আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের হার্ডড্রাইভ বদলের ঘটনা ঘটেছে: প্রসিকিউটর

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের কক্ষে একজন আসামির স্ত্রী ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন বলে আরেকজন প্রসিকিউটরের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। এখন তথ্যপ্রযুক্তিতে পারদর্শী অপর একজন প্রসিকিউটর বলছেন, ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভির ফুটেজ যেসব হার্ডড্রাইভে সংরক্ষিত ছিল, সেখানে পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের হার্ডড্রাইভ পরিবর্তনের ঘটনার কথা সাংবাদিকদের বলেছেন প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে আজ বুধবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আমি মেম্বার নই। তবে আমি আদিষ্ট হয়ে জানতে পেরেছি যে সিসলকগুলোতে যে হার্ডড্রাইভগুলো থাকার কথা ছিল, পুরোনো–নতুন কিছু হার্ডড্রাইভ সংযোজিত–বিয়োজিত হয়েছে। এটা তদন্তাধীন বিষয়। তো এটা আমরা ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটিকে অবহিত করেছি। ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি থেকে বাকি ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা হবে।’

প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, হার্ডড্রাইভ রিপ্লেসের (প্রতিস্থাপন বা বদলানো) ঘটনা ঘটেছে। এটা সিসলক ও রেজিস্ট্রারে দেখেছেন।

ট্রাইব্যুনালের একাধিক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি বর্তমানে কাজ করছে।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের কক্ষে একজন আসামির স্ত্রীর ভারী ব্যাগ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলেন প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। সেখানে তিনি বলেন, ‘গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলার আসামি আফজালের (গণ–অভ্যুত্থানের সময় আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলার আসামি পুলিশের সাবেক উপপরিদর্শক শেখ আবজালুল হক) বউ সন্ধ্যার দিকে ভারী ব্যাগ নিয়ে তামিমের (প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম) রুমে প্রবেশ করে। বিষয়টি আমরা দেখার পরে সঙ্গে সঙ্গে তাজুল ইসলামের রুমে গিয়ে তাঁকে জানাই। এ ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, বরং উল্টো আমাদের বকাঝকা করেন। তামীম তখন সবার সামনে স্বীকার গিয়েছিল, হ্যাঁ আফজালের বউ তার রুমে এসেছিল। চিফ প্রসিকিউটর শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন আসামির বউ কেন তার রুমে গিয়েছিল। শুধু এই জিজ্ঞাসা করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে সেই আফজালকে রাজসাক্ষী করা হলো। চূড়ান্ত বিচারে তাকে খালাস দেওয়া হলো।’

এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা চেয়েছিলেন তৎকালীন প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার। এ বিষয়ে গত ১০ মার্চ প্রথম আলো ও নেত্র নিউজ যৌথভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেদিনই ওই ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেছিল চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়।

ট্রাইব্যুনালের একাধিক সূত্র জানায়, গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর আবজালুল হকের স্ত্রী একটি ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ারের কক্ষে গিয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হতে সে সময় প্রসিকিউটরদের কেউ কেউ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে গিয়ে ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ চান। তবে সে সময় তাঁরা ওই ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার করতে পারেননি।

প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম

আবজালুলের স্ত্রী গাজী মোনাওয়ারের কক্ষে যাওয়ার ২৫ দিনের মাথায় ১৩ অক্টোবর রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে হার্ডডিস্ক পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের একটি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর চতুর্থ এনভিআরের হার্ডডিস্ক নষ্ট/হ্যাকড হওয়ার কারণে দ্রুতই সাপ্লাইয়ার বরুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে রেজিস্ট্রারের অনুমতি নিয়ে ভালো হার্ডডিস্ক এনে লাগানো হয়।

এ বিষয়ে আজ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার দপ্তর প্রথম আলোকে জানিয়েছে, ট্রাইব্যুনালের সীমান্ত প্রাচীরের সিসিটিভির ফুটেজ হার্ডডিস্কে সংরক্ষিত হচ্ছিল না। সে কারণে ওই হার্ডডিস্ক পরিবর্তন করে নতুন আরেকটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের হার্ডডিস্কগুলো ২১ দিন পর্যন্ত ফুটেজ সংরক্ষণ করতে পারে।

প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা ট্রাইব্যুনালের হার্ডড্রাইভ পরিবর্তনের কথা বলার পর আজ সন্ধ্যায় এ বিষয়ে কথা বলেছেন প্রসিকিউটর তামীম। ট্রাইব্যুনালে কর্মরত সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তিনি লিখেছেন, ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের কোনো ফুটেজ গায়েব হয়নি।

প্রসিকিউটর তামীম আরও লিখেছেন, ‘ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভি ফুটেজ থাকা না থাকার বিষয়ে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি এখনো কাজ শুরু করেনি। কমিটির পক্ষ থেকে প্রসিকিউটর জোহাকেও এ বিষয়ে কোনো দায়িত্বও দেওয়া হয়নি। তিনিও এ বিষয়ে কমিটিকে কিছু জানাননি। অতএব সিসিটিভি ফুটেজ থাকা না থাকার বিষয়ে দেওয়া বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত। অনুসন্ধান চলাকালে এ ধরনের বক্তব্য অনভিপ্রেত।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম আজ রাতে প্রথম আলোকে বলেন, তানভীর জোহা কেন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর মতো করে কথা বলেছেন, সেটা তিনি জানেন না। হার্ডডিস্ক পরিবর্তন হতে পারে আবার না–ও হতে পারে। এটার তদন্ত হচ্ছে।