বন্যার পানিতে ভেঙে গেছে রিমা আক্তারের মাটির ঘর। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরে ভাঙা ঘর দেখে উদ্বিগ্ন তিনি। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়ার ইলশা গ্রামে
বন্যার পানিতে ভেঙে গেছে রিমা আক্তারের মাটির ঘর। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরে ভাঙা ঘর দেখে উদ্বিগ্ন তিনি। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়ার ইলশা গ্রামে

পানি কমছে, বেরিয়ে আসছে বন্যার ব্যাপক ক্ষতির চিত্র

ঘর ছাড়ার কয়েক মিনিট পরই তা ভেসে যেতে দেখেন মোহাম্মদ পারভেজ। পাহাড়ি ঢলের স্রোত তাঁর বসতঘরটিকে তুলে আছড়ে ফেলে পাশের বেইলি সেতুর ওপর। ভেসে যায় আসবাব, খাদ্যশস্য আর সারা জীবনের সহায়-সম্বল।

বান্দরবানের শীলক খালের উত্তর পাড়ের বাসিন্দা পারভেজ ও তাঁর প্রতিবেশী জেবেল মুল্লুক প্রাণে বেঁচেছেন অল্পের জন্য। স্রোত ঢুকতে দেখে তাঁরা দ্রুত ঘর ছাড়েন। ফিরে এসে দেখছেন, ঘরের জায়গায় শুধু ধ্বংসস্তূপ।

পানি নামায় এমন ক্ষতচিহ্ন দৃশ্যমান হচ্ছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায়। কোথাও ঘর ধসেছে, কোথাও নষ্ট হয়েছে ফসল। পুকুর ও মাছের ঘের পানিতে ভেসে গেছে। পাহাড়ি ঢল ও বন্যার স্রোতে ভেঙেছে সড়ক, সেতু ও কালভার্ট। বহু গ্রামীণ সড়ক থেকে পানি সরে গেলেও সেগুলো আর চলাচলের উপযোগী নেই।

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সম্প্রতি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলের এই পাঁচ জেলা ছাড়াও বন্যার কবলে পড়েছে সিলেট অঞ্চলের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার। বন্যাকবলিত এসব অঞ্চল থেকে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসছে ব্যাপক ক্ষতির চিত্র। তবে ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি। অনেক এলাকায় পানি পুরোপুরি নামেনি।

যোগাযোগে বড় ক্ষতি

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি সড়ক। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে। গতকাল দুপুরে তোলা

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যা ও ঢলের পানিতে জেলার ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে আনুমানিক ৮৯০ কোটি টাকা।

বড় ক্ষতি হয়েছে বান্দরবানের যোগাযোগব্যবস্থায়। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রায় ১৫১ কিলোমিটার সড়ক ও চারটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৪৭টি স্থানে পাহাড়ধস ও ২১ স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কিছু পথ সচল হলেও বেশির ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত অংশেরই স্থায়ী সংস্কার দরকার।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামতে প্রায় ৭ কোটি টাকা প্রয়োজন। আর দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পুনর্নির্মাণে লাগতে পারে প্রায় ৪০ কোটি টাকা।

রাঙামাটিতেও অন্তত ১০২ কিলোমিটার সড়কে ক্ষতি হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য বলছে, প্রাথমিকভাবে সড়ক খাতে প্রায় ৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ভাঙা ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছেন এক বৃদ্ধ

খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের হিসাবে, জেলার ৯ উপজেলায় ২৫টি ছোট-বড় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি সড়কে ক্ষতি বেশি হওয়ায় জরুরি সংস্কার চলছে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লোহাগাড়ায় অন্তত ৩০ কিলোমিটার সড়ক ও ১৭টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও সড়কের মাটি সরে গেছে, কোথাও ঢালাই উঠে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।

বাঁশখালীতে উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়ের হিসাবে, প্রায় ১১০ কিলোমিটার সড়ক, ২৫টি কালভার্ট ও দুটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু অবকাঠামো খাতেই সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি টাকা।

বড় ক্ষতির মুখে কৃষক

পানি কমার পর বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন ভেসে উঠতে শুরু করেছে। সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়নে

বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকেরা খেতে ফিরে দেখছেন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় সরকারি দপ্তরের হিসাবে, ফসলের ক্ষতি দাঁড়াবে কয়েক শ কোটি।

কক্সবাজার জেলা কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১০ হাজার ৪০১ একর জমির ফসল ডুবে অন্তত ৪৩ হাজার ২১০ কৃষকের কয়েক শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ভেসেছে ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর পুকুর ও চিংড়িঘেরের মাছ।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, ১৬ হাজার ৫০০ কৃষকের প্রায় ৬০ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। ১ হাজার ৬২০টি পুকুর ও মাছের খামার ডুবে প্রায় ৮ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাবে, খামার, পশুপাখি ও খাদ্যের ক্ষতি মিলিয়ে এ খাতে লোকসান প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা।

রাঙামাটিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষিতে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, ১০ উপজেলায় ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে প্রাণিসম্পদ খাতেও। খাগড়াছড়িতে প্রায় ১ হাজার ৩১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বান্দরবানে তলিয়ে গেছে প্রায় ৫ হাজার ২৬০ একর জমির ফসল।

খাগড়াছড়ির মহালছড়ির চাষি অজয় বড়ুয়া বলেন, ‘বন্যায় শুধু ঘরবাড়িই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, আমার পুকুরের প্রায় পাঁচ লাখ টাকার মাছও ভেসে গেছে। নতুন করে কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারছি না।’

এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষ

বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল সচিবালয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সভায় অংশ নেন।

সভা শেষে আসাদুল হাবিব দুলু সাংবাদিকদের জানান, দেশের ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা চলমান বন্যার কবলে পড়েছে। বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে। মন্ত্রী ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাসহ তাঁর মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, ইতিমধ্যে ত্রাণের জন্য ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা তাৎক্ষণিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চাল ও শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গতকাল বিকেল চারটার হিসাব অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এই সাত জেলার ৩২৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো আছেন ১০ হাজার ৮৫৪ জন।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এবং প্রতিনিধি, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি]