
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যানজট। লঞ্চে যাত্রীর বাড়তি চাপ। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ।
পবিত্র ঈদুল ফিতর আগামীকাল শনিবার। ঈদ সামনে রেখে এরই মধ্যে অনেকে ঢাকা ছেড়েছেন। এখন শেষ মুহূর্তেও সড়ক, রেল ও নৌপথে গ্রামে যাচ্ছেন মানুষ। আজ বৃহস্পতিবার এই তিন পথেই ছিল যাত্রীদের ভোগান্তি। কিছু সড়কে ছিল দীর্ঘ যানজট, বিভিন্ন রুটে ঘরমুখী মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়াও আদায় করা হয়।
আজ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি ছিল উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের। যমুনা সেতুতে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ ও সেতুর ওপর ১৫টি গাড়ি বিকল হওয়ায় গতকাল ভোরে সেতুর পূর্ব প্রান্তে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অন্তত ২৫ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগ পোহাতে হয় উত্তরের হাজারো যাত্রীকে। তবে বিকেলের দিকে যানজট কমে আসে।
রেলপথে ঈদযাত্রাও আজ স্বস্তিকর ছিল না। একতা এক্সপ্রেস ও নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেন দুটি যথাক্রমে সাত ঘণ্টা ও পাঁচ ঘণ্টা দেরিতে কমলাপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে যায়। যাত্রীদের কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বেঞ্চে বসে, আবার কেউ ব্যাগপত্রে ভর দিয়ে অপেক্ষা করেন ট্রেনের জন্য।
পুরান ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে আজ সকাল থেকেই ছিল দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের চাপ। বিকেলের দিকে এই চাপ আরও বেড়ে যায়।
ঈদ ঘিরে জনসমাগমস্থল, ঈদগাহ, বাস-রেল-লঞ্চ টার্মিনালসহ সারা দেশে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোয় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ ও র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষ ব্যবস্থার মধ্যেও সড়কে মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
এ ছাড়া কিছু অপরাধের ঘটনা মানুষের মধ্যে বাড়তি নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজধানীর উত্তরায় ঈদের কেনাকাটা করতে বের হয়ে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে চলন্ত অটোরিকশা থেকে পড়ে মুক্তা আক্তার নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু এবং খুলনায় ঘরে ঢুকে একই পরিবারের চার সদস্যকে লক্ষ্য করে গুলি করার ঘটনা ঘটেছে। দুটি ঘটনাই ঘটেছে আজ একই দিনে।
যমুনা সেতুতে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ ও সেতুর ওপর ১৫টি গাড়ি বিকল হওয়ায় আজ ভোরে সেতুর পূর্ব প্রান্তে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অন্তত ২৫ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে বেলা ১১টা ৪০ মিনিট থেকে সোয়া ১টা পর্যন্ত সেতু একমুখী (ওয়ানওয়ে) করে দুই লেন দিয়ে যানবাহন উত্তরবঙ্গের দিকে পার করানো হয়। এতে বিকেলের দিকে যানজট অনেকটা কমে আসে। অবশ্য উত্তরবঙ্গগামী লেনে যানজট থাকলেও ঢাকামুখী লেন পুরোপুরি ফাঁকা ছিল।
গতকাল বুধবার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড়, চক্রবর্তী এলাকা হয়ে নবীনগর সড়ক এবং চন্দ্রা-কোনাবাড়ী অংশেও দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল। বুধবার বিকেলে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে যায়। ফলে যানবাহনের গতি কমে যায় এবং একপর্যায়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। কোথাও কোথাও যানবাহনের ধীরগতি ও থেমে থেমে চলাচল করায় ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের দুর্ভোগ ছিল বেশি।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয় যাত্রীদের। অনেকেই সময়মতো বাস না পেয়ে ট্রাক ও পিকআপে ঝুঁকি নিয়ে রওনা হন। অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগও করেন অনেকে। তবে বিকেলের পর চিত্র বদলাতে শুরু করে। যানবাহনের চাপ কমে যাওয়ায় মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যানজট দ্রুত কমে আসে।
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার পৌলী সেতু এলাকায় রাজশাহীগামী বাসের চালক শহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ভোর পাঁচটায় ঢাকা থেকে রওনা হয়ে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টায় টাঙ্গাইল পর্যন্ত এসেছেন। সাভার ও চন্দ্রা এলাকায় দীর্ঘ সময় যানজটে পড়তে হয়েছে। তারপর আর কোথাও থেমে থাকতে হয়নি, তবে খুব ধীরগতিতে চলতে হয়েছে।
এভাবে দিনভর ভোগান্তি নিয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক হয়ে বাড়ি ফিরেছেন উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ। তবে বিকেলের পর যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসে।
সড়কপথে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার পূর্ব পেন্নাই থেকে গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড হয়ে উপজেলার ইছাপুর পর্যন্ত দুই কিলোমিটারজুড়ে গতকাল সকাল থেকে যানজটের সৃষ্টি হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে ঘরমুখী যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, মহাসড়কের পেন্নাই অংশে দুই লেনের মধ্যে এক লেনে সংস্কারকাজ শুরু করার কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়।
মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় ঈদযাত্রায় আজ দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঘরমুখী মানুষের চাপ বাড়ে। ঢাকা, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে দূরপাল্লার বাসে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথ পারাপার হতে ঘাট এলাকায় যান অসংখ্য যাত্রী। তবে এবার ঘাট এলাকায় যাত্রীদের তেমন ভোগান্তি নেই। ঘাটে আসার আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে যাত্রীবাহী বাসগুলো ফেরিতে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে।
নীলফামারীর চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস সকাল আজ ৬টা ৪০ মিনিটে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও ট্রেনটি ছেড়ে যায় বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে। ফলে ট্রেনটিতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। ট্রেনটির ছাদেও হাজার হাজার যাত্রী।
পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেস কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও ট্রেনটি সাত ঘণ্টা দেরিতে বিকেলে ছেড়ে যায়। দুই ট্রেনের শিডিউল (সময়সূচি) বিপর্যয়ে ভোগান্তিতে পড়েন ঘরমুখী হাজারো মানুষ।
এই শিডিউল বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করেছেন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। দুপুরে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে তিনি বলেন, গত বুধবার ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি কোচ বগুড়ার আদমদীঘিতে লাইনচ্যুত হওয়ার কারণে এই শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে।
শিডিউল বিপর্যয়ে ভোগান্তির পাশাপাশি গতকাল কমলাপুর রেলস্টেশনে যাত্রীদের ভিড়ও ছিল বেশি। স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে কেউ বিলম্বিত ট্রেনের যাত্রী, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এসে অবস্থান নেন নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে, যাতে কোনোভাবেই ট্রেন মিস না হয়।
রাজধানীর সায়েদাবাদ থেকে ছেড়ে যাওয়া বরিশাল, খুলনা, সিলেট, পিরোজপুর, কুমিল্লাসহ বেশ কয়েকটি রুটের বাসে গতকালও ২০০ থেকে ৩০০ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেন যাত্রীরা।
আজ সরেজমিনে সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী এলাকার পরিবহন কাউন্টারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য যাত্রীরা ভিড় করছেন। পরিবহনের কর্মীরা রুট অনুযায়ী যাত্রীদের ডাকছেন। তাঁদের কাছে টিকিটের দাম জানতে চাইছেন যাত্রীরা। কেউ সঙ্গে সঙ্গে কেটে নিচ্ছেন, কেউবা আবার আরেকটু কম ভাড়ার খোঁজে অন্য কাউন্টারের দিকে যাচ্ছেন।
ঢাকা থেকে বরিশালগামী যমুনা লাইন পরিবহনের যাত্রীরা অভিযোগ করেন, ৫০০-৬০০ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা রাখা হচ্ছে। জানতে চাইলে ওই পরিবহন কাউন্টারের কর্মী ইউসুফ বলেন, ‘আজকে আমাদের বরিশালের বাস নেই। কুয়াকাটার বাসে বরিশালের যাত্রীরা যাচ্ছেন। এ জন্য কুয়াকাটার ভাড়া রাখা হচ্ছে।’
খুলনাগামী তৌফিকুল-মিমুন পরিবহনের বাসের জানালা দিয়ে এক যাত্রীর কাছে ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘৬০০ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা নিছে। তারপরও সিট পাওয়া যায় না।’
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে মৌলভীবাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছিল রিয়াদ ক্ল্যাসিক। বাসটির একজন নারী যাত্রী অভিযোগ করেন, তাঁর কাছ থেকে কুলাউড়ার ভাড়া রাখা হয়েছে ১ হাজার ১০০ টাকা। অন্য সময়ে ৭০০ টাকায় যান।
ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জে আজ বাসসংকটে ভোগান্তিতে পড়তে হয় ঘরমুখী যাত্রীদের। সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সকালের দিকে শত শত যাত্রীকে পরিবহন কাউন্টারগুলোয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। টিকিট পাওয়া যাচ্ছিল না। আবার অনেক কাউন্টারে নির্ধারিত সময়ে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল না।
অবশ্য সকালের পর থেকে লোকাল লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলো ভৈরবসহ বিভিন্ন দূরপাল্লার রুটে চলাচল করতে শুরু করে। এসব বাসের অধিকাংশই ফিটনেসবিহীন এবং মহাসড়কে চলাচলের উপযোগী নয়। তবু ঈদে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ও বেশি মুনাফার আশায় ঝুঁকি নিয়ে দূরযাত্রায় নামানো হয়।
নারায়ণগঞ্জ-মেঘনাঘাট রুটে চলাচলকারী বোরাক পরিবহনের বাসগুলোকে ভৈরব রুটে যাত্রী পরিবহন করতে দেখা যায়। এই পরিবহনের একটি বাসের চালক সাব্বির মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে যানবাহনের সংকট ও যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা ভৈরব রুটের যাত্রী পরিবহন করছেন। ভৈরবগামী যাত্রীদের কাছ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। অথচ এই গন্তব্যে স্বাভাবিক সময়ে ভাড়া প্রায় ১০০ টাকা।
আজ সকাল সোয়া ৯টা পর্যন্ত সাইনবোর্ড এলাকার কাউন্টার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটে চলাচলকারী তিশা পরিবহনের তিনটি বাস ছেড়ে যায়। অনেক যাত্রী কাউন্টারে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, কিন্তু গাড়ি পাচ্ছিলেন না। কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা শাহাদাত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তিনটি গাড়ি ছেড়ে গেলেও একটি সিটও পাওয়া যায়নি। ঈদ উপলক্ষে ৫০ টাকা বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
বাসের সংকট ও যাত্রীদের ভোগান্তির সুযোগে নারায়ণগঞ্জে অনেক পরিবহন যাত্রীদের কাছ থেকে এভাবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে। যাত্রীপ্রতি ভাড়া ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি নেওয়া হয়।