খুশবু। ৯ মাস বয়সে হাম ও হাম–পরবর্তী জটিলতায় গত ৩১ মে রাতে মারা যায় সে।
খুশবু। ৯ মাস বয়সে হাম ও হাম–পরবর্তী জটিলতায় গত ৩১ মে রাতে মারা যায় সে।

মাকে খুনের অভিযোগে বাবা কারাগারে, ছোট খুশবুর লাশ মর্গে

স্ত্রীকে খুনের অভিযোগে স্বামী কারাগারে। এই দম্পতির ৪৫ দিন বয়সী মেয়ের নামটা তখন পর্যন্ত রাখা হয়নি। ওকে দেখভালের জন্য কোনো আত্মীয়স্বজন পাওয়া যায়নি। আদালতের আদেশে মা–হারা শিশুটির ঠাঁই হয়েছিল রাজধানীর আজিমপুরে সরকারি ছোটমণি নিবাসে। নাম রাখা হয় খুশবু। সেই খুশবু ৯ মাস বয়সে হাম ও হাম–পরবর্তী জটিলতায় মারা গেছে গত ৩১ মে রাতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে।

খুন হওয়া মা তাজ নাহারের আরেক মেয়ে মারিয়ার বয়স সাত বছর। আদালতের আদেশে তাকে পাঠানো হয়েছিল তেজগাঁওয়ে সরকারি শিশু পরিবারে।

খুশবুর মরদেহ রাখা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। আবারও আদালতের আদেশের জন্য ছোটমণি নিবাসের পক্ষ থেকে আদালতে লিখিত আবেদন করা হয়। আদালতের মৌখিক আদেশে লাশের সুরতহাল ও থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। আগামীকাল মঙ্গলবার রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ–সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় লাশ দাফনের পর কবরটি চিহ্নিত করে রাখার জন্যও আদালত আদেশ দিয়েছেন বলে জানান ছোটমণি নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক মোছা. জুবলী বেগম। তবে বাবা কারাগার থেকে বের হয়ে মেয়ের মরদেহ দেখার অনুমতি পাননি। একমাত্র বোন মারিয়াও খুশবুকে দেখতে আসবে কি না, তা–ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছোটমণি নিবাসগুলোতে পিতৃ-মাতৃ পরিচয়হীন নবজাতক থেকে সাত বছর বয়সী পরিত্যক্ত বা পাচার থেকে উদ্ধার করা শিশু অথবা আদালতের আদেশে পাঠানো শিশুদের লালন-পালন করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও বরিশালে একটি করে মোট ছয়টি ছোটমণি নিবাস রয়েছে। প্রতিটির আসনসংখ্যা ১০০।

গত বছরের ৩১ জুলাই চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, ঢাকা এক আদেশে বলেছেন, মৃত তাজ নাহারের দুই কন্যাকে প্রবেশন অফিসারের জিম্মায় দেওয়ার জন্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবেদন করেছেন। তাজ নাহারের দুই মেয়ের সার্বিক কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খুশবুকে ছোটমণি নিবাস এবং মারিয়াকে শিশু পরিবারে পাঠানোর পর প্রবেশন কর্মকর্তা বিষয়টি তত্ত্বাবধান করবেন বলে আদালত আদেশ দেন।

খুশবুকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল গত ১০ মে

খুশবুকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয় গত ১০ মে। হামের জন্য বিশেষ আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায় ৩১ মে রাতে। মৃত্যুসনদে হাম ও হাম–পরবর্তী নানা জটিলতায় খুশবু মারা গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সনদে বাবার নামের জায়গায় ছোটমণি নিবাসের নাম লেখা।

নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক জুবলী বেগম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা আদালতের আদেশে খুশবুকে ৪৫ দিন বয়সে নিবাসে পেয়েছিলেন। পুলিশ তখন জানিয়েছিল, এটি কেরানীগঞ্জ থানার একটি মামলা, স্বামী স্ত্রীকে খুন করেছেন। এর বাইরে মামলার কোনো নথি নিবাসে পাঠানো হয়নি। খুশবুর জ্বর-কাশিসহ অন্যান্য জটিলতা দেখা দিলে তাকে প্রথমে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখান থেকে শিশু হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও বরিশালে একটি করে মোট ছয়টি ছোটমণি নিবাস রয়েছে। প্রতিটির আসনসংখ্যা ১০০।

জুবলী বেগম বলেন, খুশবু মারা যাওয়ার পর আদালতে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়। বাবা কারাগার থেকে বের হয়ে মেয়েকে দেখবেন কি না, এ বিষয়টিও জানতে চাওয়া হয়। আবেদনটি বিবেচনায় নিয়ে আদালতের পক্ষ থেকে লাশের সুরতহাল করা, থানায় জিডি করা এবং কবর চিহ্নিত করে রাখতে বলা হয়েছে।

তিনি জানান, খুশবুসহ ছোটমণি নিবাসের মোট তিন শিশু এ পর্যন্ত হাম ও হাম–পরবর্তী নানা জটিলতায় মারা গেছে। এর আগে মারা যাওয়া আরিশার বয়স হয়েছিল এক বছরের একটু বেশি। আর মেহেদির বয়স হয়েছিল ৫ মাস। আরও তিন শিশু এখনো দুটি হাসপাতালে রয়েছে। তাদের দুজন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া অন্য কয়েকজন হাম ও পক্স হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে নিবাসে ফিরেছে।