বাঁ থেকে মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ , নাজিবুর রহমান, সালাহউদ্দিন আহমদ ও হাফিজ উদ্দিন আহমদ
বাঁ থেকে মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ , নাজিবুর রহমান, সালাহউদ্দিন আহমদ ও  হাফিজ উদ্দিন আহমদ

পবিত্র কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে সংসদে বিতর্ক

পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে।

আজ বুধবার ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আলোচনায় বিএনপির সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করে বিরোধী দলকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের শোকর করার কথা বলেন। এর জেরে সংসদে অনির্ধারিত বিতর্ক হয়।

বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর একাধিক সদস্য প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, বিএনপির সংসদ সদস্য পবিত্র কোরআনের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করেছেন।

বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী দলের মিছিলের সমালোচনা করে মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ বলেন, ‘আমাদের ডান পাশের লোক, ডান পাশের বন্ধুরা কেন সেদিন মিছিল করেছিল জানতে পারি নাই। মাননীয় স্পিকার, আমাদের কাছে এসে, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে, আমাদের মাননীয় মন্ত্রীদের কাছে বাজেট চাইবে, বরাদ্দ চাইবে। কিন্তু রাস্তায় যেয়ে মিছিল করবে।’

এ সময় মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ পবিত্র কোরআনের সুরা ইবরাহিমের সাত নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করেন, যে আয়াতে আল্লাহর শোকর করলে আল্লাহর নেয়ামত বাড়িয়ে দেওয়া এবং অকৃতজ্ঞ হলে কঠিন শাস্তির কথা বলা আছে।

আয়াতটি তিলাওয়াত করে বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘শোকর করতে হবে জীবনের। শোকর করতে হবে বরাদ্দের। শোকর করতে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। শোকর করতে হবে আমাদের মাননীয় মন্ত্রীদের। তারা শোকর করে না, কিন্তু অস্বীকার করে। সেই জন্য তাদের...কঠিন আজাব তাদের সম্মুখীন করতে হবে।’

বিএনপির সংসদ সদস্যের বক্তব্যের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়ান জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, কোরআন, হাদিসের আয়াত ঠাট্টাবিদ্রূপের বিষয় নয়। এটা নিয়ে ঠাট্টাবিদ্রূপ করা হলে তা হবে খুবই দুঃখজনক।

বিএনপির সংসদ সদস্য ওই আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করেছেন উল্লেখ করে নাজিবুর রহমান বলেন, ‘ওনাদের (সরকারি দল) প্রশংসা করলে ওনারা আরও বাড়ায় দিবেন। আর ওনাদের ইয়ে...না করলে ওনারা আমাদেরকে পিটাবেন নাকি? এ ধরনের বোঝাতে চাচ্ছেন? এটা তো আসলে ভুল ব্যাখ্যা হচ্ছে। এটা খুব ভুলভাল বিষয়।’

নাজিবুর রহমান বলেন, এ ব্যাপারে হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর কঠোর সতর্ক বাণী এসেছে, এগুলো ঠাট্টাবিদ্রূপ করার বিষয় না। এটি খুব সতর্কভাবে নিতে হবে। কোরআন, হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা, অবমাননাকর কিছু কোনোভাবেই করা যাবে না। এ বিষয়ে তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আলমগীর মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ একজন পুরোনো সংসদ সদস্য। মনে হয় না কোরআন–হাদিস নিয়ে তিনি কোনো ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করতে পারেন। তারপরও পরীক্ষা করে দেখা হবে। কোরআন–হাদিসের কোনো ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হলে, তা এক্সপাঞ্জ করা হবে।

স্পিকার বলেন, ‘কোরআন–হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা বাংলাদেশ একটি মুসলিমপ্রধান দেশ, এ দেশে কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না।’ সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে স্পিকারের এই বক্তব্যকে সমর্থন জানান।

এ পর্যায়ে ফ্লোর নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, তিনি বিতর্কে যাবেন না। কিন্তু বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাতে ভুল বার্তা যাবে যে বিএনপির একজন সংসদ সদস্য কোরআনের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ একজন মাওলানা। তিনি প্রসঙ্গক্রমে কোরআনের আয়াতটি উল্লেখ করেছেন মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করি আল্লাহ আমাদেরকে আরও বাড়িয়ে দেবেন।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে অপব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশের এই সংসদে কোনো সংসদ সদস্যের বক্তব্য যদি ভুলক্রমেও ইসলামের প্রতি অবমাননামূলক হয়, তাঁরা সেটার নিন্দা করবেন। কিন্তু এটাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।

এরপরও বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানাতে থাকলে স্পিকার বলেন, ‘আমি তো বললাম যে আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ তিনি কোনো ব্যঙ্গাত্মক কথা এখানে বলবেন না। তিনি একজন প্রবীণ সংসদ সদস্য। তারপরও তিনি যে মাদ্রাসার ছাত্র, সেটাও বলা হলো।’

বিরোধী দলের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই হয়তো ওনাদের চেয়ে বেশি জানেন। অনেক আলেম–ওলামা আপনাদের মধ্যে থাকতে পারে। এটা নিয়ে বিতর্ক হোক, এটা চাই না। আমরা সবাই মুসলমান। এখানে অধিকাংশই মুসলমান। এই দেশটারও ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলমান। সুতরাং এগুলো নিয়ে সংসদে কোনো রকম বিরূপ আলোচনা হোক, এসব স্পর্শকাতর বিষয়, এটা তো চাই না।’

এ সময় বিরোধী দলের একাধিক সদস্য বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে দাঁড়িয়ে যান। তাঁদের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, ‘আপনাদের সিনিয়র নেতারা সামনে দাঁড়িয়েছেন। সংসদে প্রথম বেঞ্চে যখন সিনিয়র নেতারা দাঁড়ান, পেছন দিকে আপনারা বসে যাবেন।’

এ পর্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর মুজিবুর রহমানকে ফ্লোর দিয়ে স্পিকার তাঁকে বিতর্ক হয়, এমন কোনো কিছু না তোলার আহ্বান জানান।

এরপর মুজিবুর রহমান পবিত্র কোরআনের ওই আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ‘যারা আল্লাহর এই দুনিয়ায় আল্লাহর নিয়ামত ভোগ করছে, আমি কথা বলছি, এটা আল্লাহ আমাকে একটা নিয়ামত দিয়েছেন। অতএব আমার মুখ দিয়ে আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো কথা আমি বলতে পারি না। আমাকে যে শক্তি আল্লাহ দিয়েছেন, এই শক্তি দিয়ে আল্লাহর বিধিবিধানের পক্ষে আমাকে কথা বলতে হবে।’

সরকারি দলের বক্তব্যের জবাবে এই সংসদ সদস্য বলেন, বিরোধী দলকে বাজেটের প্রশংসা করতে হবে, নাহলে আজাব আসবে, সরকারি দল বিষয়টিকে সেদিকে নিয়ে গেছে। এটি সঠিক নয়।

স্পিকারের উদ্দেশে মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আপনি যদি প্রয়োজন মনে করেন, একজন আলেমের কাছে যেয়ে বলবেন, কোনো মানুষের অবদানের কথা এখানে বলা হয়নি।’

তখন স্পিকার বলেন, ‘এখানে (বিরোধী দলে) মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত আলেম অনেক বেশি আছে, এই দিকের (সরকারি দল) চাইতে। সেটা তো আমরা স্বীকার করে নিয়েছি। তবে আমার এই ট্রেজারি বেঞ্জেও দুই–একজন আছে।’

এরপর পয়েন্ট অব অর্ডারে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বলেন, সংসদ সদস্য মাহফুজ উল্লাহ একজন আলেম। তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেছেন কি না, তা স্পিকার জানতে চাইতে পারেন। তিনি এই আলোচনা এখানেই শেষ করার আহ্বান জানান।

পরে আবার বাজেট আলোচনায় ফিরে যান স্পিকার।