অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের জীবনে যেন কোনো তাড়া ছিল না। বস্তুগত সম্পদের মোহ তাঁকে টানত না। কিন্তু তিনি যা পেয়েছেন, তা হলো মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। তিনি সেই ভালোবাসাতেই বেঁচে থাকবেন। এটাই তাঁর জীবনের সার্থকতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষক সদ্য প্রয়াত অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানকে এভাবেই স্মরণ করলেন মহান এই শিক্ষকের ছাত্র-ছাত্রী, সহকর্মী ও তাঁর পরিচিতজনেরা। তাঁরা বলেছেন, সাখাওয়াত আলী খান ছিলেন একজন অভিভাবক। প্রকৃত অর্থে একজন লালনকারী। একজন যুক্তিবাদী ও অসাম্প্রদায়িক মানুষ। এমন মানুষকে স্মরণ তাই বড় কাজও বটে।
আজ শুক্রবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে এ স্মরণসভার আয়োজন করে বেসরকারি সংগঠন সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড)।
গণমাধ্যম, পরিবেশ ও আদিবাসী–বিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেড প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৩ সালে। অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের ছাত্ররাই এটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই শুরু থেকে আমৃত্যু প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন সাখাওয়াত আলী খান। এ প্রতিষ্ঠানের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ছাতার মতো, স্মরণসভার শুরুতে সেই কথাই বললেন সেডের সাধারণ সম্পাদক ও অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের ছাত্র ফিলিপ গাইন। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান নানা সময় নানা সমস্যার মধ্যে পড়েছে। শান্তভাবে, দৃঢ়ভাবে সেসব সামলেছেন সাখাওয়াত স্যার। আমি তাঁর ছাত্র ছিলাম। কিন্তু তিনি শুধু আমার নয়, সব শিক্ষার্থীর কাছে ছিলেন পিতৃতুল্য, পরম অভিভাবক।’
গত ৯ মার্চ মারা যান অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান। তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে দেশের মূলধারার প্রথম সারির সংবাদপত্রে পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৭২ সালে তিনি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর ৯ মাস ৪ দিন পূর্ণকালীন শিক্ষকতা করে ২০০৮ সালের ৩০ জুন বিভাগের সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপক পদ থেকে অবসর নিলেও বিভাগের শিক্ষকতার দায়িত্ব ও মায়ার বন্ধন থেকে তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেননি। বিভাগে পাঁচ বছর সুপারনিউমারারি প্রফেসর থাকার পর ‘অনারারি প্রফেসর’ হন।
বর্তমানে সমাজে অন্যকে লালন করার প্রবণতা দুর্বল হয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন অর্থনীতিবিদ ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, প্রয়াত অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান আমৃত্যু এ কাজই করে গেছেন। তাঁর মতো যাঁরা নেপথ্যে থেকে অন্যকে লালন করেন, তাঁদের গুরুত্ব অপরিসীম।
বাংলাদেশে বর্তমানে পেশাদারত্বের ঘাটতিকে অন্যতম সংকট উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘যেকোনো পেশায় হোক, পেশাদারত্বের ঘাটতি আমাদের সংকটের মূলে রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান তাঁর সারা জীবনে পেশাদারত্বের একটা মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করে গেছেন।
হোসেন জিল্লুর রহমান ঘোষণা দেন, পিপিআরসি ও সেড যৌথভাবে অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান স্মরণে প্রতিবছর দুজন তরুণ সাংবাদিককে ফেলোশিপ দেবে। একজন পুরুষ ও একজন নারীকে এই ফেলোশিপ প্রদানের উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য তিনি সেডের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রয়াত অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের কাছ থেকে ক্ষমতার মোহে না পড়ে গবেষণায় মনোযোগী হওয়ার আদর্শিক দীক্ষা পেয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আমেনা মোহসীন। তিনি বলেন, আমৃত্যু সততা, স্পষ্টবাদিতা ও পেশাদারত্বের মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য বলা এবং প্রশাসনিক পদের চেয়ে মেধার গুরুত্ব বজায় রাখাই অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের দর্শন ছিল বলে উল্লেখ করেন আমেনা মোহসীন।
প্রয়াত অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্মৃতিচারণা করে সাংবাদিক ফরিদ হোসেন বলেন, তিনি ছিলেন নীতি ও নৈতিকতাপূর্ণ সাংবাদিকতার পথপ্রদর্শক। দ্রুত সংবাদের চেয়ে তথ্যের নির্ভুলতাকে যিনি সব সময় অগ্রাধিকার দিতেন।
ফরিদ হোসেনের মতে, সাংবাদিকতা হলো ক্ষমতাধরদের প্রশ্ন করা, কিন্তু বর্তমান সময়ে সাংবাদিকেরা ক্ষমতার অংশ হয়ে পড়ছেন এবং দলীয় বিভাজনে বিভক্ত হচ্ছেন। তিনি সাখাওয়াত আলীর বিনয়ী ব্যক্তিত্ব এবং সাংবাদিকতায় সাহসের সঙ্গে আপসহীন থাকার আদর্শকে নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় বলে উল্লেখ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস প্রয়াত অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানকে একনিষ্ঠ ‘পথপ্রদর্শক’ হিসেবে অভিহিত করেন।
রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, সাংবাদিকতা কেবল তথ্য পরিবেশন নয়, বরং বিশ্লেষণ ও সত্য উদ্ঘাটনের মাধ্যম। অধ্যাপক সাখাওযাত আলী খানের নিভৃতচারী ও নির্লোভ জীবন এবং পেশাদারত্বের প্রতি একাগ্রতা বর্তমান প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম সাখাওয়াত আলী খানের স্মৃতিচারণা করে তাঁকে একজন বিচক্ষণ ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষক হিসেবে অভিহিত করেন।
মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, মৃত্যুর আগপর্যন্ত সাখাওয়াত আলী খান নিয়মিত ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি তার ভালোবাসা প্রমাণ করেছেন। তার স্মৃতি সংরক্ষণে এই অধ্যাপক একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি চালুর প্রস্তাব দেন।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের অধ্যাপক জাকির হোসেন রাজু বলেন, ‘সাখাওয়াত স্যারের যেন কোথাও কোনো তাড়া ছিল না। ছিলেন নির্মোহ। বস্তুগত চাওয়া-পাওয়া বাদ দিয়ে শিক্ষার কাজে ব্রতী হয়েছিলেন তিনি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান সাখাওয়াত আলী খানকে একটি নৈতিক মানদণ্ড বলে অভিহিত করেন।
তানজীমউদ্দিন খান বলেন, ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থেকেও কীভাবে নিজেকে নির্মোহ রাখা যায়, এই মহান অধ্যাপক সেই শিক্ষাই তিনি দিয়ে গেছেন। তিনি তেমন কিছুই পাননি। কিন্তু যা পেয়েছেন, তা হলো মানুষের ভালোবাসা। এটাই বড় সার্থকতা।
স্মরণসভায় অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের মেয়ে ও প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন বলেন, ‘বাবার প্রয়াণের পর তাঁর ছাত্রছাত্রীদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেখে মনে হচ্ছে, তিনি তাঁদের মধ্যেই বেঁচে আছেন। তিনি বলেন, ধীর ও স্থির থেকে নিজেকে জাহির না করার শিক্ষা তাঁর কাছে থেকেই পেয়েছি।’
প্রয়াত জীবনসঙ্গীর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের সহধর্মিণী মালেকা খান। স্মরণসভায় অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্ত্রী, দুই সন্তান, নাতিসহ স্মরণসভায় পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
স্মরণসভার সভাপতিত্ব করেন উন্নয়নকর্মী ও সেডের বর্তমান চেয়ারম্যান খুশী কবির।
আরও বক্তব্য দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস, সাংবাদিক আনিস আলমগীর, দ্য সোয়ালজ ইন্ডিয়া বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ শিউলি হক, সাবরিনা শারমীন প্রমুখ।