সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া ৩১ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একটি দোকানের বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীকে পেছন থেকে লাকড়ির টুকরা দিয়ে পেটাচ্ছেন এক ব্যক্তি। পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কিছু পণ্য। মারধরের একপর্যায়ে ভুক্তভোগী নারী বেঞ্চ থেকে নেমে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে ওই ব্যক্তি পেছন থেকে তাঁকে মারতে থাকেন। একপর্যায়ে নারীটি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে বাঁচেন।
ভিডিওটি প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, ‘এই মহিলা কাঁচা তরকারির দোকান করে। বিএনপি নেতা বাকি চেয়েছিল, বাকি না দেওয়ায় নির্মম নির্যাতন করে দোকান থেকে বের করে দিল। এটাই কি ওদের চরিত্র?’
একই ভিডিওর অপর একটি পোস্টে ক্যাপশনে বলা হয়েছে, ‘বাকি না দেওয়ায় নারী সবজি বিক্রেতাকে নির্মম নির্যাতন, দোকান থেকে বের করে দিল বিএনপি নেতা।’
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি ফেসবুকের ৫৫টির বেশি পেজ, গ্রুপ ও প্রোফাইল থেকে প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির নেতার নির্যাতনের দাবি করে ভিডিওটি প্রচারকারী অধিকাংশ অ্যাকাউন্ট আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
তবে যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি বিএনপির কোনো নেতার হাতে নারী সবজি বিক্রেতা নির্যাতনের ঘটনার নয়। প্রকৃতপক্ষে, ৭ আগস্ট নোয়াখালী সদর উপজেলার হানিফ চেয়ারম্যান বাজারে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে মারধরের ভিডিও। সেখানে নির্যাতনকারী হিসেবে বিএনপির নেতার পরিচয় যুক্ত করে প্রচার করা হচ্ছে।
ভিডিওটির শুরুতে একটি সাইনবোর্ড দেখা যায়। সেখানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল–জেএসডির নামের নিচে ‘হানিফ চেয়ারম্যান বাজার, সদর, নোয়াখালী’ লেখা রয়েছে। গুগল ম্যাপে অনুসন্ধান করে ভিডিওর স্থানটি নোয়াখালী সদর উপজেলার এওজবালিয়া ইউনিয়নের হানিফ চেয়ারম্যান বাজার বা হানিফ রোড হিসেবে পাওয়া গেছে।
লিংক: এখানে
ঘটনার বিষয়টি জানতে ভিডিওতে নারীকে মারধরকারী ব্যক্তির নাম আবুল খায়ের বলে জানা যায়। তিনি ওই বাজারের একজন চা-দোকানদার। আবুল খায়ের প্রথম আলোর নোয়াখালীর নিজস্ব প্রতিবেদক মাহবুবুর রহমানকে জানান, ওই নারী মানসিকভাবে অসুস্থ, ঘটনার আগে প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে হানিফ চেয়ারম্যান বাজার এলাকায় ঘোরাফেরা করছিলেন। তিনি প্রায়ই তাঁর দোকানে এসে খাবার চাইতেন এবং তিনি তাঁকে খাবার দিতেন।
আবুল খায়েরের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছিল। আনুমানিক বেলা ১১টার দিকে ওই নারী হাতে একটি লাকড়ির টুকরা নিয়ে তাঁর দোকানের চায়ের ফ্লাস্কে আঘাত করেন ও দোকানের বিভিন্ন জিনিসপত্র রাস্তায় ছুড়ে ফেলতে থাকেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি দোকান থেকে বেরিয়ে ওই নারীর হাতে থাকা লাকড়ি দিয়েই তাঁকে মারধর করেন। পরে নিজের আচরণের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ওই নারীর কাছে এবং স্থানীয় মানুষের কাছে ক্ষমা চান।
আবুল খায়ের আরও জানান, তিনি পেশায় ক্ষুদ্র চা-দোকানদার হলেও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং সদর উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। অর্থাৎ ঘটনাটির সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
বাজারের ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনও ঘটনার বিষয়ে প্রথম আলোকে একই ধরনের তথ্য দেন। তাঁর ভাষ্য, বৃষ্টির মধ্যে ওই নারী হাতে লাকড়ির টুকরা নিয়ে আবুল খায়েরের দোকানে গিয়ে বিভিন্ন জিনিসে আঘাত করতে থাকেন। তাঁকে নিষেধ করেও থামানো যায়নি। একপর্যায়ে আবুল খায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে ওই নারীকে কয়েকবার লাকড়ি দিয়ে আঘাত করেন। পরে নারীটি সেখান থেকে চলে যান।
বাজারসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ওই নারী মানসিকভাবে অসুস্থ হলেও তাঁকে এভাবে মারধর করা ঠিক হয়নি। স্থানীয়রাও এ বিষয়ে আবুল খায়েরকে বকাঝকা করেছেন। পরে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়েছেন। তবে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে একটি রাজনৈতিক দলের নাম জুড়ে দেওয়া ঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ৩১ সেকেন্ডের ভিডিওটির সঙ্গে মিল থাকা একই বিষয়ের ৩৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিওও পাওয়া গেছে। ৭ আগস্ট থেকে প্রচারিত ওই ভিডিওতে দেখা যায়, আবুল খায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে টেবিলের ওপর থাকা একটি লাকড়ির টুকরা হাতে নেন এবং উত্তেজিত অবস্থায় বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে ওই নারীকে মারধর করেন। ভিডিওটির এই অংশটি ভাইরাল হওয়া সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে দেখা যায়নি।
লিংক: এখানে
পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির বিষয়ে আবুল খায়েরকে নিজের আচরণের জন্য ক্ষমা চাইতেও দেখা যায়।
লিংক: এখানে
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের ছোট ভাইকে ধানমন্ডিতে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে—এমন দাবিসংবলিত ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, অস্ত্রসহ আটক যুবকটি সারজিস আলমের ভাই নন। এমনকি আটকের ঘটনাটিও রাজধানীর ধানমন্ডিতে ঘটেনি। নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জে আবদুর রহমান ওরফে রাহিম নামের এক যুবককে অস্ত্রসহ আটকের সময় ধারণ করা ছবি ও ভিডিওকে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। প্রথম আলোয় গত ৮ জুন প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে একই ছবি পাওয়া যায়। সংবাদে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ছবিটির হুবহু মিল রয়েছে।
লিংক: এখানে
‘আওয়ামী লীগ নেতাকে না পেয়ে পুলিশের সামনে বিএনপি নেতাদের নির্যাতনের শিকার তাঁর স্ত্রী’—এমন দাবিতে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।
যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি কোনো আওয়ামী লীগ নেতাকে না পেয়ে তাঁর স্ত্রীকে বিএনপি নেতাদের নির্যাতনের ঘটনার নয়। কক্সবাজারের চকরিয়ায় অপহরণের শিকার এক কিশোরীকে উদ্ধারে গিয়ে পুলিশের মারধরের ভিডিওকে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ‘চকরিয়ায় কিশোরীকে উদ্ধার করতে গিয়ে মারধর, পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার’ শিরোনামে প্রথম আলোসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
লিংক: এখানে
প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কক্সবাজারের চকরিয়ায় অপহরণের শিকার এক কিশোরীকে উদ্ধারের সময় অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও মারধরের অভিযোগ ওঠায় পরবর্তী সময়ে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আরকানুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়।
‘সন্তানের সামনে বাবাকে খুন করলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি নেতা মনির’—এমন দাবিতে একটি ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে।
যাচাই করে দেখা যায়, প্রচারিত ভিডিওটি বাংলাদেশের নয়। ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি গত বছরের জুলাইয়ে ভারতের বিহারে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ঘটে। সেখানে এক ব্যক্তি তাঁর ভাই ও ভাতিজার হামলার শিকার হন।
লিংক: এখানে