
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশে অক্সিজেন প্রয়োজন আছে, এমন ১০০ জনের মধ্যে ৪৬ জন নানা কারণে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যান না, যেতে পারেন না।
৮% হাসপাতালে গিয়ে দেখেন সেগুলো সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়।
অক্সিজেন শুধু গ্যাস নয়, অক্সিজেন জীবন রক্ষা করে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রয়োজনের সময় ৭০ শতাংশ মানুষ মেডিক্যাল অক্সিজেন পান না। দেশের ২০ শতাংশ অক্সিজেন প্ল্যান্ট অকেজো। অক্সিজেন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি জরুরি।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে (আইইউবি) গতকাল মঙ্গলবার মেডিক্যাল অক্সিজেনের প্রাপ্যতাবিষয়ক এক নীতি সংলাপে বিশেষজ্ঞরা এ কথা বলেন। আইইউবির সেন্টার ফর হেলথ, ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যান্ড পলিসি সায়েন্সেস এই সংলাপের আয়োজন করে। এতে গবেষক, শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ওষুধ কোম্পানির মালিক, জনস্বাস্থ্যবিদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অংশ নেন।
নীতি সংলাপের মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানী আহমেদ এহসানূর রহমান। তিনি বলেন, হাসপাতালে প্রধানত তিন ধরনের মানুষের মেডিক্যাল অক্সিজেন দরকার হয়। এদের মধ্যে আছে হঠাৎ তীব্র সমস্যায় আক্রান্ত রোগী (অ্যাজমা, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, কোভিড, এইচআইভি, ইবোলা, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি); অস্ত্রোপচারের আগে, অস্ত্রোপচার হচ্ছে বা অস্ত্রোপচার হয়েছে—এমন মানুষ এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছে (ফুসফুসের ক্যানসার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ ইত্যাদি) এমন মানুষ।
দুই বছর আগে প্রভাবশালী জনস্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেট মেডিক্যাল অক্সিজেনের বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানার জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিশন গঠন করে। এই কমিশনের সদস্য ছিলেন ৬৪ জন। এর নির্বাহী কমিটির ছয়জন সদস্যের একজন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী আহমেদ এহসানূর রহমান। তিনি কমিশন রিপোর্ট লেখকদের একজন।
ল্যানসেট কমিশন রিপোর্টের উদ্ধৃতি নিয়ে আহমেদ এহসানূর রহমান বলেন, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশে অক্সিজেন প্রয়োজন আছে এমন ১০০ জনের মধ্যে ৪৬ জন নানা কারণে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যান না, যেতে পারেন না। ৮ শতাংশ হাসপাতালে গিয়ে দেখেন সেগুলো সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। হাসপাতালে জনবল সমস্যাসহ নানা সমস্যা থাকার কারণে ৮ শতাংশ সেবা নিতে পারেন না। আবার ৮ শতাংশের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তাঁরা মানসম্পন্ন সেবা পান না। এখানে তীব্র সমস্যায় আক্রান্ত বা অস্ত্রোপচারের সময় মোট ৭০ শতাংশ মানুষ অক্সিজেন পান না। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে ১০১টি প্ল্যান্টে অক্সিজেন তৈরি হয়। তবে দেশের চাহিদা তারা পূরণ করতে পারছে না। বাংলাদেশে প্রতিবছর ২ কোটি ৩৮ লাখ ঘনমিটার অক্সিজেন দরকার। আর দেশে উৎপন্ন হয় ২ কোটি ২০ লাখ ঘনমিটার অক্সিজেন।
আইসিডিডিআরবির গবেষকেরা ২০২৫ সালে এই ১০১টি প্ল্যান্টের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। তাতে দেখা যায় ৩৪টি (৩৩.৭%) সচল বা কাজ করছে, ৪৭টি প্ল্যান্ট (৪৬.৫%) কাজ করে, কিন্তু মূল্যায়নের সময় চালু দেখা যায়নি। বাকি ২০টি (১৯.৮%) ব্যবহারের অনুপযোগী। এই তথ্যগুলো অনুষ্ঠানের পর দেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রোপচারের সময় মাঝেমধ্যে অক্সিজেন পাওয়া যায় না। দৌড়াদৌড়ি করতে হয়, অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে টানাটানি করতে হয়নুসারা সুলতানা, সহ-অধ্যক্ষ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
নীতি সংলাপের শেষ পর্যায়ে অনুষ্ঠানের সভাপতি ও আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম বলেন, দুটি জায়গায় কাজ করার সুযোগ আছে। অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং ‘অক্সিজেন থেরাপিকে’ পেশাজীবী চিকিৎসকদের চর্চার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা।
অন্যদিকে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমিম বলেন, কোভিড-১৯–এর সময় নিম্নমানের জিনিসপত্র দিয়ে অক্সিজেন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, তার অধিকাংশ এখন আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার নানা সমস্যা ও জটিলতার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার পর রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান নাসের শাহরিয়ার জাহেদী বলেন, মানসম্পন্ন অক্সিজেন নিশ্চিত করতে সরকার, বেসরকারি উদ্যোগ, মানবিক প্রতিষ্ঠান এবং গবেষক ও বিজ্ঞানীদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্যানেল আলোচক বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ‘অক্সিজেন থেরাপি’কে এখনো চিকিৎসা হিসেবে পুরোপুরি গ্রহণ করা হয়নি। আর এক প্যানেল আলোচক ল্যানসেট অক্সিজেনবিষয়ক কমিশনের সদস্য ও আইসিডিডিআরবির শামস এল আরেফিন বলেন, অক্সিজেনের বিষয়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
অন্য প্যানেল আলোচক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তা মামুন রহমান মালিক অক্সিজেন সেবা বাড়াতে বহু বছর আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ায় কাজ করেছেন। তিনি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। যেসব জায়গায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নেই, সেখানে অক্সিজেন উৎপাদনে বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহ-অধ্যক্ষ অধ্যাপক নুসারা সুলতানা বলেন, আজকের দিনেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রোপচারের সময় মাঝেমধ্যে অক্সিজেন পাওয়া যায় না। দৌড়াদৌড়ি করতে হয়, অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে টানাটানি করতে হয়।
অনেকেই করণীয় বিষয়ে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে আয়োজক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এস এম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, প্রয়োজনের সময় অক্সিজেন দিতে বিলম্ব করার অর্থ হচ্ছে জীবনকে অস্বীকার করা। তিনি জানান, এ বছর অক্টোবরে ঢাকা আন্তর্জাতিক অক্সিজেন সম্মেলন হবে।
নীতি সংলাপে বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের পরিচালক অধ্যাপক কাজী সাইফউদ্দিন বেননূর, আইইউবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান দিদার এ হোসেন, ট্রাস্টি হোসনে আরা আলী, পুষ্টিবিদ গোলাম মহিউদ্দিন খান সাদী প্রমুখ বক্তব্য দেন।