বাংলাদেশের মানুষ যে সরকারকে নির্বাচিত করেছে, তাদেরকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেছেন, ‘এই সরকার দায়বদ্ধ, তাকে জবাবদিহি করতে হবে।’
আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ‘দেশবিরোধী মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবিতে সম্মিলিত গণপ্রতিবাদ’ কর্মসূচিতে আনু মুহাম্মদ এ কথা বলেন। কর্মসূচির আয়োজক গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। এতে বামপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এই সরকার নির্বাচিত সরকার। মানুষ নির্বাচন করেছে তারেক রহমানের সরকারকে। মানুষ নির্বাচিত করবে তারেক রহমানকে, আর দেশ চালাবে যুক্তরাষ্ট্র–ট্রাম্প প্রশাসন? দেশ চালাবে আইএমএফ, দেশ চালাবে বিভিন্ন ধরনের করপোরেট স্বার্থ? এটা তো চলতে পারে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তিকে দেশের অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে উল্লেখ করে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, চুক্তির মধ্যে এক নম্বর ধারা থেকে শুরু করে শতাধিক জায়গায় বাংলাদেশ কী কী করতে বাধ্য থাকবে, সেটা লেখা আছে। আর যুক্তরাষ্ট্র কী কী করবে, সেখানে লেখা রয়েছে বাংলাদেশ যদি চুক্তির ধারা বাস্তবায়ন না করে তাহলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তারা কী কী ব্যবস্থা নেবে সেটা।
আনু মুহাম্মদ বলেন, পুরো চুক্তিপত্রটা দেখলে বোঝা যায় এটা হচ্ছে মার্কিন আদেশপত্র। বাংলাদেশের পক্ষে যাঁরা স্বাক্ষর করেছেন, তাঁরা আসলে মার্কিন প্রশাসনের লোক। তাঁদের মেরুদণ্ড নেই, কোনো দায়দায়িত্ব নেই এবং দেশের সর্বনাশ করতে তাঁদের কোনো কুণ্ঠা নাই। কিছু বিশ্বাসঘাতক, এই চুক্তিটা স্বাক্ষর করেছে।
বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানসহ চুক্তি করার সঙ্গে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের যাঁরা যুক্ত ছিলেন, তাঁদের বিচারের দাবি জানান অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
বর্তমান সরকার এখন পর্যন্ত যে ভূমিকা দেখাচ্ছে, সেটা খুবই উদ্বেগজনক বলে মনে করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘এই সরকার যে নির্বাচিত স্বাধীন সরকার, তার কোনো প্রমাণ আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে যে এই সরকার যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির কাছে পরাভূত এবং জনগণের ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়ে তারা জনবিরোধী অবস্থান নিচ্ছে।’
‘গোলামির চুক্তি’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিকে ‘গোলামির চুক্তি’ বলে বর্ণনা করেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য হারুন উর রশীদ। তিনি বলেন, দেশ বাঁচাতে হলে রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে এই সর্বনাশা চুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এই চুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রত্যেক মানুষের নৈতিক দায়।
বাণিজ্যচুক্তির ফলে পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প, জ্বালানি খাতসহ অর্থনৈতিক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেন গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু। তিনি বলেন, ‘দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে এই চুক্তি বাতিল করতে হবে।’
গণপ্রতিবাদ কর্মসূচিতে আরও ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন, উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক গবেষক মাহা মির্জা, নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, আকরাম খান, কবি হাসান ফকির, আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন প্রমুখ। কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মাহতাব উদ্দীন আহমেদ।
খোলাচিঠি
কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং সব সংসদ সদস্যের উদ্দেশে লেখা খোলাচিঠি পড়ে শোনান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা। চিঠিতে বলা হয়, ‘সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ভূমিকা থেকে মনে হয়, দেশের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে বড় ধরনের শৃঙ্খল তৈরির এ রকম কোনো চুক্তি বুঝি আদৌ স্বাক্ষরিত হয় নাই। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে আপনাদের এই বিপজ্জনক নীরবতার (স্বতন্ত্র একজন সংসদ সদস্য বাদে) যথাযথ ব্যাখ্যা দাবি করি।’
সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে চিঠিতে বলা হয়, ‘জনপ্রতিনিধি হিসেবে আপনারা নিজেদের গুরুতর দায়িত্ব আর উপেক্ষা করবেন না এবং জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনেই এই বাণিজ্যচুক্তি নামের মার্কিন আদেশপত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে তা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এই চুক্তির ফাঁস থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করবেন।’