
ঢাকার উত্তরার সেক্টর ৪-এর ১৬ নম্বর রোডের ২০ নম্বর বাড়ির প্রাঙ্গণে আছে শিউলিগাছ। শরতে–হেমন্তে ফুল ঝরে পড়ে থাকে আঙিনাজুড়ে। তা পেরিয়ে এগোলেই নিচতলায় গ্যালারি কায়া। স্থপতি শামসুল ওয়ারেসের নকশা করা বাড়ির বাইরে পোড়ামাটির কাজ। বাইরে থেকে মনে হতে পারে একটা সাধারণ ভবন। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি, প্রদর্শনী ও শিল্পচর্চার সাক্ষী এই জায়গাটি। ২০০৪ সালের ২৮ মে যাত্রা শুরু করেছিল গ্যালারি কায়া। দেখতে দেখতে ২২টি বছর চলে গেল। জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার।
২২ বছর আগে গ্যালারি কায়ার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে এই প্রথম আলোতেই একটা লেখা লিখেছিলাম। আজ আবার কলম ধরতে কত নস্টালজিয়া ভিড় করছে। তখনকার আমেরিকার রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাস উদ্বোধন করেছিলেন গ্যালারি কায়া। সেদিন থেকে কতবার আমরা গিয়েছি। মুর্তজা বশীর, কাইয়ুম চৌধুরী, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান—যাঁদের আর পাব না—এ রকম কত মনীষীর সঙ্গ পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। এই সেদিনও তো এসেছিলেন হামিদুজ্জামান খান। আজ তিনি নেই। রফিকুন নবী স্যার যদি আসেন, গল্পের ফোয়ারা খুলে যায়, শিশির ভট্টাচার্য্য এলে হয়তো শুরু হয় গান।
গ্যালারিটির প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী। একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তীর ছেলে তিনি। শিল্পের পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা। চট্টগ্রাম ও শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ১৯৯২ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। চাকরি করার চেয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতেই তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন। ফ্রিল্যান্স শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন।
গ্যালারি প্রতিষ্ঠার ভাবনাটি আসে একেবারে বাস্তব একটি পরিস্থিতি থেকে। উত্তরায় তাঁদের বাড়ির নিচতলা দীর্ঘদিন খালি ছিল। ভাড়া হচ্ছিল না। তখন গৌতম চক্রবর্তী ভাবলেন, জায়গাটি শিল্পের কাজে ব্যবহার করা যায় কি না। পরিবারের উৎসাহও ছিল। সেই ভাবনা থেকেই গ্যালারি কায়ার জন্ম।
গৌতম চক্রবর্তীর এই সাহসকে আমরা সুসাহস বলব নাকি দুঃসাহস বলব, দ্বিধায় ছিলাম। বাংলাদেশে শিল্পগ্যালারি পরিচালনা সহজ কাজ নয়। দর্শক আসে, প্রশংসা করে, কিন্তু শিল্পকর্মের ক্রেতা তুলনামূলক কম। অনেক গ্যালারি কয়েক বছর চলার পর বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যালারি কায়া আমাদের শঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। হয়ে উঠেছে শিল্পরসিকদের দুদণ্ডের শান্তির নীড়। গ্যালারির দেয়ালে মহৎ শিল্পীদের কিছু বাণী আছে। যেমন অঁরি মাতিস বলেছেন, ক্রিয়েটিভিটি টেকস কারেজ। সৃষ্টিশীলতার জন্য চাই সাহসিকতা। পাবলো পিকাসোর কথাটাও মনে ধরে: ‘শিল্প আপনার আত্মা থেকে প্রতিদিনের ময়লা ধুয়েমুছে দেয়।’
এই সেদিনও তো এসেছিলেন হামিদুজ্জামান খান। আজ তিনি নেই। রফিকুন নবী স্যার যদি আসেন, গল্পের ফোয়ারা খুলে যায়, শিশির ভট্টাচার্য্য এলে হয়তো শুরু হয় গান।
২২ বছরের পথচলা তো সহজ ছিল না। উত্তরাকে তখন শিল্পপ্রদর্শনীর কেন্দ্র বলা যেত না। শিল্পী, সংগ্রাহক ও দর্শকদের বেশির ভাগই শহরের অন্য অংশে অভ্যস্ত ছিলেন। উত্তরায় গিয়ে প্রদর্শনী দেখা অনেকের কাছে ঝামেলার বিষয় ছিল। তাই শুরু থেকেই নতুন কিছু করার চেষ্টা করতে হয়েছে।
গ্যালারি কায়ার একটি বড় শক্তি ছিল শিল্পীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। নিয়মিত প্রদর্শনী, আলোচনা, আর্ট ক্যাম্প ও ভ্রমণের মাধ্যমে তারা একটি সক্রিয় শিল্প-সম্প্রদায় গড়ে তুলেছে।
২০০৬ সালে শিল্পী শম্ভু আচার্যকে নিয়ে একটি আর্ট ক্যাম্প আয়োজন করা হয়। সেটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরে ২০১১ সালে শুরু হয় আর্ট ট্রিপ। এই উদ্যোগ গ্যালারি কায়াকে আলাদা পরিচিতি দেয়। শিল্পীদের নিয়ে দেশে ও বিদেশে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এসব সফর হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৪২টির বেশি আর্ট ট্রিপ, ৯টি আর্ট ক্যাম্প এবং ৬টি ওয়ার্কশপ আয়োজন করেছে গ্যালারি কায়া। এসব আয়োজন থেকে বিপুলসংখ্যক শিল্পকর্ম তৈরি হয়েছে।
প্রদর্শনীর ক্ষেত্রেও গ্যালারি কায়ার অবদান উল্লেখযোগ্য। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ১৬২টির বেশি প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়েছে। একক ও দলীয়—দুই ধরনের প্রদর্শনীই রয়েছে এই তালিকায়।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী মুর্তজা বশীরের চারটি একক প্রদর্শনী হয়েছে এখানে। রণজিৎ দাসের তিনটি একক প্রদর্শনী হয়েছে। হামিদুজ্জামান খানের প্রদর্শনী হয়েছে। এ ছাড়া এম এফ হুসেইনের গ্রাফিকস প্রদর্শনী, রতন মজুমদার, আশরাফুল হাসানসহ অনেক শিল্পীর প্রদর্শনী আয়োজন করেছে গ্যালারি কায়া। দুই বাংলার শিল্পীদের নিয়ে একাধিক যৌথ প্রদর্শনীও হয়েছে।
প্রদর্শনীর ক্ষেত্রেও গ্যালারি কায়ার অবদান উল্লেখযোগ্য। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ১৬২টির বেশি প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়েছে। একক ও দলীয়—দুই ধরনের প্রদর্শনীই রয়েছে এই তালিকায়।
এবার ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আবারও একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। আগামীকাল ১২ জুন ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছেন ৪৫ জন শিল্পী। প্রদর্শনীর নাম ‘২২তম বার্ষিকী প্রদর্শনী’। এতে মোট ৭৩টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হবে। তেলরং, অ্যাক্রিলিক, কালি, প্যাস্টেল, এচিং, লিথোগ্রাফ, উড এনগ্রেভিং, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তৈরি কাজ এতে স্থান পেয়েছে। প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলোর নির্মাণকাল ১৯৫৭ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে।
প্রদর্শনী উদ্বোধনের কথা রয়েছে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনের। অনুষ্ঠানে শিল্পী শহিদ কবির ও ব্যারিস্টার নিহাদ কবিরও উপস্থিত থাকবেন।
অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের তালিকাও দীর্ঘ। সেখানে রয়েছেন আমিনুল ইসলাম, দেবদাস চক্রবর্তী, হামিদুজ্জামান খান, হাশেম খান, জোগেন চৌধুরী, কে জি সুব্রহ্মণ্যন, এম এফ হুসেইন, মুর্তজা বশীর, রফিকুন নবী, রামকিঙ্কর বৈজ, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, শিশির ভট্টাচার্য, রণজিৎ দাস, রতন মজুমদার, গৌতম চক্রবর্তীসহ বাংলাদেশ ও ভারতের বহু গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী।
শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী আসলে তাঁর বাবা দেবদাস চক্রবর্তীর একটি স্বপ্নও বাস্তবায়ন করেছেন। দেবদাস চক্রবর্তী শিল্পীদের জন্য একটি স্থায়ী গ্যালারির কথা ভাবতেন। নানা উদ্যোগ হয়েছিল, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গ্যালারি কায়া সেই অভাব খানিকটা পূরণ করেছে।
২২ বছরে গ্যালারি কায়া শুধু প্রদর্শনীর জায়গা হয়ে থাকেনি। এটি শিল্পী, সংগ্রাহক, শিক্ষার্থী ও শিল্পপ্রেমীদের একটি মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। অনেক তরুণ শিল্পী এখানে প্রথম বড় পরিসরে নিজেদের কাজ প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছেন। অনেক দর্শক সমকালীন শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন।
উত্তরার একটি গ্যালারি যে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে, গ্যালারি কায়া তার উদাহরণ। ২২ বছর ধরে তারা যে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, সেটিই তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
২২ বছরে গ্যালারি কায়া শুধু প্রদর্শনীর জায়গা হয়ে থাকেনি। এটি শিল্পী, সংগ্রাহক, শিক্ষার্থী ও শিল্পপ্রেমীদের একটি মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। অনেক তরুণ শিল্পী এখানে প্রথম বড় পরিসরে নিজেদের কাজ প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছেন। অনেক দর্শক সমকালীন শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন।