
উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে জানিয়ে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানভীতি দূর করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আসলে সায়েন্সটা হলো এডুকেশন, বাকিটা হলো সাব–পার এডুকেশন (শিক্ষার প্রত্যাশিত মানদণ্ডের চেয়ে কম)।’
আজ সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন ববি হাজ্জাজ। ব্র্যাক আয়োজিত ‘সাসটেইনিং প্লে, লার্নিং অ্যান্ড স্কিলস ইন হিউম্যানিটারিয়ান কনটেক্সটস (স্প্ল্যাশ)’ উদ্যোগের উদ্বোধন উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, জাতিকে এগিয়ে নিতে বিজ্ঞান শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তিনি মনে করেন, বিজ্ঞান শিক্ষার বাইরে অন্য সব শিক্ষাকে ‘সাব–পার’ বললে সেটা সমালোচনার কারণ হতে পারে। সমালোচনা হবে জেনেও তিনি এই মন্তব্য করছেন।
ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের পপুলেশনটা এডুকেটেড হোক, নট সাব–পার এডুকেটেড।’ তিনি বলেন, সরকার চায় শিক্ষার্থীরা যাতে মানসম্মত শিক্ষা পায়; কিন্তু বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে শিশুর ৫০ শতাংশ মাতৃভাষায় এবং গণিত ও ইংরেজিতে তার চেয়েও বেশি শিক্ষার্থীর ন্যূনতম শিখন ফল অর্জন হচ্ছে না।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মনে করেন, সরকার এখন পর্যন্ত শিশুদের সঠিক প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে সফল নয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অনেকগুলো বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
ব্যক্তিগতভাবে ববি হাজ্জাজ মনে করেন, উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বিজ্ঞানের বাইরে শিক্ষা হওয়া উচিত নয়। তবে বিষয়টি নিয়ে এসএসসি ও এইচএসসি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নামার প্রয়োজন নেই বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন। কারণ, তাঁর সব মত বাস্তবে কার্যকর হবে না।
দেশে জাতিগতভাবে অঙ্ক ও বিজ্ঞানকে ভয় পাওয়ার একটি প্রবণতা আছে বলেও উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।’ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রীদের হার অনেক কমে গেছে জানিয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘নারীদের বিজ্ঞানে আরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন।’
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের সব ধারার শিক্ষার মান সমান করতে ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যম কিংবা মাদ্রাসার কারিকুলাম; শিক্ষক ও অবকাঠামোর জন্য সরকার একটি ‘মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড’ বা ন্যূনতম মান নির্ধারণ করে দেবে।
প্রাথমিকে বিজ্ঞানের ভিত্তি ও আগ্রহ তৈরিতে ব্র্যাক ও লেগোর ‘প্লে ল্যাব’ মডেলের প্রশংসা করে ববি হাজ্জাজ বলেন, খেলার ছলে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করতে দেশের ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী মডেলের ল্যাব চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি স্কুলে এটি সফল হলে দেশের বাকি ৭০ হাজার বেসরকারি স্কুল ও মাদ্রাসায়ও তা বাধ্যতামূলক করা হবে। ব্র্যাকের এই মডেলের ওপর ভিত্তি করে সরকার দ্রুতই কয়েকটি স্কুলে পাইলট প্রজেক্ট শুরু করবে।
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, সরকার জেলা ও উপজেলায় ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫০টি, জেলা সদর হাসপাতালে ১০টি এবং উপজেলা পর্যায়ে ১০টি করে ডায়ালাইসিস বেডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
উদ্বোধনী অধিবেশনে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ বলেন, ব্র্যাক তিন বছর ধরে সংকটময় পরিস্থিতিতেও কম খরচে টেকসই মডেলের মাধ্যমে কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা, ওয়ান-রুম স্কুল এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা করছে।
অনুষ্ঠানে ব্র্যাক জানায়, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৪৭ কোটি ৩০ লাখের বেশি শিশু সংঘাত ও মানবিক সংকটপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছে, যেখানে ৫ কোটি ২০ লাখের বেশি শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। এসব অঞ্চলে শিক্ষা, সুরক্ষা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
ব্র্যাক ও লেগো ফাউন্ডেশনের পাঁচ বছর মেয়াদি পাঁচ কোটি মার্কিন ডলারের অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও উগান্ডায় মানবিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত চার লাখ শিশু ও কিশোর-কিশোরীর কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে শিশুদের লালন-পালন ও বিকাশে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে লেগো ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক কর্মসূচির প্রধান ও ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক আলামির বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়। এতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ জকরিয়া, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।