ঢাকার কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পথে মেট্রোরেল নির্মাণে ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া আবার শুরু করতে চাইছে বর্তমান সরকার। অনেক বেশি ব্যয় প্রস্তাব করায় অন্তর্বর্তী সরকার ঠিকাদার নিয়োগের এই প্রক্রিয়া বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
নতুন পথটিতে মেট্রোরেল নির্মাণে জাপানি ঠিকাদারেরা কিলোমিটারপ্রতি যে টাকা চাইছে, তা সরকারের প্রাক্কলনের চেয়ে প্রায় ৯৭ শতাংশ বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঠিকাদারদের ব্যয় প্রস্তাব ধরে বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছিল, প্রতি কিলোমিটারে খরচ দাঁড়াবে প্রায় ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। সরকার ধরেছিল, ব্যয় হবে ১ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে ঢাকার উত্তরা থেকে মতিঝিল পথে মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকার মতো।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মেট্রোরেল পরিচালনাকারী ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন ফারুক আহমেদ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেট্রোরেল ও বড় অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। তিনি বিভিন্ন দেশের ব্যয় বিশ্লেষণ করে ঢাকার নতুন মেট্রোরেলের প্রস্তাবিত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
জাইকা জানায়, চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিল করে আবার দরপত্র আহ্বান করা তাদের ঋণচুক্তির শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই পরিস্থিতিতে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ আটকে যায়।
ডিএমটিসিএল তখন সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকাকে চিঠি দিয়ে জানায়, ঠিকাদারের দর গ্রহণ করা যাচ্ছে না। সরকার নতুন করে দরপত্র আহ্বানে আগ্রহী।
যদিও এই প্রকল্পের ঋণদাতা সংস্থা জাইকা তাতে রাজি হয়নি। জাইকা জানায়, চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিল করে আবার দরপত্র আহ্বান করা তাদের ঋণচুক্তির শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই পরিস্থিতিতে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ আটকে যায়।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন আনা হয়। সরিয়ে দেওয়া হয় ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদকেও।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জাইকার প্রতিনিধিরা সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী রবিউল আলমের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর মেট্রোরেলের লাইন-১–এর কাজ এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে জাইকার সঙ্গে আলোচনার নির্দেশনা দেয় সড়ক মন্ত্রণালয়।
সর্বশেষ গত ১০ মার্চ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) জাইকা, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ ও ইআরডির যৌথ বৈঠক হয়। বৈঠক সূত্র জানায়, মেট্রোরেলের কাজের দুটি প্যাকেজে ১৭০ ও ২৫ শতাংশ বাড়তি ব্যয়ের প্রস্তাব অনুমোদন করে ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়ে অনড় থাকে জাইকা। কাজের পরিধি বৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরে সংস্থাটি। এমনকি ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়ার সংবাদ গণমাধ্যমে আসার বিষয়ে আপত্তি জানায় তারা।
কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পথে মেট্রোরেলের লাইনের নাম এমআরটি-১। এটি কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর হয়ে নর্দ্দা ও পূর্বাচল পর্যন্ত যাবে। সব মিলিয়ে দৈর্ঘ্য ৩১ কিলোমিটারের কিছু বেশি। কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত অংশ হবে পাতালপথে। আর নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল অংশ উড়ালপথে।
ইআরডিতে অনুষ্ঠিত বৈঠক সূত্র আরও জানায়, প্রকল্পের কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাতিল করা দুটি প্যাকেজের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মত দেওয়া হয়। তবে সার্বিক প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ আসে।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রকল্পটি নিয়ে মন্ত্রণালয়, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ও জাইকা আলোচনা চালিয়ে যাবে। ব্যয় কমানোর বিষয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হবে। প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়ার তথ্য যাতে বাইরে না যায়, সেটা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত হয়।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ডিএমটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জিয়াউল হক প্রথম আলোকে বলেন, মেট্রোরেল ঢাকার জন্য খুবই দরকারি। সরকার মেট্রোরেল প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে খুবই ইতিবাচক। তিনি ও মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে প্রতি সপ্তাহে বৈঠক করছেন। তিনি বলেন, প্রকল্পের ব্যয় কেন বাড়ছে—এটা জানতে পর্যালোচনা চলছে। খুব শিগগির একটা ধারণা পাবেন তাঁরা। এরপর ব্যয় কমানো যায় কীভাবে, সে বিষয়ে পথ খুঁজবেন।
অবশ্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, এভাবে আলোচনা করে ব্যয় কিছু কমানো সম্ভব। কিন্তু উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে হলে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। জাপানি ঠিকাদারদের বাইরে অন্যরা যাতে দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সেটা আসলে হচ্ছে না।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ডিএমটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, মেট্রোরেল ঢাকার জন্য খুবই দরকারি। সরকার মেট্রোরেল প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে খুবই ইতিবাচক। প্রকল্পের ব্যয় কেন বাড়ছে—এটা জানতে পর্যালোচনা চলছে। খুব শিগগির একটা ধারণা পাবেন তাঁরা। এরপর ব্যয় কমানো যায় কীভাবে, সে বিষয়ে পথ খুঁজবেন।
কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পথে মেট্রোরেলের লাইনের নাম এমআরটি-১। এটি কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর হয়ে নর্দ্দা ও পূর্বাচল পর্যন্ত যাবে। সব মিলিয়ে দৈর্ঘ্য ৩১ কিলোমিটারের কিছু বেশি। কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত অংশ হবে পাতালপথে। আর নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল অংশ উড়ালপথে।
ডিএমটিসিএল সূত্র জানিয়েছে, এই প্রকল্পের কাজ ১২টি অংশে (প্যাকেজ) ভাগ করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। সরকারি প্রাক্কলনে ব্যয় ধরা হয় মোট ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে এখন পর্যন্ত ১২টি প্যাকেজের মধ্যে ৮টিতে ঠিকাদারের প্রস্তাবিত ব্যয় পাওয়া গেছে। এর ওপর ভিত্তি করে ব্যয় বিশ্লেষণ করেছে ডিএমটিসিএল। সংস্থাটির বিশ্লেষণ বলছে, ঠিকাদারেরা গড়ে যে দর চাইছে, তাতে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়াবে ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, ১২টি প্যাকেজের মধ্যে পূর্বাচলে ডিপো উন্নয়নের একটি প্যাকেজের কাজ শেষ পর্যায়ে। আরও দুটি প্যাকেজের ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। ঠিকাদার যে দর প্রস্তাব করেছে, তাতে একটি প্যাকেজের ব্যয় প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ১৭০ শতাংশ বেশি। অন্য প্যাকেজটিতে প্রাক্কলনের চেয়ে ২৫ শতাংশ বাড়তি ব্যয় প্রস্তাব এসেছে। সার্বিকভাবে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি মাত্র ৬ শতাংশ।
এই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাইকা। ইতিমধ্যে দুই কিস্তির ঋণচুক্তি হয়েছে। প্রকল্পের ধীরগতির কারণে এক কিস্তির ঋণ ছাড় হয়নি। অন্য কিস্তির ঋণের সামান্য ছাড় হয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুসারে, আগামী বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ঋণ ছাড়ের মেয়াদ শেষ হবে। ২০২৯ সাল থেকে ঋণ পরিশোধ শুরু হবে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, জাইকার ঋণের শর্ত এমন, যেখানে দর-কষাকষি করে ব্যয় কমানোর সুযোগ কম। যেসব প্যাকেজের দরপত্র প্রাথমিক পর্যায়ে, সেগুলোতে কাজ কমিয়ে কিংবা নকশায় কিছু পরিবর্তন এনে সামান্য কিছু ব্যয় কমানো যাবে। এটাকে প্রকৃত ব্যয় কমানো বলা যায় না।
ঋণের এসব চুক্তি হয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। বর্তমান সরকার এখন বিপাকে পড়েছে। মেট্রোরেল নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা আছে। অন্যদিকে জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন–সহযোগী। তাদের সঙ্গে মেট্রোরেলের ঋণচুক্তি বাতিল করতে গেলে সম্পর্কে প্রভাব পড়তে পারে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার যে দুটি প্যাকেজের ঠিকাদার নিয়োগ আটকে দিয়েছিল, সেগুলোর প্রক্রিয়া চলমান রাখার জন্য তাগিদ দিচ্ছে জাইকা। এ ছাড়া অন্য যেসব প্যাকেজের দরপত্রপ্রক্রিয়া মূল্যায়ন পর্যায়ে আছে, সেগুলোর ব্যয় কীভাবে কমানো যায়, সেই বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে চাইছে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, জাইকার ঋণের শর্ত এমন, যেখানে দর-কষাকষি করে ব্যয় কমানোর সুযোগ কম। যেসব প্যাকেজের দরপত্র প্রাথমিক পর্যায়ে, সেগুলোতে কাজ কমিয়ে কিংবা নকশায় কিছু পরিবর্তন এনে সামান্য কিছু ব্যয় কমানো যাবে। এটাকে প্রকৃত ব্যয় কমানো বলা যায় না।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সূত্র ও বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণের শর্ত এবং দরপত্রপ্রক্রিয়া নিয়েই জাইকার সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের মতভেদ ছিল। নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনায় জাইকার নীতির মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে আলোচনা কিংবা পর্যালোচনা করে প্রকল্পের ব্যয় কমানোর সুযোগ কম।
জাইকার ঋণে এমন শর্ত দেওয়া হয়েছে, যেখানে জাপানি কোম্পানিগুলোই ঠিকাদারি কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকে। এ জন্য দরপত্র প্রতিযোগিতা হয় না। জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা প্রকল্পের প্রায় সব কটিতেই ঠিকাদার এবং পরামর্শক ওই দেশের। কিছু ক্ষেত্রে সহযোগী হিসেবে স্থানীয় বা অন্য দেশের ঠিকাদার ও পরামর্শকেরা কাজ করেন। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা প্রণয়ন, দরপত্র দলিল তৈরি এবং বাস্তবায়নের প্রায় সব পর্যায়ে জাপানিদের আধিক্য থাকে। এ ছাড়া দরপত্র দলিলসহ ক্রয়সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে জাইকার অনুমোদন নিতে হয়।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দরপত্র দলিলে কাজের এমন পদ্ধতি ও প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা জাপানি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। যেমন টানেল বা পাতালপথ নির্মাণ ‘ওয়ান পাস জয়েন্ট’ পদ্ধতিতে করতে হবে বলে এমআরটি-১ প্রকল্পের দরপত্র দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা জাপানি ঠিকাদারের জন্য সুবিধাজনক।
ডিএমটিসিএলের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, শর্তের কারণে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করেও জাপানের বাইরের কোনো ঠিকাদার পাওয়া যায় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘুরেফিরে জাপানি দু-তিনটা ঠিকাদার চূড়ান্ত দরপত্রে অংশ নেয়। তারা যে দর প্রস্তাব করে, সেটিই মেনে নিতে হয়। বিশেষ করে পাতালপথের কাজে জাপানি ঠিকাদারের বাইরে অন্যদের সেভাবে সুযোগই নেই।
বিষয়টি নিয়ে জাইকার বক্তব্য জানতে চাইলে তারা ৭ এপ্রিল লিখিতভাবে প্রথম আলোকে বলেছে, এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ (নর্থ) প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে জনসাধারণের আগ্রহ সম্পর্কে তারা অবগত। এসব গুরুত্বপূর্ণ নগর পরিবহন প্রকল্প এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ ও গঠনমূলক সংলাপ অব্যাহত রয়েছে।
জাইকা উল্লেখ করেছে, প্রকল্পগুলো তাদের ক্রয় নির্দেশিকা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হচ্ছে। নির্দেশিকার একটি ধারা অনুযায়ী, দরপত্র খোলার পর চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা যায় না। এ কারণে নির্দিষ্ট দরপত্রপ্রক্রিয়া নিয়ে তারা মন্তব্য করতে পারছে না। তবে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তথ্য প্রকাশে উৎসাহ দেওয়া হবে।
জাইকা আরও বলেছে, তাদের ঋণসহায়তা বাংলাদেশের টেকসই নগর পরিবহন উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের অংশ। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন ও বিনিময় হার ওঠানামার কারণে অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় বাড়লেও এসব প্রকল্পের গুরুত্ব অপরিবর্তিত রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে কাজ করে যাবে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
এমআরটি লাইন-১–এর মতো জাইকার অর্থায়নে আরেকটি মেট্রোরেল লাইন প্রকল্প চলমান আছে, যার নাম এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)। এটি সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গাবতলী, মিরপুর, গুলশান হয়ে ভাটারায় শেষ হবে। এর মধ্যে হেমায়েতপুর থেকে গাবতলী পর্যন্ত উড়ালপথে হবে। বাকিটা হবে পাতালপথে। এই পথের দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটারের মতো।
লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৯ সালের অক্টোবরে। এর জন্য ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত ৫টি প্যাকেজে ঠিকাদারদের পাওয়া দর প্রস্তাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্যয় দাঁড়াবে ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এই প্রকল্পেও হেমায়েতপুরে ডিপো উন্নয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে। বাকি কাজের ঠিকাদার নিয়োগে বাড়তি ব্যয়ের কারণে এগোয়নি।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, লাইন-৫ (উত্তর) এর বিষয়ে করণীয় নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয়নি। তবে লাইন-১–এর সিদ্ধান্তের ওপরই এটির ভাগ্য নির্ভর করবে।
ঢাকার উত্তরা থেকে মতিঝিল পথের মেট্রোরেলের ঋণদাতাও জাইকা। এই মেট্রোরেলের সম্প্রসারিত অংশ যাবে কমলাপুর পর্যন্ত। পুরো পথের দৈর্ঘ্য ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার। মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের কাজ এখনো চলছে। পুরো পথে ব্যয় হচ্ছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। এই ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন আছে।
মূল সমস্যা হচ্ছে জাপানি ঋণের শর্তের কারণে দরপত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতা হচ্ছে না। দরপত্রে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে পারলে নিশ্চিতভাবে ব্যয় কমে যাবে।বুয়েট পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বড় প্রকল্প বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক
ঠিকাদারের দরপত্র প্রস্তাব অনুযায়ী কাজ দিলে নতুন দুই পথে (লাইন-১ ও লাইন-৫) মোট ব্যয় দাঁড়াবে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ডিএমটিসিএলের পক্ষ থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করে উল্লেখ করা হয়েছে, জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিয়ে শুধু প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ভারতে ব্যয় হয় ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা। ভারতও বিদেশি ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। কিন্তু ঋণে এমন কোনো শর্ত তারা মানে না, যা ঠিকাদার নিয়োগের প্রতিযোগিতা ক্ষুণ্ন করে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বড় প্রকল্প বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মূল সমস্যা হচ্ছে জাপানি ঋণের শর্তের কারণে দরপত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতা হচ্ছে না। দরপত্রে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে পারলে নিশ্চিতভাবে ব্যয় কমে যাবে। তিনি বলেন, এখানে প্রশ্ন দুটি। জাইকা শর্ত শিথিল করে দরপত্রে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেবে কি না? আর যদি সেটা না করে বেশি দামে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সরকার ঋণের বোঝা বাড়াবে কি না?
সামছুল হক আরও বলেন, টাকার মূল্যমান কমে যাওয়া এবং পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি শুধু জাপানি বা কোনো দেশের ঠিকাদারের বিষয় নয়। এটি সবার জন্যই প্রযোজ্য। কার্যকর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যে দর আসবে, সেটাই মেনে নেবে সরকার। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত দরপত্রে তো প্রকৃত দর জানতে পারবে না সরকার।