ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের ‘পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে (পিইপিএস)’-এর জরিপের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠান। কারওয়ান বাজার, ঢাকা। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের ‘পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে (পিইপিএস)’-এর জরিপের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠান। কারওয়ান বাজার, ঢাকা। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

ইনোভিশনের জরিপ

অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিতে বেশি আস্থা রেখেছেন ভোটাররা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আদর্শিক বয়ানের চেয়ে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিতে ভোটাররা বেশি আস্থা রেখেছেন। বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ প্রতিশ্রুতি বেশি প্রভাব ফেলেছে। ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের ‘পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে (পিইপিএস)’-এর জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জরিপের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এর আগে গত ৩০ জানুয়ারি এই জরিপের ফলাফলের একাংশ প্রকাশ করা হয়েছিল। ১৬ থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশের ২ হাজার ৯৮৫ জনের ওপর এই জরিপ চালানো হয়। বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (বিআরএআইএন) ও ভয়েস ফর রিফর্ম নামের দুটি নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সহযোগিতায় এই জনমত জরিপ চালায় ইনোভিশন কনসাল্টিং।

জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, নির্বাচনের আগে বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে ৬৩ দশমিক ১ শতাংশ বলেছিলেন, নির্বাচনে বিএনপির ইশতেহারে থাকা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বড় ভূমিকা রাখবে। এর প্রভাব জামায়াত সমর্থকদের ওপরও ছিল। তাঁদের ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ মনে করেছিলেন, এটি বড় ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে নারী ভোটারদের মধ্যে এই কার্ডের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার হার ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে জরিপে অংশ নেওয়া বিএনপি সমর্থকদের ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ মনে করেছিলেন, ‘হেলথ কার্ড’ নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখবে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসলামি শাসন, ভারতবিরোধী রাজনীতি এবং আওয়ামী লীগের বিচারের মতো আদর্শিক ইস্যুগুলো মূলত জামায়াত জোটের সমর্থক এবং পুরুষ ভোটারদের সিদ্ধান্তকে বেশি প্রভাবিত করেছে। তবে অন্যান্য আদর্শিক ইস্যুর তুলনায় ভারতবিরোধী রাজনীতির প্রভাব কিছুটা কম ছিল। জামায়াত জোটের সমর্থকদের মধ্যে ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার এটিকে প্রধান ভূমিকা পালনকারী ইস্যু হিসেবে দেখেছেন। বিএনপির সমর্থকদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ২২ দশমিক ৬ শতাংশ।

জরিপে দেখা গেছে, ভারতবিরোধী রাজনীতি পুরুষ ভোটারদের তুলনায় নারী ভোটারদের ওপর অনেক কম প্রভাব ফেলেছে। মাত্র ১৭ দশমিক ১ শতাংশ নারী এটিকে প্রধান কারণ মনে করেছেন। আর ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ নারী এই ইস্যুটির প্রভাব সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখেন না বলে জানিয়েছেন।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বিচারের বিষয়টিও ভোটারদের সিদ্ধান্তে বেশ কার্যকর ছিল, বিশেষ করে যাঁরা আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থানে অনড় ছিলেন। জামায়াত জোটের সমর্থকদের মধ্যে ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার এটিকে প্রধান ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আর বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে এই হার ছিল ৩৬ শতাংশ।

তবে জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল ইসলামি শাসন। তাঁদের ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার মনে করেছিলেন, ইসলামি শাসনের বিষয়টি তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রধান ভূমিকা পালন করবে। বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে এই হার ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ।

জরিপের ফলাফল বলছে, বিএনপির সাফল্যের পেছনে অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং আওয়ামী লীগের ভোটারদের উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন স্থানান্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ভোটারদের মধ্যে ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকেছেন। আর ১৩ দশমিক ২ শতাংশ জামায়াত-জোটের দিকে গেছেন। তবে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত এলাকাগুলোতে তুলনামূলক কম ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে, যা তাদের ভোটব্যাংকের একটি অংশের অনাগ্রহ বা বিরত থাকার ইঙ্গিত দেয়।

উচ্চকক্ষে কার কত আসন

দলগুলোর প্রাপ্ত ভোট বা আসনভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনের চারটি সম্ভাব্য চিত্র (সিনারিও) তুলে ধরা হয়েছে।

প্রথমত, ৫ শতাংশ ভোটের ‘কাট-অফ’ বা ন্যূনতম সীমা ধরলে উচ্চকক্ষে বিএনপি ৬১টি এবং জামায়াত ৩৯টি আসন পাবে। অন্য কোনো দল বা জোট আসন পাবে না।

দ্বিতীয়ত, ৩ শতাংশ ভোটের কাট-অফ ধরলে বিএনপি ৫৯, জামায়াত ৩৭ এবং এনসিপি ৪টি আসন পাবে।

তৃতীয়ত, ১ শতাংশ ভোটের কাট-অফ ধরলে বিএনপি ৫৮, জামায়াত ৩৬, এনসিপি ৩ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি আসন পাবে।

চতুর্থত, নিম্নকক্ষের ফলের ভিত্তিতে (আনুপাতিক হারে) আসন বণ্টন হলে বিএনপি ৭২, জামায়াত ২৪, এনসিপি ৩ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১টি আসন পাবে।

অনুষ্ঠানে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবাইয়াৎ সারওয়ার। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বিআরএআইএনের নির্বাহী পরিচালক শফিকুর রহমান, ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর প্রমুখ।