বিবিএস ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের লোগো
বিবিএস ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের লোগো

নৌযানশুমারির দেড় মাস পরও সম্মানীর টাকা পাননি ৩৫০০ গণনাকারী

দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌযানের সংখ্যা জানতে ১০ দিন ধরে তথ্য সংগ্রহ করেন সাড়ে তিন হাজার গণনাকারী। শুমারির কাজ শেষ হওয়ার দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁরা সম্মানীর টাকা পাননি। কবে পাবেন, সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই তাঁদের কাছে।

গণনাকারীদের কয়েকজনের অভিযোগ, অতীতে জরিপ ও শুমারিতে কাজ করে সম্মানী পেতে এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। টাকা পেতে তাঁরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু কবে টাকা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আশ্বাস পাচ্ছেন না।

বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে বিবিএস। সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থের সংস্থান ও অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় টাকা দেওয়া যাচ্ছে না। এ মাসের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে টাকা ছাড় হবে বলে আশা করছেন তাঁরা। এরপর গণনাকারীদের মধ্যে সম্মানীর টাকা বিতরণ করা হবে।

বিবিএস সূত্র জানায়, গত ২০ আগস্ট সারা দেশে একযোগে নৌযানশুমারি শুরু হয়। শেষ হয় ২৯ আগস্ট। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের আর্থিক সহযোগিতায় শুমারিটি পরিচালনা করেছে বিবিএস। শুমারিতে ৩ হাজার ৫০০ গণনাকারী নিয়োগ দেওয়া হয়। ১০ দিনের কাজের জন্য তাঁদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা। ভ্যাট-কর বাদে প্রত্যেকের ১৫ হাজার টাকা করে পাওয়ার কথা।

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা রাজীব কান্তি চন্দ্র শুমারিতে গণনাকারীর দায়িত্ব পালন করেন। গত সোমবার প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এর আগে তিনি বিবিএসের দুটি জরিপ ও শুমারিতে কাজ করেছেন। কিন্তু কখনো সম্মানীর টাকা পেতে এত দেরি হয়নি। এবার এমন বিলম্বকে অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। কেন দেরি হচ্ছে, আদৌ টাকা পাবেন কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন রাজীব কান্তি চন্দ্র। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা শিগগিরই সম্মানীর টাকা দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন।

ভোলা সদর উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ ফিরোজও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, এবারই প্রথম বিবিএসের শুমারিতে গণনাকারী হিসেবে কাজ করেছেন। তবে অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। এখনো সম্মানীর টাকা পাননি তিনি। অন্য জরিপ ও শুমারির কাজ শেষ হওয়ার দুই-তিন দিনের মধ্যেই সম্মানী পরিশোধ করা হতো বলে শুনেছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নৌযানশুমারির উদ্যোগের শুরু থেকেই জটিলতা দেখা দেয়। প্রথমে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন নৌপরিবহন অধিদপ্তর শুমারিটি করার উদ্যোগ নেয়। উদ্দেশ্য ছিল, দেশের সমুদ্রগামী, উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ ইঞ্জিনচালিত নৌযানের তথ্য সংগ্রহ করে একটি আধুনিক ‘ন্যাশনাল শিপস অ্যান্ড মেকানাইজড বোট ডেটাবেজ’ তৈরি করা। এ জন্য ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেয় অধিদপ্তর। গত বছর প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে কমিশন তা আটকে দেয়। কমিশনের যুক্তি ছিল, পরিসংখ্যান আইন অনুযায়ী, যেকোনো শুমারি বা জরিপ পরিচালনার দায়িত্ব বিবিএসের। তাই এ শুমারি নৌপরিবহন অধিদপ্তরের পক্ষে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। পরে সিদ্ধান্ত হয়, শুমারিটি পরিচালনা করবে বিবিএস এবং এতে আর্থিক সহযোগিতা দেবে নৌপরিবহন অধিদপ্তর।

সম্মানীর টাকা পাচ্ছেন না কেন

গণনাকারীরা কেন সম্মানীর টাকা পাচ্ছেন না, তা জানতে বিবিএস ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরিকল্পনার ঘাটতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শুমারি পরিচালনার জন্য গত বছরের ২১ আগস্ট নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও বিবিএসের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। এতে দুই বছরের মধ্যে শুমারির কাজ শেষ করার কথা বলা হয়। সে অনুযায়ী, দুই বছরের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়। প্রথম বছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ৯ কোটি টাকা। তবে মাঠপর্যায়ে নৌযানশুমারি পরিচালনার সময় বিবিএস সিদ্ধান্ত নেয়, শুধু বর্ষা মৌসুমেই শুমারির কাজ করা হবে। সে ক্ষেত্রে দুই বছরের কাজ এক বছরেই শেষ করতে হবে। এ পরিস্থিতিতে গণনাকারীদের সম্মানীর ব্যয় মেটাতে গত ৭ জুলাই নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কাছে অগ্রিম ১২ কোটি টাকা চেয়ে চিঠি দেয় বিবিএস। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, হঠাৎ করে অতিরিক্ত টাকা দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

নৌযানশুমারির প্রকল্প পরিচালক ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নৌযানশুমারির গণনাকারী নিয়োগ দিয়েছে বিবিএস। তাঁদের সম্মানী দেওয়ার দায়িত্বও বিবিএসের। দুই বছরে শুমারি শেষ করার কথা থাকলেও হঠাৎ করে বিবিএস এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এখানেই জটিলতা তৈরি হয়েছে। দুই বছরের বরাদ্দের টাকা এখন এক বছরেই দিতে হচ্ছে। সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, বাজেট থেকে অগ্রিম টাকা চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ মাসের মধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে টাকা ছাড় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থছাড়ের অপেক্ষায় বিবিএস

সম্মানীর টাকা না পাওয়ায় গণনাকারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তাঁদের বক্তব্য, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার পর পারিশ্রমিক পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত। কাজের জন্য সময় ও শ্রম দেওয়ার পর সম্মানী পেতে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হবে, এমন পরিস্থিতি তাঁরা প্রত্যাশা করেননি। গণনাকারীদের পাওনা পরিশোধে বিলম্বের কারণে মাঠপর্যায়ে শুমারি পরিচালনাকারী সংস্থা বিবিএসকেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। কারণ, গণনাকারীরা বিবিএসের শুমারি কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই কাজ করেছেন। ফলে সম্মানী না পাওয়ার বিষয়ে তাঁদের ক্ষোভ ও অভিযোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নৌযানশুমারির ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা মো. আরিফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিবিএস সাধারণত বর্ষা মৌসুমে কোনো জরিপ বা শুমারি পরিচালনা করে না। তবে নৌযানশুমারিটি বর্ষাকেন্দ্রিক হওয়ায় এক বছরের মধ্যেই কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ জন্য অতিরিক্ত টাকা চাওয়া হয়েছে। টাকা না পাওয়ায় গণনাকারীদের সম্মানী দিতে দেরি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এ মাসের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত ১২ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে তাঁরা আশা করছেন।