রাজধানীর আরামবাগের এজিবি কলোনির মুখের সড়কে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির ছাগল
রাজধানীর আরামবাগের এজিবি কলোনির মুখের সড়কে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির ছাগল

ছাগল কিনলেই হাজার টাকা ‘চাঁদা’, ভাগ পাওয়ার দাবি নাকচ পুলিশের

রাজধানীর আরামবাগের এজিবি কলোনির মুখের সড়ক। আজ বুধবার, ঘড়িতে তখন বেলা ১১টা। আশপাশজুড়ে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির জন্য ছাগল। স্থানীয় মানুষজন আসছেন, দেখেশুনে ছাগল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। একটু এগিয়ে বটতলায় মানুষের জটলা। ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি ছাগল কিনেছেন। তাঁর সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছেন ২৫-২৬ বছর বয়সী এক তরুণ।

এগিয়ে গেলে কানে এল, ওই তরুণ বলছেন, ‘এখন যে বড় বড় কথা বলেন...আওয়ামী লীগের আমলে কিছু বলেন নাই। টাকা তখনো নেওয়া হতো, এখনো নেওয়া হচ্ছে।’

জবাবে প্রবীণ ওই ব্যক্তি বললেন, ‘আওয়ামী লীগকে তো এ জন্য দেশছাড়া করা হয়েছে। তাদের পরিণতি কী হয়েছে, সেটি তোমরা ভুলে গেছ নাকি? চাঁদাবাজি, ধান্দাবাজির জন্যই তো ওদের তাড়ানো হয়েছে।’

বোঝা গেল, কোরবানির জন্য ছাগল কিনতে আসা ওই প্রবীণের কাছে ‘চাঁদা’ চেয়েছেন তরুণটি। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় দুজনের এই বচসা। তর্কের এক পর্যায়ে ছাগলটি বিক্রেতার কাছে ফেরত দিলেন ওই প্রবীণ। যেতে যেতে তিনি বললেন, ‘গত বছর এখান থেকে ছাগল কিনেছি। কেউ হাসিলের নামে চাঁদা নিল না। এখনো দিব না।’

পবিত্র ঈদুল আজহার আগে প্রতিবছরই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে, অলিগলিতে ছাগল বিক্রি করতে দেখা যায়। এগুলো আনুষ্ঠানিক পশুর হাট নয়। ছোট পরিসরে স্থানীয়দের কাছে ছাগল বিক্রি করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এভাবে কোরবানির পশু বিক্রিতে কোনো ইজারা দেওয়া হয় না। এরপরও হাসিলের নামে রসিদ কেটে আরামবাগের এখানে একেকটি ছাগলে এক হাজার টাকা করে চাঁদা নিতে দেখা গেল।

শান্তিনগর থেকে রহমান নামের আরেক প্রবীণ ব্যক্তি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ছাগল কিনতে আসেন। ২৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে একটি ছাগল কেনেন তাঁরা। তাঁদের কাছেও শুরুতে ১ হাজার ১০০ টাকা ‘ইজারা ফি’ চাইলেন কয়েকজন তরুণ। পরে ১ হাজার টাকার একটি রসিদ কেটে দেওয়া হয়।

রসিদ দেখে রহমান প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, ‘এখানে ইজারা নেই, কেন টাকা দেব...আমরা কোনো টাকা দেব না।’ জবাবে মাহবুবুর রহমান নামের এক তরুণের সাফ জবাব, ‘টাকা ছাড়া ছাগল নিয়ে যেতে দেওয়া হবে না।’

ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে, ইজারাদারের নাম না থাকা রসিদের ছবি তুলতে গেলে বারবার এ প্রতিবেদককে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন সেখানে থাকা তরুণেরা। তর্ক করেন, একপর্যায়ে তরুণদের একজন এ প্রতিবেদকের দিকে মারমুখী হয়ে আসেন।

কিসের টাকা নিচ্ছেন, এতে ইজারাদারের অনুমতি আছে কি না—এমন প্রশ্নে সবুজ নামের একজন বললেন, ‘এখানে কোনো ইজারা নেই। প্রতিবছরই আমরা এলাকার পোলাপান মিলে কিছু টাকাপয়সা নিই। আমরা তো কাউকে জোর করি না। যাঁরা নিচ্ছেন, সবাই এখানকার স্থানীয়।’

হাসিলের নামে এমন রসিদ দিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে ‘চাঁদা’ নেওয়া হচ্ছে

সবুজ দাবি করেন, তাঁরা যে টাকা তোলেন, সেটার ভাগের একটা অংশ পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে যায়। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনে একটা খরচ যায়। তাঁদেরও ঈদের একটা খরচ আছে। আমরা এখানে পাই বলে, তারা আমাদের থেকে নেয়। মনে করেন, আমি যদি কিছু না পাই, আপনাকে কী দেব? পাই বলেই দিই।’

সবুজের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কারা এ বিষয়টি জানেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা অনেকেই জানে।’

‘চাঁদাবাজির’ বিষয়টি নিয়ে কথা হয় মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওখানে রাস্তা বন্ধ করে পশু বিক্রির খবর শুনেছি। আমরা বিষয়টি দেখছি। কিন্তু পুলিশ-প্রশাসন টাকার ভাগ পায়, এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অনুমতি আমরা দিইনি। পশুর হাটের বাইরে আমাদের কোনো ইজারাদারও নেই। যারা এ ধরনের কথা বলেছে, তারা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলেছে।’