যে সংসদের সামনে অবস্থান নিয়ে ‘ভুয়া’, ‘ভুয়া’ স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে সংসদে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিপেটা করে।
শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণার পরও কেন তাঁরা আন্দোলন করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে একজন শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা তাঁরা মানেন না। এর আগেও তিনি অনেক ঘোষণা দিয়েছেন, কোনো কিছুই বাস্তবায়ন করেননি। ফলে তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীকে এই পদে যোগ্য মনে করছেন না।
গতকাল বেলা ১১টায় চট্টগ্রামের মুরাদপুরে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে সিডিএ অ্যাভিনিউ সড়কের এক পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া একজন শিক্ষার্থী বলেন, তাঁদের দাবি সুনির্দিষ্ট। তাঁরা শুধু এক বোর্ড নয়, সব বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত চান। পরীক্ষার প্রশ্নে ভুলের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি চান। বন্যার পানিতে অনেকের রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশপত্র নষ্ট হয়েছে। সেগুলো দ্রুত নতুন করে দেওয়ার দাবিও জানান তাঁরা।
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করেন সেখানকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক শ শিক্ষার্থী। তাঁরা শিক্ষা বোর্ড প্রাঙ্গণে ঢুকে বিক্ষোভ দেখান। দুপুরে শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধিদল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শামীম আরা চৌধুরীর কাছে একটি স্মারকলিপি দেয়। বেলা আড়াইটা পর্যন্ত তারা শিক্ষা বোর্ড প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করে।
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের সামনে মহাসড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন কলেজের পরীক্ষার্থীরা। পরে বেলা তিনটার দিকে তাঁরা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এ ছাড়া ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। বেলা দেড়টার দিকে টাঙ্গাইল শহর বাইপাসের নগর জলপাই এলাকায় গিয়ে পৌনে তিনটা পর্যন্ত তাঁরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এ ছাড়া সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, কুমিল্লা, বগুড়া, কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জ, নওগাঁসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ-অবরোধ করেছেন।
শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা অযাচিত মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। গতকাল রাতে জাতীয় সংসদে একটি বিলের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সোমবার পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষা হয়েছে। এ পরীক্ষার সময় বৃষ্টি ছিল, অনেকেই ভিজেছে এবং অনেকেই পরীক্ষা সঠিকভাবে দিতে পারেনি—এমন অভিযোগ এসেছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের প্রতিটি জেলার পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আবার পরীক্ষা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাঁরা ভেবেচিন্তে দেখেছেন, চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা যখন নেওয়া হবে, তখন এ পরীক্ষা আবার নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবেন।
দুঃখ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘তা ছাড়া আমার ব্যক্তিগত কোনো মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি করেছেন। এ ব্যাপারে আমি বলতে চাই, আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে কিছু বলি নাই। যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকে, সিম্পলি দুঃখ প্রকাশ করছি।’