মতামতের জন্য জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ। সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশের খসড়াও প্রণয়ন।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ১০ মাসেও কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে এখন জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর একটি খসড়া তৈরি করেছে।
মতামত নিতে খসড়াটি গতকাল বুধবার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে মাত্র তিন দিন অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারির মধ্যে মতামত দিতে হবে। আগের দিন মঙ্গলবার সম্প্রচার কমিশন গঠনের জন্য সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশের খসড়াও প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ আলাদা দুটি কমিশন করতে চায় তথ্য মন্ত্রণালয়।
যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সংবাদপত্র ও বার্তা সংস্থার জন্য বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিল এবং সম্প্রচারমাধ্যম ও অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য পূর্বের প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশনের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের সুপারিশ করেছিল। যা হবে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি স্বাধীন সংস্থা। প্রস্তাবে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু তথ্য মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ এবং ‘সম্প্রচার কমিশন’ নামে আলাদা কমিশন গঠনের পরিকল্পনা করছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মতামত পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে খসড়া অধ্যাদেশটি চূড়ান্ত করার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দুই সপ্তাহ পর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। এরপর গঠিত হবে নতুন সরকার। বর্তমান সরকারের মেয়াদও একদম শেষ পর্যায়ে। এ পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো করে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষা করে আলাদা দুটি কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার একেবারে শেষ সময়ে এসে তাড়াহুড়ো করে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে যেভাবে জাতীয় গণমাধ্যম অধ্যাদেশটি করতে যাচ্ছে, তাতে আমরা যে উদ্দেশ্যে গণমাধ্যম কমিশন গঠন করতে চেয়েছিলাম, সেটি অর্জিত হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল আহমেদ
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গত বছরের মার্চে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল আহমেদ। জানতে চাইলে তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার একেবারে শেষ সময়ে এসে তাড়াহুড়ো করে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে যেভাবে জাতীয় গণমাধ্যম অধ্যাদেশটি করতে যাচ্ছে, তাতে আমরা যে উদ্দেশ্যে গণমাধ্যম কমিশন গঠন করতে চেয়েছিলাম, সেটি অর্জিত হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।’
সরকারের বাকি মেয়াদেই অধ্যাদেশ দুটি অনুমোদন করে যাওয়ার চেষ্টা করব। কিন্তু কমিশন গঠন হয়তো এই সময়ে সম্ভব হবে নাসৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা
কামাল আহমেদ বলেন, বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিল যদি একই অবস্থায় থাকে, তাহলে প্রস্তাবিত গণমাধ্যম কমিশনের এখতিয়ার ও কাজের দায়িত্বও একই রকম হবে। একই ধরনের বিষয় দুটি প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ারে থাকলে সেটা সংকট বাড়াবে। তিনি মনে করেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন যেভাবে সুপারিশ করেছিল, হুবহু সেভাবে বাস্তবায়ন করলেই ভালো হয়।
তবে আলাদা দুটি কমিশন গঠন করা হলে সমস্যা বাড়বে বলে মনে করেন না তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, প্রেস কাউন্সিলকেও জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে বিশাল কাজ হতো। তবে আপাতত আনা যাচ্ছে না। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গণমাধ্যম কমিশন এবং সাংবাদিক সুরক্ষার জন্য আইনের কথা বলেছে। গণমাধ্যম কমিশনই এখন সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্যও কাজ করবে। আর সম্প্রচার সংক্রান্ত (লাইসেন্সের সুপারিশ ইত্যাদি) বিষয় দেখবে সম্প্রচার কমিশন।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকারের বাকি মেয়াদেই অধ্যাদেশ দুটি অনুমোদন করে যাওয়ার চেষ্টা করব। কিন্তু কমিশন গঠন হয়তো এই সময়ে সম্ভব হবে না।’
খসড়া অনুযায়ী যেভাবে কমিশন হবে
অধ্যাদেশ কার্যকর হলে ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ নামে একটি কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হবে। কমিশনের একটি প্রধান কার্যালয় থাকবে। প্রয়োজনে সরকারের অনুমোদন নিয়ে দেশের যেকোনো স্থানে শাখা কার্যালয় স্থাপন করা যাবে।
একজন চেয়ারম্যান ও আটজন সদস্য নিয়ে মোট ৯ সদস্যের কমিশন গঠিত হবে। সদস্যদের মধ্যে ন্যূনতম একজন নারী এবং একজন ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি থাকতে হবে। পাঁচ সদস্যের একটি বাছাই কমিটির মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এই কমিটির প্রধান থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি।
আমরা যে উদ্দেশ্যে গণমাধ্যম কমিশন গঠন চেয়েছিলাম, সেটি অর্জিত হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।কামাল আহমেদ, সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন প্রধান
এই কমিটি কমিশনের প্রতিটি পদের বিপরীতে দুজন করে প্রার্থীর নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে। সুপারিশপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের গণমাধ্যম, সাংবাদিকতা, আইন, প্রযুক্তি, তথ্য বা সংস্কৃতি বিষয়ে কমপক্ষে ২০ বছরের বাস্তব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। একই গণমাধ্যম বা একই মালিকানাধীন গণমাধ্যম গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক পদের জন্য নাম সুপারিশ করা যাবে না।
এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি চার বছরের জন্য চেয়ারম্যান ও আটজন সদস্য নিয়োগ দেবেন। তাঁদের পদমর্যাদা, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা সরকার নির্ধারণ করবে। চেয়ারম্যানসহ সাত সদস্যের উপস্থিতিতে কোরাম গঠিত হবে। প্রতি দুই মাসে অন্তত একটি কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হতে হবে। সুষ্ঠু সমন্বয়ের স্বার্থে কমিশনের সভায় প্রেস কাউন্সিল ও প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান বা তাঁদের মনোনীত প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো যাবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ সদস্যও অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
কমিশনের ক্ষমতা-কাজ
অধ্যাদেশের খসড়া অনুযায়ী, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ সমুন্নত রাখতে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার সুরক্ষা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এবং স্বনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড প্রণয়ন ও প্রতিপালন নিশ্চিত করা কমিশনের অন্যতম দায়িত্ব।
সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে।
অনুমোদিত ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের স্বচ্ছতা, নৈতিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উত্তম চর্চা, শুদ্ধাচার ও আচরণবিধি প্রণয়ন করবে কমিশন। সাংবাদিকদের ন্যূনতম যোগ্যতা ও সুরক্ষা বিষয়েও প্রবিধান প্রণয়ন করবে কমিশন।
অধ্যাদেশের খসড়া অনুযায়ী, সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা বিষয়ে প্রবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে তথ্যে অভিগম্যতার অধিকার, জনস্বার্থে অনুসন্ধান ও প্রতিবেদন প্রকাশের অধিকার, তথ্যসূত্র গোপন রাখার অধিকার, শারীরিক বা মানসিক চাপমুক্ত অনুকূল পরিবেশ, যৌক্তিক নিয়োগ শর্ত ও যথাযথ সম্মানীসহ কর্মক্ষেত্রে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। খসড়ায় বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সব গণমাধ্যমকে কমিশনের প্রণীত প্রবিধান মানতে হবে। কমিশন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হুমকি, হয়রানি ও সহিংসতা রোধে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে।
সাংবাদিকদের সম্মানী বা পারিশ্রমিক বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ করাও কমিশনের একটি কাজ। বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কমিশন সংবাদমাধ্যমকে ক্ষতিপূরণসহ সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারবে।