কিশোর ও তরুণদের কান ধরিয়ে ওঠবস করাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সদস্য সর্বমিত্র চাকমা
কিশোর ও তরুণদের কান ধরিয়ে ওঠবস করাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সদস্য সর্বমিত্র চাকমা

শিশুদের কান ধরে ওঠবস করিয়ে সর্বমিত্র ‘অবৈধ, অমানবিক’ কাজ করেছেন

মাত্র কিছু দিন আগে (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি স্কুলে একটি শিশু নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও স্কুলের ব্যবস্থাপক শিশুটিকে থাপ্পড় দেন, মাথা ঠেসে ধরেন, নির্যাতনের কথা ফাঁস করলে মুখ স্টেপলার দিয়ে সেলাই করার হুমকিও দেন শিশুটিকে। এ ঘটনায় শিশুটির মা বাদী হয়ে শিশু আইনে মামলা করেন। পরদিন ২৩ জানুয়ারি স্কুলের ব্যবস্থাপককে গ্রেপ্তার করে পল্টন থানা–পুলিশ।

এই ঘটনার মাত্র দুই দিনের মধ্যে গতকাল রোববার (২৫ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে একদল শিশুকে কান ধরে ওঠবস করানোর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, মাঠে ২৫–৩০ জনের মতো শিশু, কিশোর, তরুণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে কান ধরে ওঠবস করছে। কেউ যেন ‘ফাঁকি দিতে না পারে’ সে জন্য লাঠি হাতে এক তরুণ কড়া নজরদারি রাখছেন। মাঝেমধ্যে কারও কারও সামনে দাঁড়িয়ে বকাঝকা করছেন। ওই তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য সর্বমিত্র চাকমা। ভাইরাল এই ভিডিওর ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের মুখে সর্বমিত্র চাকমা ডাকসু থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঘটনাটি গত মাসের উল্লেখ করে তাঁর কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইলেও নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন একাধিকবার। ওই ভিডিওতে সর্বমিত্র চাকমার সঙ্গে ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান।

তবে পদত্যাগ বা ক্ষমা প্রার্থনা অন্যায় থেকে দায়মুক্তি দেয় না। শিশু বলেই তার সঙ্গে যা–তা করা যায় না। শিশু বলেই তার মর্যাদাহানি করে পার পাওয়া যায় না। শিশুদের শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে যে প্রচার চলছে, সেটার একটি বড় অংশ বাংলাদেশও। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (ইউএনসিআরসি)সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তিতে বাংলাদেশ শিশুর প্রতি শারীরিক শাস্তি বন্ধে সরকারের অবস্থান জানিয়েছে।

শিশু আইন ২০১৩–এর ৭০ ধারায় ‘শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতার দণ্ড’ শিরোনামে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি যদি তার হেফাজতে, দায়িত্বে বা পরিচর্যায় থাকা কোনো শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা, বর্জন, অরক্ষিত অবস্থায় পরিত্যাগ, ব্যক্তিগত পরিচর্যার কাজে ব্যবহার বা অশালীনভাবে প্রদর্শন করে এবং এর ফলে শিশুর দুর্ভোগ সৃষ্টি হয় বা স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় (শিশুর দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তি নষ্ট, শরীরের কোনো অঙ্গ বা ইন্দ্রিয়ের ক্ষতি, মানসিক বিকৃতি ঘটে), তা হলে ওই ব্যক্তি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবে। ওই অপরাধের সাজা হিসেবে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড রয়েছে।

শিশু অধিকার অনেক বড় একটি বিষয়। ওরা শিশু বলে কেউ যা খুশি তা করতে পারবে না। শৃঙ্খলার নামে যে কেউ কান ধরে ওঠবস করতে, চড়থাপ্পড় দিতে পারে না। এটা অমর্যাদাকর, অমানবিক ও অবৈধ।
তাসলিমা ইয়াসমীন, সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা সংক্রান্ত নীতিমালা ২০১১’ রয়েছে।

আজ সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সর্বমিত্র চাকমাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জবাব চেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদের সই করা চিঠিতে বলা হয়েছে, একজন ছাত্র ও ডাকসু সদস্যের এ ধরনের আচরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি তথা মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিপন্থী।

সর্বমিত্রের সাফাই, যৌক্তিকতা নেই

ডাকসু সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর সর্বমিত্র চাকমার এমন বিতর্কিত আচরণ এই প্রথম নয়। শিশুদের কান ধরে ওঠবস করানোর আগে গত বছরের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত আরেকটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে লাঠি হাতে শাসাচ্ছেন ও ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে বলছেন সর্বমিত্র চাকমা। ওই সময় সমালোচনার মুখে ফেসবুকে সর্বমিত্র চাকমা এই বলে যুক্তি দেন যে, ‘যে বৃদ্ধ লোকটিকে দেখছেন, আমি শুরুর দিন থেকে এই লোককে সেই মেট্রোস্টেশন থেকে তুলছি প্রতি রাতে। লোকটা ক্যাম্পাস ছেড়ে যায়-ই না, ওনার সঙ্গে আরেকজন আরও বৃদ্ধ, উনিও মাদকাসক্ত। এই লোকের কাছে এর আগে একবার গাঁজা পাওয়া গেছিল। এই লোকগুলোকে তোলাটা অত্যন্ত কঠিন, তুললে আগায় ৪ কদম। তাই লাঠিসোঁটা ছাড়া বা ভয়ভীতি প্রদর্শন না করে তাদের তোলা যায়–ই না।’

শিশুদের কান ধরে ওঠবস করানোর বিষয়ে জানতে চাইলে সর্বমিত্র চাকমা গতকাল প্রথম আলোর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদককে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের তো আমার কাছে চাওয়া-পাওয়া আছে। তারা (ক্যাম্পাসের বাইরের লোকজন) যখন প্রতিনিয়ত মাঠে এসে ইটপাটকেল মারে এবং তাদের বারবার বলার পরও যখন কথা শোনে না, সেই জায়গা থেকে আমাকেও তো কিছু করতে হয়, তাই না?’

এবার খেলার মাঠে শিশুদের শাস্তি দেওয়ার পক্ষেও তিনি একাধিকবার পোস্ট দিয়ে সাফাই গেয়েছেন। খেলার মাঠে বহিরাগত শিশুরা এসে চুরি করে এমন একটি সিসিটিভি ফুটেজ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে অভিযোগ করেছেন, বহিরাগত বখাটেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করে। ফেসবুক পোস্টে গত বছরের ১৪ অক্টোবর কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অনুশীলন করতে যাওয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থীর সাইকেল হারানোর ঘটনা তুলে ধরেন তিনি। সর্বমিত্র চাকমা আরও লেখেন, ‘এমন অনেক ঘটনা আছে অহরহ। প্রশাসনের কাছে আবেদন করলে দেয়াল সংস্কারের ফাইল ফিরে আসে, বলা হয় বাজেট নেই। এদিকে প্রতিদিন আমাদের শিক্ষার্থীরা মোবাইল হারায়, মানিব্যাগ হারায়, সাইকেল হারায়। বারবার মানা করার পরও আসে, স্টাফদের ওপর ঢিল ছুড়ে পালায় দেয়াল টপকিয়ে। এদিকে দেয়ালের বেহাল দশা। প্রশাসনের অসহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের জন্য এর চাইতে আর কী করার আছে?’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সর্বমিত্র চাকমা গতকাল প্রথম আলোর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদককে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের তো আমার কাছে চাওয়া-পাওয়া আছে। তারা (ক্যাম্পাসের বাইরের লোকজন) যখন প্রতিনিয়ত মাঠে এসে ইটপাটকেল মারে এবং তাদের বারবার বলার পরেও যখন কথা শোনে না, সেই জায়গা থেকে আমাকেও তো কিছু করতে হয়, তাই না?’

সর্বমিত্র চাকমা

সবশেষ আজ সোমবার পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে সর্বমিত্র চাকমা লিখেছেন, ‘আমার ভাবনা চিন্তায় স্রেফ (শুধু) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা। আমি বিভিন্ন জায়গায় হাত দিয়েছি, একা। চেষ্টা করেছি (সমস্যা) সমাধানের, নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়েও। কিন্তু, যত যা–ই হোক, আইন তো আইনই। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আইনের ঊর্ধ্বেও যেতে হয়েছে পরিস্থিতি মোকাবিলায়-নিরাপত্তা বিধানে, যা আমার ব্যক্তিগত জীবন, মানসিক অবস্থা বিষিয়ে তুলেছে। আমার আর কন্টিনিউ (অব্যাহত) করার সক্ষমতা নেই। আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারও প্রতি অভিমানবশত বা প্ররোচিত হয়ে এ সিদ্ধান্ত নিইনি। কাজ করা যেখানে কঠিন, অসম্ভব, সেখানে পদ ধরে রাখার কোনো মানে নেই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ বলেন, খেলার মাঠে চুরিসহ কিছু ঘটনা নিয়ে মৌখিক অভিযোগ এসেছে। সাধ্যের মধ্যে তা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। এটাকে কারণ দেখিয়ে শিশুদের হেনস্তা করার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান জানতে চাইলে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ আজ প্রথম আলোকে বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বমিত্র চাকমাকে আত্মপক্ষ সমর্থন করে জবাব দিতে বলা হয়েছে। তাঁর জবাব শোনার পর কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি বলেন, শিশুদের এভাবে কান ধরে ওঠবস করানো অনৈতিক ও অমানবিক কাজ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক–স্টাফদের সন্তানেরাও খেলতে যায়। কোনো আচরণ পছন্দ না হলে তাদের চলে যেতে বলতে পারতেন তিনি, কিন্তু এভাবে অপদস্থ করতে পারেন না। এক প্রশ্নের জবাবে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ বলেন, খেলার মাঠে চুরিসহ কিছু ঘটনা নিয়ে মৌখিক অভিযোগ এসেছে। সাধ্যের মধ্যে তা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। এটাকে কারণ দেখিয়ে শিশুদের হেনস্তা করার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে কান ধরে ওঠবস করাচ্ছেন ডাকসু নেতা সর্বমিত্র চাকমা। আজ সোমবার এমন একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে

‘এই শাস্তি অবৈধ, অমানবিক’

শিশুদের শাস্তি দেওয়াকে অবৈধ উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন প্রথম আলোকে বলেন, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে অনুস্বাক্ষরকারী দেশ বাংলাদেশ। শিশু অধিকার প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তিতেও বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষরকারী। অর্থাৎ শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে শক্ত অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। শিশুর শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে, যেটি পরে নীতিমালা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রেক্ষাপটে এই নীতিমালা হলেও এটা এখন সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই নীতিমালার আলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য তা মেনে চলার বাধ্যবাধকতা আছে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে অবৈধ শাস্তি দেওয়ার ঘটনা ঘটলে সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই এর দায়দায়িত্ব নিতে হবে।

তাসলিমা ইয়াসমীন আরও বলেন, বিচারবহির্ভূত শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার কারও নেই। যদি কেউ মনে করেন, এখানে নিয়মশৃঙ্খলা আরোপের প্রয়োজন আছে, তাও তিনি সালিশ করে অনিয়মের সমাধান করতে পারেন না, কোনো শাস্তি আরোপ করতে পারেন না। এটা অবৈধ। শিশু অধিকার অনেক বড় একটা বিষয়। ওরা শিশু বলে কেউ যা খুশি তা করতে পারবে না। শৃঙ্খলার নামে যে কেউ কান ধরে ওঠবস করতে, চড়থাপ্পড় দিতে পারে না। এটা অমর্যাদাকর, অমানবিক ও অবৈধ। তিনি আরও বলেন, শিশু আইন ২০১৩ এ সংস্কার আনা প্রয়োজন। যেমন ওই আইনের ৭০ ধারায় যার হেফাজতে শিশু তার মাধ্যমে শিশু দুর্ভোগ পোহালে অপরাধ বলা হয়েছে। এটা আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে দণ্ডবিধি ১৮৬০ এ আরও সংস্কার আনা প্রয়োজন।