
রাজধানীর গুলশানে একটি ফ্ল্যাট দখল, মারধর, ভাঙচুর ও চুরির অভিযোগে করা মামলায় চট্টগ্রাম-৬ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর দুই ছেলেসহ চারজনের জামিন বাতিল করে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।
পরোয়ানাভুক্ত চার আসামি হলেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর দুই ছেলে সামির কাদের চৌধুরী ও শাকির কাদের চৌধুরী, মারিনা এরশাদ এবং আশিকুর রহমান আশিক।
আজ বুধবার আসামিদের জামিন বাতিল চেয়ে বাদীপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ এ আদেশ দেন।
ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মারধরের অভিযোগে ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর গুলশান থানায় এ মামলা করেন ফারজানা আন্না ইসলাম নামের এক নারী। মামলায় বিএনপি নেতা ও সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে প্রধান আসামি করা হয়।
মামলার অপর আসামিরা হলেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে সামির কাদের চৌধুরী (৫০) ও শাকির কাদের চৌধুরী (৪২); মারিনা এরশাদ (৪৫), কেশব চন্দ্র নাথ (৫০), হারুন অর রশিদ (৪৮), ফেরদৌস মুন্সী (৪০), মো. আশরাফুল ইসলাম (৪০), সিরাজুল ইসলাম (৫০), মো. আবুল কাশেম (৪৫), আশিকুর রহমান আশিক (২৬), সালফান রেমা (২২), রাকিব হোসেন (৩৫), শাহাবুদ্দিন (৩৫) ও সালাউদ্দিন আব্বাসি (৫৬)।
বাদীপক্ষের আইনজীবী জাকির হোসেন বলেন, এই মামলার আসামিরা আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছিলেন। আজ ছিল মামলার ধার্য তারিখ। আজকে পর্যন্ত তাঁদের জামিন ছিল। আজ আসামিদের মধ্যে নয়জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং বাকি ছয়জন আসামির পক্ষে সময়ের আবেদন করা হয়।
এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্য ও তাঁর নিরাপত্তারক্ষীর জামিন আবেদনের বিরোধিতা আমরা করিনি। বাকি চারজনের জামিন বাতিল চেয়ে আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেছেন।’ আদালতে উপস্থিত হওয়া নয়জনের জামিন বহাল রাখা হয়েছে।
শুনানি শেষে মামলার বাদী ফারজানা আন্না ইসলাম বলেন, ‘তাঁরা আমার বাড়ির দুটি ফ্লোর (দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা) দাবি করেছেন। তাঁরা বলছেন, তাঁরা এই দুই ফ্লোরের মালিক। অথচ দখলে এত দিন আমরাই ছিলাম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর তাঁরা এটি দখল করেছেন।’
এ সময় সাংবাদিকেরা বাদীর পেশা জানতে চাইলে তিনি নিজেকে শিল্পপতি হিসেবে পরিচয় দেন।
পরে ফারজানা আন্না ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জমিটি আমার পৈতৃক সম্পত্তি। ২০০৬ সালে আমরা সেখানে বিল্ডিং বানানোর জন্য ডেভেলপারকে দিই। ২০০৭ সালে আমরা বাড়িটি বুঝে পাই।’
এ বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে শুরু থেকেই দখলে ছিলেন আমার মক্কেলরা। এর আসল মালিক তাঁরাই। ৫ আগস্টের পর বাদীপক্ষ আমাদের ওপর হামলা করেন। আমরা এর জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে ৮ ডিসেম্বর মামলা করি। ওই মামলা থেকে বাঁচতে তাঁরা আমাদের বিরুদ্ধে আরেকটি ভুয়া মামলা দিয়েছেন। আমাদের করা মামলায় আন্না ইসলাম ও তাঁর দুই ছেলে জেলেও ছিলেন।’
এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘গিয়াস উদ্দিন স্যার সংসদের অধিবেশনে থাকায় আজ উপস্থিত হতে পারেননি। তবে তাঁর জামিন নামঞ্জুর হয়নি। বাকি চারজন চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় থাকায় তাঁরাও উপস্থিত হতে পারেননি। আদালত তাঁদের জামিন নামঞ্জুর করেন।’
মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, প্রথম ছয় আসামি দীর্ঘদিন ধরে বাদীর ছয়তলা ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট জবরদখলের চেষ্টা করে আসছিলেন। ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁরা দলবদ্ধ হয়ে সেখানে অনধিকার প্রবেশ করেন। এ সময় তাঁরা চেয়ার, টেবিল, ফ্যাক্স মেশিন, প্রিন্টার, রাউটার ও অফিসের অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ আনুমানিক পাঁচ লাখ টাকার মালামাল মিনি পিকআপে তুলে নিয়ে যান। এ ছাড়া আনুমানিক দুই লাখ টাকার অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন।
এরপর ৪ ডিসেম্বর রাত আটটার দিকে আসামিরা লোহার রড ও পাইপ, কাঠের লাঠি, হাতুড়ি ইত্যাদি দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বাদী ও তাঁর দুই ছেলেকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য প্রাণনাশের হুমকি দেন। এ সময় তাঁরা বাদীকে এলোপাতাড়ি কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করেন এবং শ্লীলতাহানি করেন। পাশাপাশি বাদীর দুই ছেলেকেও শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। আহত ব্যক্তিরা পরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।