
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় গঙ্গা নদীর পানিবণ্টনে নতুন চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, ন্যায্যতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তিতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিটি হবে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য প্রথম পরীক্ষা।
ভারতের টিভি চ্যানেল এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের বিষয়ে এই মন্তব্য করেছেন খলিলুর রহমান। আজ শনিবার সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হয়। ভারত থেকে মরিশাসে গিয়ে সাক্ষাৎকারটি দেন তিনি। মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে ৯ ও ১০ এপ্রিল ভারতের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন আয়োজিত ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে তিনি যোগ দেন।
খলিলুর রহমান মরিশাসে যান দিল্লি থেকে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রী হিসেবে ৭ ও ৮ এপ্রিল তিনি ভারত সফর করেন। দিল্লিতে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হারদ্বীপ সিং পুরির সঙ্গে দেখা করেন।
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। চুক্তি থাকা অবস্থায়ও পানির প্রাপ্যতা নিয়ে দুই দেশের মতপার্থক্য রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ার অভিযোগ বরাবরই বাংলাদেশের দিক থেকে ছিল। মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে হবে কিংবা নতুন চুক্তি করতে হবে।
দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চুক্তিটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ জানতে চাইলে খলিলুর রহমান বলেন, ‘গঙ্গার পানির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা বাঁচা-মরার। আমার পুরো সভ্যতা ও জীবিকা গঙ্গার পানি প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল। এখন যে চুক্তিটা আছে, তা কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। আমরা একটি সংশোধিত চুক্তি দেখতে চাই, যা মানুষের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে পারবে।’
পানির বণ্টন যথাযথ না হলে বাংলাদেশের জীবিকা, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় তার বিরূপ প্রভাব পড়বে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেহেতু দুই দেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী, এমন এক প্রেক্ষাপটে ন্যায্যতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তিতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিটি হবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঠিক করার জন্য প্রথম পরীক্ষা।’
১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তিটি যখন হয়েছিল, তখন বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আভাস দেখা যাচ্ছে।
দেড় বছর ধরে বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশই ভিসাদান সীমিত করে রেখেছিল। দিল্লির আলোচনায় ভিসার প্রসঙ্গটি এসেছিল কি না, জানতে চাইলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভিসার সমস্যা দুই দেশেই ছিল। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তিন দিনের মধ্যে ভারতের সব ধরনের নাগরিকের জন্য ভিসা চালু করে দিয়েছে।
ভারতও একই ধরনের পদক্ষেপ নেবে, এমন আশা প্রকাশ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখবে। এক দেশের জনগণকে অন্য দেশে আসতে না দেওয়া মানে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন এবং পরিচিত হওয়ার পথটা আটকে দেওয়া।
‘উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসা ভিসার ওপর নির্ভর করেন। যখন ওই ভিসা পাওয়া বিঘ্নিত হলো, সমস্যাটা তখন মানবিক হয়ে গেল। এটা আর ভিসা সমস্যায় আটকে থাকল না। মানুষ তখন বিকল্প খুঁজতে শুরু করল। কেউ কেউ কুনমিং, ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ একটা সুতা ছিঁড়ে গেল,’ বলেন খলিলুর রহমান।
খলিলুর রহমান আশা প্রকাশ করেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশের গুরুতর অসুস্থ কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য ভিসা সহজ করবে ভারত।
অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে পারে—এতে ভারতের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এ নিয়ে খলিলুর রহমান বলেন, ‘ভারত কিংবা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু এক পক্ষের লাভের নিরিখে পরিচালিত নয়, এমনটা আমি মনে করি না। যদি কোনো উদ্বেগ থেকেই থাকে, আমাদের ভারতীয় বন্ধুরা সেটা সুনির্দিষ্টভাবে স্পষ্ট করেই জানাতে পারে।’
এ প্রসঙ্গে খলিলুর রহমান আরও বলেন, ‘অন্য কোন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কারও ক্ষতির বিনিময়ে নয়। চীনের সঙ্গে সহযোগিতা ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য—দুটোই বাজারভিত্তিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্র আছে, যেখানে চীনের সঙ্গে আমাদের ফলপ্রসূ সহযোগিতা রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে আমাদের গতিশীল সহযোগিতা রয়েছে ভারতের। আর এটা নির্ধারণ করে বাজার। যেখানে আমরা ভালো মূল্য পাই, সেখানেই আমরা যাই।’
‘চলুন, এসব উদ্বেগ দূরে সরিয়ে রাখি। সম্পর্ককে আমাদের এক দেশের লাভ—এই দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখি। এতে কারও উপকার হয় না,’ বলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।